

পশ্চিমবঙ্গের মতুয়া অধ্যুষিত এলাকায় বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনা (Special Intensive Revision - SIR)–এর আওতায় ভোটার তালিকা থেকে বড় আকারে নাম বাদ পড়ায় আতঙ্ক, ক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছে। এসআইআর প্রক্রিয়ার সময় থেকেই যে ক্ষোভ দানা বাঁধছিল তা ২৮ তারিখ চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর আরও বেড়েছে। ফলে একসময়ের শক্ত ঘাঁটিতে এখন চূড়ান্ত রক্ষণাত্মক অবস্থানে বিজেপি। এর মধ্যেই বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীন জানিয়েছেন, যে ৫০ লক্ষের নাম বাদ পড়েছে তাঁরা সবাই 'অনুপ্রবেশকারী'। যে বক্তব্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক লাভের সুযোগ দেখছে তৃণমূল। বিশেষ এই অবস্থায় মতুয়াদের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিয়েছে বামেরাও। আগামীকাল ৪ মার্চ নির্বাচন কমিশনের দপ্তরের সামনে বিক্ষোভের দিয়েছে রাজ্য বামফ্রন্ট।
২০০২ সালের পর এই প্রথম নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন করছে নির্বাচন কমিশন। সীমান্তবর্তী উত্তর ২৪ পরগনা ও নদিয়া জেলায় এই প্রক্রিয়া পুরনো ক্ষত আবার উসকে দিয়েছে। এই রাজ্যে মতুয়ারা—এক তফসিলি জাতিভুক্ত হিন্দু উদ্বাস্তু সম্প্রদায়—দক্ষিণবঙ্গ ও উত্তরবঙ্গ মিলিয়ে রাজ্যের মোট ৫০টিরও বেশি বিধানসভা আসন জুড়ে তাদের প্রভাব আছে। বিগত কয়েকটি নির্বাচনে এই সব কেন্দ্রে বিজেপির ভালো প্রভাব লক্ষ করা গেছে। কিন্তু বর্তমান প্রক্রিয়ায় তাঁদের মধ্যে পরিচয়, নথিপত্র ও নাগরিকত্ব নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হওয়াতে বিজেপি বেশ কিছুটা ব্যাকফুটে।
এসআইআর–এর নিয়ম অনুযায়ী, যাঁদের নাম ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় ছিল না, তাঁদের যোগ্যতার প্রমাণপত্র জমা দিতে বলা হয়েছিল। গত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশ থেকে আসা বহু মানুষের কাছে প্রয়োজনীয় নথি না থাকায় অনেকের নাম এখন তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। ফলে তাদের মধ্যে ভোটাধিকার হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে কয়েকটি পরিসংখ্যানই যথেষ্ট। দ্বিতীয় দফায় ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ি কেন্দ্রে ১৬,৪৯১ জন, বাগদায় ১৫,৩০৩ জন এবং কল্যাণীতে ৯,০৩৭ জনের নাম বাদ পড়েছে। উল্লেখ্য, এই তিনটিই মতুয়া অধ্যুষিত এলাকা। প্রথম দফায় বাগদায় ২৪,৯২৭, গাইঘাটায় ১৬,৭১৮, বনগাঁ উত্তর কেন্দ্রে ২৬,১৮৩ এবং বনগাঁ দক্ষিণে ১৮,৫৬২টি নাম কাটা পড়েছিল। নতুন তালিকা যুক্ত করার পর বাগদায় মোট বাদ পড়া নামের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪০,২৩০, বনগাঁ উত্তরে ৩৪,১০৯, বনগাঁ দক্ষিণে ২৫,৪৬৪, গাইঘাটায় ২৩,৪৮৮ এবং স্বরূপনগরে প্রায় ১৫,০০০। অধিকাংশ কেন্দ্রে হাজার হাজার নাম ‘আন্ডার অ্যাডজুডিকেশন’ বা বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে।
উত্তর ২৪ পরগনা ও নদিয়ার একাধিক মতুয়া অধ্যুষিত কেন্দ্রে এসআইআর প্রক্রিয়া শুরুর পর থেকে ২৫,০০০ থেকে ৪০,০০০ পর্যন্ত নাম বাদ পড়েছে বলে জানা যাচ্ছে। রাজ্য জুড়ে নভেম্বর থেকে এ পর্যন্ত ৬৩.৬৬ লক্ষ নাম বাদ পড়েছে, যা মোট ভোটারের প্রায় ৮.৩ শতাংশ। ফলে ভোটার সংখ্যা ৭.৬৬ কোটি থেকে কমে ৭.০৪ কোটিতে নেমেছে। আরও প্রায় ৬০ লক্ষ ভোটার বিচারাধীন তালিকায় রয়েছেন।
নির্বাচন কমিশনের দাবি, একই ভোটারের একাধিক জায়গায় নাম, মৃত ও ভুতুড়ে ভোটারদের নাম সরাতেই এই উদ্যোগ। যদিও মতুয়া অধ্যুষিত অঞ্চলে বিষয়টি রাজনৈতিক ভাবে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
উত্তর ২৪ পরগনার ঠাকুরনগর, মতুয়া সম্প্রদায়ের আধ্যাত্মিক কেন্দ্র। সেখানকার বহু বাসিন্দার আধার, রেশন ও ভোটার কার্ড রয়েছে। তবুও অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এই নথিগুলি আর কার্যকরী নাও থাকতে পারে। অনেকে স্বীকারও করছেন, যে অতীতে যেভাবে নথি সংগ্রহ করা হয়েছিল, তা এখন সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
১৯শ শতকে বর্ণব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক সংস্কার আন্দোলন থেকে মতুয়া সম্প্রদায়ের উদ্ভব। ১৯৫০–এর দশক থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে বড় সংখ্যায় তাঁদের ভারতে আসা শুরু হয়। আজ তাঁরা পশ্চিমবঙ্গের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৭ শতাংশ এবং রাজ্যের বৃহত্তম তফসিলি জাতিগোষ্ঠী।
রাজনীতিতে মতুয়ারা বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ভোটব্যাঙ্ক। একসময় বামফ্রন্ট তাঁদের সমর্থন পেয়েছিল, পরে সেই সমর্থন তৃণমূল কংগ্রেসের দিকে সরে যায়। ২০১৯ সালের পর নাগরিকত্বের প্রশ্নকে সামনে রেখে বিজেপি উল্লেখযোগ্যভাবে মতুয়া ভোট নিজেদের দিকে টেনে নিতে সক্ষম হয়।
বর্তমানে প্রায় ৫০টি বিধানসভা আসনে মতুয়ারা নির্ণায়ক ভূমিকা নেন, যার অধিকাংশই ২০২১ সালে বিজেপির দখলে ছিল। দলের নেতাদের মতে, উদ্বাস্তু অধ্যুষিত এলাকাগুলিই ৭৭টি আসনের মধ্যে অর্ধেকের বেশি জয়ের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিল। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনেও সেই সমর্থন বড় অংশে অটুট ছিল।
যদিও এসআইআর প্রক্রিয়ার পর পরিস্থিতি এখন অনেকটাই বদলে গেছে। অভ্যন্তরীণ সমীক্ষা বলছে, বনগাঁ ও রানাঘাটের বিভিন্ন এলাকায় ২০০২ সালের তালিকার সঙ্গে নাম মিলিয়ে না দেখাতে পারায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ ভোটার প্রভাবিত হতে পারেন। কৃষ্ণনগর ও রানাঘাটের কিছু অংশে, যেখানে মতুয়ারা প্রায় ৬০ শতাংশ, সেখানেও একই আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সংবাদসংস্থার প্রতিবেদন অনুসারে, মতুয়া মহাসঙ্ঘের সাধারণ সম্পাদক মহিতোষ বৈদ্য পরিস্থিতিকে “বিভ্রান্তি ও উদ্বেগে ভরা” বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর দাবি, ৫০ শতাংশেরও বেশি মতুয়ার নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে এবং পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা স্পষ্ট নয়। তিনি আরও বলেন, এক কোটির মতো যোগ্য আবেদনকারীর তুলনায় নাগরিকত্বের শংসাপত্র দেওয়ার সংখ্যা অত্যন্ত কম।
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও বনগাঁর সাংসদ শান্তনু ঠাকুর যদিও এর আগে আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, উদ্বাস্তু মতুয়াদের নাম মুছে গেলেও চিন্তার কারণ নেই। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের আওতায় তাঁরা ভারতীয় নাগরিকত্ব পাবেন। তবে বনগাঁর এক স্থানীয় বিজেপি নেতা স্বীকার করেছেন, ২০১৯ সাল থেকে দলের অনুগত ভোটারদের একাংশের মধ্যে বিজেপির প্রভাব কমতে দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে এখন মানুষ জানতে চাইছেন, কেন তাঁদের নাম বাদ পড়ল এবং তাদের সে প্রশ্ন বিজেপির উদ্দেশ্যেই।
অন্যদিকে তৃণমূল সাংসদ মমতাবালা ঠাকুর অভিযোগ করেছেন, ২০০২–এর পর যাঁরা এসেছেন এবং যাঁদের কাছে যথাযথ নথি নেই, তাঁদেরই বেশি ক্ষতি হয়েছে। শুরু থেকেই বিজেপির নাগরিকত্ব প্রতিশ্রুতিকে তিনি “জুমলা” বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।
ভোটের আর মাত্র দু’মাস বাকি। এই পরিস্থিতিতে মতুয়া অধ্যুষিত অঞ্চল রাজনীতির সবচেয়ে স্পর্শকাতর কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বিজেপির কাছে এটি বড় ঝুঁকি—নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতিতে আস্থা ধরে রাখা যাবে, না কি উদ্বাস্তু ভোটব্যাঙ্ক সরে যাবে। তৃণমূলের কাছে এটি হারানো জমি পুনরুদ্ধারের সুযোগ, তবে সীমান্ত জেলায় বাড়তে থাকা উদ্বেগ সামলানোর দায়ও তাদের কাঁধে। এই পরিস্থিতিতে রাজ্যের বাম নেতৃত্বও বার বার মতুয়াদের নেতৃত্বের সঙ্গে দেখা করছেন, আলোচনা করছেন, তাদের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিচ্ছেন। বাম নেতৃত্ব খুব স্পষ্ট ভাবেই জানিয়েছেন, কোনো অবস্থাতেই একজন যোগ্য ভোটারেরও নাম বাদ দেওয়া যাবে না এবং সে বিষয়ে তাঁরা লড়াই চালাবেন।
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন