

পশ্চিমবঙ্গের এসআইআর প্রক্রিয়ায় ইতিমধ্যেই যথেষ্ট বিপাকে বিজেপি। বিভিন্ন জায়গায় পদ্ধতিগত বিষয়ে প্রশ্ন তুলে ক্ষোভ উগরে দিচ্ছেন সাধারণ মানুষ। স্বভাবতই যে ক্ষোভের সবটাই নির্বাচন কমিশনের কর্মপদ্ধতি ঘিরে এবং যেহেতু কেন্দ্রে বিজেপির শাসন তাই ঘুরেফিরে সেই ক্ষোভ সরাসরি বিজেপির ঘরেই জমা হচ্ছে। পাশাপাশি, ভোটার তালিকায় কোটি কোটি অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বা বাংলাদেশী থাকার যে অভিযোগ বারবার বিজেপির পক্ষ থেকে করা হয়েছে এখনও পর্যন্ত সেই বিষয়ে কোনও স্পষ্ট প্রমাণ উঠে আসেনি। এর মাঝেই উত্তরপ্রদেশে এসআইআর খসড়া তালিকায় ২ কোটি ৮৯ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ যাওয়ায় নির্বাচনমুখী রাজ্যেও অশনি সংকেত দেখছে বিজেপি।
উত্তরপ্রদেশে কত নাম বাদ পড়েছে খসড়া তালিকায়?
আগামী ২০২৭-এ উত্তরপ্রদেশ বিধানসভার নির্বাচন। সেই নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৮.৭০ শতাংশ নাম বাদ পড়ে যাওয়ার প্রভাব আগামী বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলে কতটা পড়বে তা নিয়েই শঙ্কিত বিজেপি। তথ্য অনুসারে, ভোটার তালিকা থেকে উত্তরপ্রদেশে যত নাম বাদ গেছে তার অধিকাংশই বিজেপির শক্তিশালী ঘাঁটি থেকে। এই সংশয় আগেই প্রকাশ করেছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। অন্যদিকে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত যেসব কেন্দ্র বা অঞ্চল আছে সেসব জায়গায় খুব কম নামই বাদ পড়েছে।
কোন অঞ্চলে কত নাম বাদ?
গত ৬ জানুয়ারি প্রকাশিত উত্তরপ্রদেশের এসআইআর খসড়া তালিকা অনুসারে উত্তরপ্রদেশের মোরাদাবাদ, রামপুর, বিজনৌর, সাহারাণপুর, মুজফফরনগর প্রভৃতি অঞ্চলে নাম বাদ যাওয়ার সংখ্যা অনেকটাই কম। ২০১১-র জনগণনা অনুসারে এই সব অঞ্চলই মুসলিম অধ্যুষিত এবং কোনো কোনও জায়গায় মুসলিস জনসংখ্যা ৪০ শতাংশের বেশি। উত্তরপ্রদেশের খসড়া ভোটার তালিকা থেকে পাঁচ ভাগের প্রায় এক ভাগ নাম বাদ যাওয়াকে ‘গুরুত্বপূর্ণ বিষয়’ হিসেবেই দেখছে উত্তরপ্রদেশ বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব।
অন্যদিকে বিজেপির শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত যেসব অঞ্চল, যেমন লখনৌ, প্রয়াগরাজ, গাজিয়াবাদ, কানপুর, মীরাট, গৌতমবুদ্ধ নগর, আগ্রা – এসব অঞ্চল থেকেই সর্বাধিক নাম বাদ পড়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে এইসব অঞ্চলই বিজেপির শক্ত ঘাঁটি। এইসব অঞ্চল থেকে একদিকে যেমন মৃত ভোটারদের নাম বাদ গেছে, তেমনই বাদ গেছে স্থায়ীভাবে অন্য জায়গায় চলে যাওয়া কিংবা একই ভোটারের নাম একাধিক জায়গায় থাকা ভোটারদের।
২০২২-এর জেলা ও ডিভিশন-এর ফলাফল কী ছিল?
২০২২ উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের দিকে দেখলে বিষয়টা আরও পরিষ্কার হবে। ডিভিশন বা আঞ্চলিক ভিত্তিতে লখনৌর মোট ৪৬ আসনের মধ্যে বিজেপি জয়ী হয় ৩৯ আসনে। আগ্রার ২৩ আসনের মধ্যে বিজেপি জয়ী হয় ১৮ আসনে। মীরাটের ২৮ আসনের মধ্যে বিজেপি জয়ী হয় ২৩ আসনে। কানপুরের ২৭ আসনের মধ্যে বিজেপি জয়ী হয় ২০ আসনে। প্রয়াগরাজের ২৮ আসনের মধ্যে বিজেপি জয়ী হয় ১৪ আসনে। অন্যদিকে জেলার হিসেবে গাজিয়াবাদের ৫ আসনেই জয়ী হয় বিজেপি। গৌতম বুদ্ধ নগরের ৩ আসনেই জয়ী হয় বিজেপি। বুলন্দশহরের ৭ আসনেই জয়ী হয় বিজেপি। হাপুরের ৩ টি আসনেই জয়ী হয় বিজেপি। এই আসনগুলির সবটাই মীরাট ডিভিশনের অন্তর্গত।
আবার লখনৌ ডিভিশনের অন্তর্গত লখিমপুর খেরি, সীতাপুর, হরদোই, উন্নাও, লখনউ জেলা মিলিয়ে মোট ৪০ আসনের মধ্যে ৩৭টিতেই জয়ী হয় বিজেপি। গোরখপুর ডিভিশনের অন্তর্গত মহারাজগঞ্জ, গোরখপুর, কুশীনগর, দেওরিয়া মিলিয়ে মোট ২৮ আসনের মধ্যে ২৭টিতে জয়ী হয় বিজেপি। আবার মির্জাপুর ডিভিশনের ভাদোহী, মির্জাপুর এবং শোনভদ্র জেলার মোট ১২ আসনের ১১টিতেই জয়ী হয় বিজেপি। মীরাট ডিভিশনের বাগপত, গাজিয়াবাদ, হাপুর, গৌতম বুদ্ধ নগর, বুলন্দশহর এবং মীরাট জেলার মোট ২৮ আসনের মধ্যে মীরাট ও বাগপত ছাড়া বাকি সব জেলার সব আসনে জয়ী হয় বিজেপি। মীরাটের ৭ আসনের মধ্যে ৩ এবং বাগপতের ৩ আসনের মধ্যে ২টিতে জয়ী হয় বিজেপি।
কেন শঙ্কিত বিজেপি?
উত্তরপ্রদেশের ভোটার তালিকায় পরিবর্তিত এই ছবি দেখে যথেষ্টই শঙ্কিত বিজেপি। খসড়া তালিকা প্রকাশের অনেক আগেই গত বছরের ১৪ ডিসেম্বর এই প্রসঙ্গে এই বৈঠকে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। যেখানে তিনি জানিয়েছিলেন ২৫ কোটি জনসংখ্যার উত্তরপ্রদেশে ৬৫ শতাংশ ভোটদানের যোগ্য। সেই হিসেবে ভোটার হবার কথা ১৬ কোটির কাছাকাছি। তা নেমে ১২ কোটিতে আসার অর্থ প্রায় ৪ কোটি ভোটদানের যোগ্য মানুষ ভোটার তালিকাতে থাকছেন না এবং যার ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশই আমাদের ভোটার।
কী নির্দেশ দলীয় কর্মীদের?
বিজেপি সূত্রের খবর অনুসারে, খসড়া তালিকা প্রকাশের পরেই তালিকায় ফর্ম ৬-এর মাধ্যমে নতুন ভোটারের নাম যুক্ত করার বিষয়ে তৎপর হয়েছে বিজেপি। বিজেপি নেতৃত্বের বক্তব্য অনুসারে, খসড়া তালিকা খতিয়ে দেখে দ্রুততার সঙ্গে নতুন ভোটারের নাম যুক্ত করার কাজ করতে হবে। বিজেপির সূত্র অনুসারে খসড়া তালিকায় বাদ যাওয়া নামের অধিকাংশই উচ্চবর্ণের মানুষের, যারা বিশেষ করে বিজেপির ভোটার।
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন