সেবির নিশানায় রাজেশ এক্সপোর্টস - ১৫ লক্ষ কোটি দুর্নীতির অভিযোগ! LIC-র বিনিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন কংগ্রেসের

People's Reporter: ২০২৬-এর শুরুতে রাজেশ এক্সপোর্টস-এ এলআইসি-র হোল্ডিং-এর পরিমাণ ছিল ৬৩৭ কোটি টাকা। রাজেশ এক্সপোর্টস-এর শেয়ারের দাম বিগত সময়ে বিপুল হারে কমে যাওয়ায় যা এখন কমে দাঁড়িয়েছে ৩৪৭ কোটি টাকা।
ছবি প্রতীকী
ছবি প্রতীকীফাইল ছবি
Published on

রাজেশ এক্সপোর্টস-এর (Rajesh Exports) বিরুদ্ধে ওঠা ১৫ লক্ষ কোটি টাকার দুর্নীতি প্রসঙ্গে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করলো কংগ্রেস। বৃহস্পতিবার কংগ্রেসের পক্ষ থেকে রাজেশ এক্সপোর্ট-এ ভারতীয় জীবন বীমা নিগম (Life Insurance Corporation of India)-এর ১০.৮ শতাংশ শেয়ারের মালিকানা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে একাধিক প্রশ্ন তোলা হয়েছে। কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ এই প্রসঙ্গে জানতে চান যে কীভাবে দেশের বৃহত্তম বীমা সংস্থা এই কোম্পানীতে উল্লেখযোগ্য অংশীদারিত্ব গ্রহণ করলো?

কী জানিয়েছে কংগ্রেস?

বৃহস্পতিবার এক এক্স বার্তায় (পূর্বতন ট্যুইটার) কংগ্রেসের যোগাযোগ বিভাগের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ সেবির এক প্রতিবেদনের উল্লেখ করে বলেন, “সেবি (SEBI) তার ৩ জুন, ২০২৬ তারিখের অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদনে 'রাজেশ এক্সপোর্টস' (Rajesh Exports) নামক এক প্রভাবশালী কোম্পানির বিরুদ্ধে বিশাল দুর্নীতির অভিযোগ এনেছে; কোম্পানিটি স্বর্ণ পরিশোধন ও গহনা ব্যবসার সাথে যুক্ত। সেবি জানিয়েছে যে, ২০২০-২১ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর—এই পাঁচ বছর সময়কালে কোম্পানির আয়ের হিসাব ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যার পরিমাণ সম্ভাব্য ১৫ লক্ষ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এই অঙ্ক সত্যিই বিস্ময়কর। তদন্ত এখনও চলছে এবং চূড়ান্ত রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে।”

ওই বার্তায় রমেশ জানিয়েছেন, “সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, রাজেশ এক্সপোর্টস-এ এলআইসি-র প্রায় ১০.৮% অংশীদারিত্ব রয়েছে। ব্যাংকগুলোরও এই সুস্পষ্টভাবে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী সংস্থাটিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বিনিয়োগ রয়েছে।”

রমেশের প্রশ্ন, “এমন একটি সংস্থায় এত বড় অংশীদারিত্ব থাকা সত্ত্বেও, কীভাবে এত বড় একটি জালিয়াতি ধরতে ব্যর্থ হলো এলআইসি? এখন সবথেকে বড়ো প্রশ্ন এটাই যে, এলআইসি-র এত বড় অংশীদারিত্ব ক্রয় শাসকগোষ্ঠীর নির্দেশেই হয়েছিল কি না।”

রাজেশ এক্সপোর্টস-এর বিরুদ্ধে কী অভিযোগ সেবির (SEBI)?

এর আগে গতকাল ৩ জুন সেবি রাজেশ এক্সপোর্টস লিমিটেডের প্রোমোটর এবং সিইও রাজেশ মেহতাকে কোম্পানির সিকিউরিটিজ লেনদেন করা থেকে নিষিদ্ধ করেছে। মূলত আর্থিক বিবরণীতে ব্যাপকহারে ভুল তথ্য দেওয়া এবং তহবিল আত্মসাতের অভিযোগে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি রাজেশ এক্সপোর্টস-এর কাছে থেকে লেনদেন সহ অন্যান্য একাধিক তথ্য চেয়ে পাঠানো হয়েছে।

প্রসঙ্গত, রাজেশ এক্সপোর্টস-এর এই ঘটনা প্রমাণিত হলে এই ঘটনা দেশের অন্যতম বড়ো কর্পোরেট জালিয়াতি হিসেবে গণ্য হবে। ভারতীয় শেয়ার বাজারের তথ্য অনুযায়ী দেশের বৃহত্তম সোনার পরিশোধনকারী এবং গহনা প্রস্তুতকারক সংস্থা হিসেবে পরিচিত রাজেশ এক্সপোর্টস লিমিটেড।

প্রাথমিক তদন্ত অনুসারে, কোম্পানির মোট আয়ের ৯৭ থেকে ৯৯ শতাংশ আসতো তাদের বিদেশি সহযোগী সংস্থা ভালকাম্বি এস এ (Valcambi SA) থেকে। যদিও ভালকাম্বির অডিট রিপোর্ট থেকে সেবি জানতে পেরেছে যে মূল গ্রুপ থেকে যে আয় দেখানো হয়েছে বাস্তবে তার সামান্য অংশই সেখানে রয়েছে। এক্ষেত্রে তথ্য গোপন করে এবং ভুয়ো তথ্য দিয়ে বিনিয়োগকারীদের বিভ্রান্ত করেছে ওই সংস্থা।

রাজেশ এক্সপোর্টস-এ এলআইসি-র হোল্ডিং-এর পরিমাণ কত?

২০২৬-এর শুরুতে রাজেশ এক্সপোর্টস-এ এলআইসি-র হোল্ডিং-এর পরিমাণ ছিল ৬৩৭ কোটি টাকা। রাজেশ এক্সপোর্টস-এর শেয়ারের দাম বিগত সময়ে বিপুল হারে কমে যাওয়ায় যা এখন কমে দাঁড়িয়েছে ৩৪৭ কোটি টাকা। এই সংস্থায় এলআইসি-র বিনিয়োগের পরিমাণ ১০.৮ শতাংশ। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে এই সংস্থার শেয়ারে কোনও কেনাবেচা করেনি এলআইসি।

নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদন অনুসারে, স্টক এক্সচেঞ্জগুলোতে প্রাপ্ত তথ্য থেকে দেখা যায় যে, দেশের বৃহত্তম প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী সংস্থা এলআইসি (LIC)—অন্তত ২০২৩ সালের মার্চ মাস থেকে—রাজেশ এক্সপোর্টস-এ তাদের ১০.৮০% থেকে ১১.১৮% শেয়ারের মালিকানা অপরিবর্তিত রেখেছে; অথচ গত এক বছরে রাজেশ এক্সপোর্টস-এর শেয়ারের দর ৪৯% হ্রাস পেয়েছে এবং ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্পর্শ করা সর্বোচ্চ স্তর থেকে তা প্রায় ৯০% নেমে গেছে।

বর্তমানে শেয়ার প্রতি প্রায় ১০৪ টাকা দর এবং ৩,০৬৮ কোটি টাকার বাজার মূলধনের (m-cap) ভিত্তিতে, রাজেশ এক্সপোর্টস-এ এলআইসি-র মালিকানাধীন শেয়ারের মোট মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৪০ কোটি টাকা।

গত ১ বছরে রাজেশ এক্সপোর্টস-এর শেয়ারের দাম কত নেমেছে?

এলআইসি ছাড়াও রাজেশ এক্সপোর্টস-এ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হোল্ডিং কমেছে। গত ৫২ সপ্তাহে রাজেশ এক্সপোর্টস-এর শেয়ারের দাম ২৩৭.৮৮ থেকে আজ ৪ জুন ১০৩.৯২-এ এসে নেমেছে। আজও এই শেয়ারের দাম পড়েছে ৪.৯৯ শতাংশ। গত ১ বছরে এই সংস্থার শেয়ারের দাম পড়েছে ৪৭.৮১ শতাংশ।

রাজেশ এক্সপোর্টস-এর বক্তব্য কী?

যদিও সেবি-র আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে রাজেশ এক্সপোর্টস। সংস্থার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তাঁদের ঘোষিত রাজস্ব সঠিক। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে যে, তাদের ঘোষিত রাজস্বের হিসাব সম্পূর্ণ সঠিক এবং বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও তাদের প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সম্ভবত যোগাযোগের ক্ষেত্রে কোনো ব্যবধান বা ঘাটতি তৈরি হয়েছে। তারা আরও উল্লেখ করেছে যে, সেবি (SEBI)-এর পক্ষ থেকে জারি করা আদেশটি একটি ‘অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ’; আর এই আদেশে বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি কোনো ধরনের চূড়ান্ত বা সুনির্দিষ্ট বিরূপ পর্যবেক্ষণ বা সিদ্ধান্ত তুলে ধরেনি।

কীভাবে শুরু হয়েছিল এই তদন্ত?

বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার এই তদন্ত প্রক্রিয়াটি ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত সময়কালকে অন্তর্ভুক্ত করে পরিচালিত হয়েছে। একজন শেয়ারহোল্ডারের অভিযোগের প্রেক্ষিতে এই তদন্ত শুরু হয়েছিল; ওই অভিযোগে বিপুল পরিমাণ ‘বকেয়া বাণিজ্যিক পাওনা’ (trade receivables) সংক্রান্ত সম্ভাব্য আর্থিক তথ্য বিকৃতির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল। এই আদেশের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ কোম্পানির বৈদেশিক সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সম্পর্কিত—বিশেষ করে সুইজারল্যান্ড-ভিত্তিক সেইসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে, যাদের অবদান কোম্পানির সামগ্রিক বা একীভূত ব্যবসার সিংহভাগ জুড়ে রয়েছে।

ছবি প্রতীকী
LIC: বাজার টালমাটাল, শেষ দেড় মাসে এলআইসি-র হাতে থাকা বিভিন্ন শেয়ারের দাম কমেছে ৮৪ হাজার কোটি টাকা
ছবি প্রতীকী
LIC: ফের এলআইসি-র শেয়ার বিক্রির তোড়জোড়, এবার বিক্রি হতে পারে আরও ৬.৫ শতাংশ

SUPPORT PEOPLE'S REPORTER

ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন

logo
People's Reporter
www.peoplesreporter.in