সেই অর্থে তামিলনাড়ুর পরমাণু কেন্দ্রের বহু ফাইল হ্যাক হয়ে যাওয়ার ঘটনার সঙ্গে ইন্ডিয়ান স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশন বা ইসরোর (Indian Space Research Organization – ISRO) বিজ্ঞানীদের ইস্তফা দেবার বা স্বেচ্ছাবসর নেবার ঘটনার কোনও সংযোগ নেই। কারণ, গত কয়েক মাস ধরেই এই ইস্তফার ঘটনা ঘটছিল। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম সূত্রে প্রকাশিত খবর অনুসারে ইস্তফা বা স্বেচ্ছাবসরের সংখ্যা ১০০-র বেশি। যদিও এই ঘটনা সামনে এসেছে পরমাণু কেন্দ্রের লক্ষাধিক ফাইল হ্যাক হয়ে যাওয়ার পর।
অতি সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের ডিপার্টমেন্ট অফ স্পেস (Department of Space – DoS)-এর পক্ষ থেকে ইসরোর বিজ্ঞানীদের ইস্তফার বিষয়ে নিয়মের বেশ কিছু কড়াকড়ি আনা হয়েছে। জানা যাচ্ছে অভ্যন্তরীণ এই নির্দেশিকা জারি হয়েছে ১৪ জুলাই। নতুন এই বিধি অনুসারে ইচ্ছে হলেই পদত্যাগ বা স্বেচ্ছাবসর নিতে পারবেন না বিজ্ঞানীরা। সরকার যে বিজ্ঞানীদের ইস্তফা এবং স্বেচ্ছাবসরের বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করছে তার প্রমাণ এই নির্দেশিকা।
নির্দেশিকায় জানানো হয়েছে ইসরো সেন্টারে গগনযান বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অভিযানের সঙ্গে যুক্ত ‘এ’ গ্রুপের বিজ্ঞানী এবং প্রযুক্তি কর্মীদের স্বেচ্ছাবসর এবং পদত্যাগের আবেদন আর ‘রুটিন ম্যাটার’ হিসেবে গৃহীত হবে না। অভিযান সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত সেন্টার ডিরেক্টর এবং ইউনিট হেডরা আর এই ধরণের আবেদন গ্রহণ করতে পারবেন না। কেউ স্বেচ্ছাবসর নিতে চাইলে বা ইস্তফা দিতে চাইলে আবেদন করতে হবে মহাকাশ বিভাগের কাছে। এর আগে ইস্তফা বা স্বেচ্ছাবসরের আবেদন গ্রহণ করতে পারতেন ইউনিট হেড এবং সেন্টার ডিরেক্টররা। ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে নিয়মে রদবদল এনে তাদের এই অধিকার দেওয়া হয়েছিল।
সম্প্রতি ইসরো থেকে শতাধিক অত্যন্ত অভিজ্ঞ কারিগরি বিশেষজ্ঞ—যাঁরা ঐতিহাসিক চন্দ্রযান-৩-এর সফল অবতরণের জন্য জটিল সব সিমুলেশন বিশ্লেষণ করেছিলেন এবং ভারী ওজনের পেলোড বহনকারী এলভিএম৩ (LVM3) রকেটের নকশা তৈরি করেছিলেন—তাঁরা পদত্যাগ অথবা স্বেচ্ছাবসরের আবেদন জানিয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের এই সরে যাওয়ার ঘটনা ভারতের শীর্ষস্থানীয় বৈজ্ঞানিক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ফলে অমূল্য মেধা-সম্পদ আটকাতে সরকারকে প্রশাসনিক সুরক্ষা-ব্যবস্থা বা ‘ফায়ারওয়াল’ গড়ে তোলার মতো পদক্ষেপ নিতে হয়েছে।
টাইমস অফ ইন্ডিয়া এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে গত কয়েক মাসে ইসরো থেকে পদত্যাগ করেছেন বা স্বেচ্ছাবসর নিয়েছেন ১০০ থেকে ১২০ জন বিজ্ঞানী। যার মধ্যে বেঙ্গালুরুর ইউ আর রাও স্যাটেলাইট সেন্টার থেকে ৮০ জন এবং থিরুবনন্তপুরমের বিক্রম সারাভাই স্পেস সেন্টার থেকে ২০ জন। এছাড়াও নাকি আরও বেশ কয়েকজন বিজ্ঞানী ইতিমধ্যেই ইস্তফা বা স্বেচ্ছাবসরের আবেদন করে রেখেছেন। যা এখনও গৃহীত হয়নি। তবে ইস্তফার এই ঘটনা যে গত কয়েক মাস ধরেই ঘটছে এমনটাও নয়। বরং বিগত ১০-১৫ বছরে ইসরো থেকে ইস্তফা দিয়েছেন কমপক্ষে ৭০০ জন।
কোনও কোনও পক্ষ থেকে যদিও দাবি করা হয়েছে যে এত বড়ো সংস্থা থেকে এত কম সংখ্যক ইস্তফা বা স্বেচ্ছাবসরে খুব বেশি ক্ষতি হবেনা। যদিও এক্ষেত্রে যে স্তরের কর্মীরা ইস্তফা বা স্বেচ্ছাবসর নিয়েছেন তাদের সংখ্যা থেকেও তাদের উচ্চ মেধার কারণেই সংস্থার ক্ষতি হতে পারে বলে মনে করছে কোনও কোনও মহল। সাধারণ স্তরের কর্মীদের ছেড়ে যাওয়া আর বিশেষজ্ঞদের ছেড়ে যাওয়ার মধ্যে অবশ্যই পার্থক্য আছে। যে কারণে কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে সরকার।
ইসরোর ওয়েবসাইটের (www.isro.gov.in) তথ্য অনুসারে ২০২১ সালের ১ মার্চ এই বিভাগের মোট অনুমোদিত পদের সংখ্যা ছিল ২০,৩৪১। যার মধ্যে ১৯,২৪৭টি অনুমোদিত পদ ছিল ইসরো সেন্টার/ইউনিট এবং ডিওএস-এর জন্য। এছাড়াও ডিওএস-এর অটোনোমাস ইউনিটের জন্য অনুমোদিত পদের সংখ্যা ছিল ১০৫৭। ওই ওয়েবসাইটের ২০২২-২৩-এর তথ্য অনুসারে ডিওএস/ইসরোতে সেই সময় মোট কর্মী সংখ্যা ছিল ১৬,০৭৯। যার মধ্যে গ্রুপ এ ভুক্ত সায়েন্টিফিক টেকনিক্যাল স্টাফ হিসেবে দেখানো হয়েছে ৭,৫০০ পুরুষ কর্মীকে এবং ১,৮৩৭ মহিলা কর্মীকে। এছাড়াও গ্রুপ এ ভুক্ত অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ স্টাফ ছিল ২৬৪ জন পুরুষ এবং ১৬৬ জন মহিলা। যদিও বর্তমানে ইসরোতে ঠিক কতজন কর্মরত সেই বিষয়ে উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুসারে এই সংখ্যা ১৪,৬০০। যে তথ্যের ভিত্তিতে বলা যেতে পারে এখনও বহু পদই শূন্য রয়েছে দেশের এই প্রথম সারির গবেষণা কেন্দ্রে।
ঠিক কী কারণে এতজন বিজ্ঞানী ইসরো ছেড়েছেন তার কারণ এখনও স্পষ্ট নয়। এর আগে ইসরোর প্রাক্তন চেয়ারম্যান এস সোমনাথ বেতন কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। মহাকাশ গবেষণায় আগ্রহ থাকলেও বহু কৃতী ছাত্র ছাত্রীই বেতন শুনে পিছিয়ে যান বলেই তাঁর অভিমত ছিল। তবে শুধু একমাত্র কারণ নাকি এর পেছনে আরও বড়ো কোনও কারণ আছে তা স্পষ্ট নয়।
২০২০ সালে মহাকাশ খাতে বড় ধরনের সংস্কার এবং ২০২৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ভারতীয় মহাকাশ নীতি’ (Indian Space Policy) আসার পর, দেশে বেসরকারি মহাকাশ ক্ষেত্র আর শুধুমাত্র ছোটখাটো যন্ত্রাংশ সরবরাহকারীর পর্যায়ে আটকে নেই। বরং তা এখন স্বাধীন উদ্ভাবনের এক শক্তিশালী কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ফলে শুধুমাত্র বেতন নির্ভর সরকারি ক্ষেত্রের চেয়ে বেতন এবং বিবিধ সুবিধার কারণে বেসরকারি ক্ষেত্র এখন অনেকের কাছেই আকর্ষণীয়।
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন