

ভারতে দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করছে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কেনাকাটা করা। বহু মানুষই এখন দোকান বাজারে গিয়ে কেনাকাটার বদলে ঘরে বসেই মোবাইল বা ল্যাপটপ হাতে নিয়ে কেনাকাটা সেরে ফেলছেন। সেই তালিকায় পোষাক থেকে জুতো, মুদিখানার জিনিস থেকে তৈরি করা খাবার, হোটেল বুকিং থেকে বিমান বা ট্রেনের টিকিট সবই আছে। যদিও ক্রমশ বেড়ে চলা এই ডিজিটাল কমার্স এখন ‘ডার্ক প্যাটার্ন’ (Dark Pattern) নামে পরিচিত বিভ্রান্তিকর কৌশলের কারণে বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে। সম্প্রতি করা এক সমীক্ষায় এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে।
কী জানাচ্ছে সমীক্ষা রিপোর্ট?
ডেটাম ইন্টালিজেন্স প্রকাশিত ‘ডার্ক প্যাটার্নস ইন ইন্ডিয়াস অনলাইন মার্কেটপ্লেসেস’ (Dark Patterns in India’s Online Market Places) শীর্ষক সমীক্ষা রিপোর্টে এই তথ্য উঠে এসেছে। রিপোর্ট অনুসারে, এই ধরণের প্রতারণামূলক কৌশলের কারণে ভারতীয় ক্রেতারা বছরে আনুমানিক ২৫ থেকে ২৮ হাজার কোটি টাকা ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
ডেটাম ইন্টালিজেন্সের রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমানে ভারতে প্রায় ৩০ কোটির বেশি অনলাইন ক্রেতা আছেন। ডার্ক প্যাটার্ন-এর কারণে এঁদের মধ্যে ৮৮ শতাংশ ক্রেতার প্রতি মাসে গড়ে ৭৮ থেকে ৮৭ টাকা পর্যন্ত আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। যার প্রধান কারণ, লুকানো চার্জ, বাধ্যতামূলক অ্যাড-অন, সাবস্ক্রিপশনের ফাঁদ, ড্রিপ প্রাইসিং এবং কৃত্রিম জরুরি পরিস্থিতি তৈরির মতো কৌশল।
সরাসরি আর্থিক ক্ষতি ছাড়াও এই ধরণের ব্যবস্থার ফলে ক্রেতাদের আচরণেও পরিবর্তন ঘটছে। ফলে প্রায় ৫৫,০০০ কোটি টাকার গ্রস মার্চেন্ডাইজ ভ্যালু (GMV) ঝুঁকির মুখে পড়েছে। অনেক ক্রেতাই এখন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে খরচ কমানোর চেষ্টা করছেন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তুলনামূলক দাম যাচাই করছেন, কেনাকাটা থেকে পিছিয়ে যাচ্ছেন অথবা বিকল্প কোনও প্ল্যাটফর্মে চলে যাচ্ছেন।
সমীক্ষায় কতজন অংশ নিয়েছেন?
২০২৬ সালের প্রথম ত্রৈমাসিকে করা এই সমীক্ষায় দেশের ৫০টি শহরের ২,৫৯০-এর বেশি ক্রেতার মতামত নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কুইক কমার্স, ই-কমার্স ও অনলাইন ট্রাভেল সেক্টরের ১২টি শীর্ষ প্ল্যাটফর্মের মূল্যায়ন করা হয়েছে। এই সংস্থাগুলির মধ্যে আছে বিগবাস্কেট, জেপ্টো, সুইগি, ইনস্টামার্ট, ব্লিঙ্কিট, অ্যামাজন, ফ্লিপকার্ট, মিন্ত্রা, নায়কা, মেকমাইট্রিপ, ইজমাইট্রিপ, ইক্সিগো এবং ক্লিয়ারট্রিপ।
সমীক্ষা থেকে জানা গেছে, অনলাইন পেমেন্ট ব্যবহারকারীদের ৬৩ শতাংশ এখন ডিজিটাল লেনদেনের সময় লুকানো চার্জ বা ড্রিপ প্রাইসিংয়ের মুখোমুখি হচ্ছেন। ২০২৪ সালে এই হার ছিল ৫২ শতাংশ। এছাড়াও ৭৩ শতাংশ প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীদের বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে প্রভাবিত করে। ৬৯ শতাংশ প্ল্যাটফর্ম শেষ মুহূর্তে অতিরিক্ত ফি যোগ করার কৌশল ব্যবহার করে। এছাড়াও অর্ধেকেরও বেশি প্ল্যাটফর্মকে ‘বেইট-অ্যান্ড-সুইচ’ কৌশল ব্যবহার করতে দেখা গেছে, যেখানে বিজ্ঞাপনে দেখানো অফার ও পণ্যের চূড়ান্ত দামের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য থাকে।
ক্রেতাদের আস্থায় এগিয়ে কোন সংস্থা?
সমীক্ষা রিপোর্ট অনুসারে, ভোক্তাদের আস্থার দিক থেকে ই-কমার্স খাতে সবচেয়ে এগিয়ে আছে অ্যামাজন। সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের ৫০ শতাংশ অ্যামাজনকে সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য প্ল্যাটফর্ম হিসেবে মত দিয়েছেন। অন্যদিকে ফ্লিপকার্ট, মিন্ত্রা ও নায়কার ক্ষেত্রে ভোক্তাদের মধ্যে অবিশ্বাসের ছবি দেখা গেছে। অনলাইন ট্রাভেল ওয়েবসাইট ব্যবহারকারীরা মেকমাইট্রিপকে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ মনে করলেও ক্লিয়ারট্রিপকে সবচেয়ে ক্ষতিকর প্ল্যাটফর্মগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। কুইক কমার্স খাতে বিগবাস্কেটের ঝুঁকির মাত্রা বেশি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কত শতাংশ ক্রেতা ডার্ক প্যাটার্ন সম্পর্কে সচেতন?
এই সমীক্ষা থেকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। যাকে বলা হয়েছে ‘অ্যাওয়ারনেস প্যারাডক্স’। যদিও ৮১ শতাংশ ভোক্তা জানিয়েছেন যে তারা ডার্ক প্যাটার্ন সম্পর্কে সচেতন, তবুও ৮৫ শতাংশ স্বীকার করেছেন যে তারা কোনো না কোনোভাবে এসব কৌশলের দ্বারা বিভ্রান্ত হয়েছেন।
এই সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারী প্রায় ৭৪ শতাংশ ভোক্তা জানিয়েছেন, স্বচ্ছ ও ন্যায্য ডিজাইন অনুসরণকারী প্ল্যাটফর্মের জন্য তারা অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতেও প্রস্তুত। অন্যদিকে অনলাইন ট্রাভেল খাতে ভোক্তাদের ব্যয় সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে বলেও প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
সমীক্ষায় বর্তমান আইন ও নীতির ক্ষেত্রে কিছু অস্পষ্টতার দিকেও উল্লেখ করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতারণামূলক ডিজাইন ও বৈধ বাণিজ্যিক প্রচারের মধ্যে আরও স্পষ্ট পার্থক্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট (DSA) একটি কার্যকর রেফারেন্স মডেল হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডার্ক প্যাটার্ন এখন আর শুধু ভোক্তা সুরক্ষার বিষয় নয়; এটি ভারতের ডিজিটাল অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব ও বাজারের প্রতি আস্থার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
ডার্ক প্যাটার্ন আসলে কী?
ডার্ক প্যাটার্ন (Dark Pattern) এমন এক ধরনের ওয়েবসাইট বা অ্যাপ ডিজাইন কৌশল, যা ব্যবহারকারীদের অজান্তেই বিভ্রান্ত করে এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে, যা হয়তো তারা স্বাভাবিক অবস্থায় নিতেন না।
ডার্ক প্যাটার্নকে সেই অর্থে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের এমন “চালাকি” বলে অভিহিত করা যায়, যার মাধ্যমে ব্যবহারকারীর কাছ থেকে বেশি টাকা নেওয়া, অপ্রয়োজনীয় পরিষেবা নিতে বাধ্য করা অথবা ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
ডার্ক প্যাটার্নের কয়েকটি সাধারণ উদাহরণ
১. ড্রিপ প্রাইসিং (Drip Pricing)
শুরুতে একটি দাম দেখানো হয়, কিন্তু পেমেন্টের শেষ ধাপে গিয়ে অতিরিক্ত চার্জ যোগ করে দেওয়া হয়। ধরা যাক, আপনি কোনও বিমানের টিকিট কিনবেন। আপনি সার্চ করে দাম দেখতে পেলেন ২০০০ টাকা। এরপর যখন আপনি সেই টিকিট কিনতে গেলেন দাম দেবার চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে দেখা গেল সেই দাম ২,৫০০ টাকা হয়ে গেছে।
২. ফোর্সড অ্যাকশন (Forced Action)
বেশ কিছু ক্ষেত্রে কোনো একটি নির্দিষ্ট কাজ করার সময় ব্যবহারকারীকে বাধ্যতামূলকভাবে অন্য কিছু করতে বলা। যেমন কোনও অ্যাপ ব্যবহার করতে হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বেশ কিছু অনুমতি (Permission) দিতে বাধ্য করা হয়।
৩. সাবস্ক্রিপশনের ফাঁদ
সাবস্ক্রিপশন নেওয়া খুবই সহজ হলেও বাতিল করার পদ্ধতি অনেকটাই জটিল। অধিকাংশ সময়েই সাবস্ক্রিপশন বাতিল করার সময় ব্যবহারকারীকে অনেকগুলি ধাপ অতিক্রম করতে হয়।
৪. ফলস আর্জেন্সি (False Urgency)
অনেক সময়েই কৃত্রিমভাবে জরুরি পরিস্থিতি তৈরি করে গ্রাহকের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। হোটেলের ঘর বুক করা বা বিশেষ কোনও জিনিস কেনার সময় অনেককেই এই পরিস্থিতির মুখে পড়তে হয়। হোটেল বুকিং-এর ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময়েই দেখানো হয় "মাত্র ২টি রুম আছে!" অথবা "অফার শেষ হতে আর ৫ মিনিট বাকি!" কিংবা এই মাপের জুতো স্টকে আর মাত্র দুটি আছে। যদিও বাস্তবে এমন নাও হতে পারে।
৫. বেইট অ্যান্ড সুইচ (Bait and Switch)
একটি বিশেষ অফার দেখিয়ে পরে অন্য পণ্য বা শর্ত সামনে আনা হয়। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে বিজ্ঞাপনে কম দামের জিনিস দেখিয়ে পরে বেশি দামের বিকল্প কিনতে উৎসাহ দেওয়া।
ডার্ক প্যাটার্ন কেন সমস্যার?
ভোক্তারা অপ্রয়োজনীয় খরচ করেন।
ক্রেতার আস্থা কমে যায়।
বাজারে স্বচ্ছতা নষ্ট হয়।
দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসা ও গ্রাহক উভয়ের ক্ষতি হয়।
ভারতে এর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা আছে?
ভারতে Central Consumer Protection Authority (CCPA) এবং অন্যান্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা ডার্ক প্যাটার্নের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নির্দেশিকা জারি করেছে, কারণ এগুলোকে ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘনের একটি রূপ হিসেবে দেখা হয়।
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন