

আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে তৃণমূলের প্রার্থী তালিকা ঘোষিত হওয়ার পর কোচবিহারের রাজনীতিতে নতুন করে চর্চা শুরু হয়েছে। জেলার নয়টি বিধানসভা আসনের একটিতেও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কাউকে প্রার্থী না করায় তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একাংশের নেতা-কর্মীরা। সামাজিক মাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে সরব হয়েছেন বহু যুবক-যুবতী। ফলে নির্বাচনের আগে জেলার সংখ্যালঘু ভোট কোন দিকে যাবে, তা নিয়েই শুরু হয়েছে রাজনৈতিক জল্পনা।
ইন্দো-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী কোচবিহারে সংখ্যালঘু নস্যশেখ সম্প্রদায়ের ভোটার সংখ্যা প্রায় ৩১ শতাংশ। তৃণমূলের প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই জেলার সংখ্যালঘু নেতারা সংগঠনকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন। আব্দুল জলিল আহমেদ, ফজলে করিম মিঞা, মীর হুমায়ুন কবিরসহ একাধিক নেতা দীর্ঘদিন ধরে দলের হয়ে কাজ করেছেন। অতীতে সংখ্যালঘু ভোটকে গুরুত্ব দিয়ে এই সম্প্রদায়ের নেতাদের বিধানসভায় পাঠিয়েছিল তৃণমূল। তাই এবারের নির্বাচনেও আব্দুল জলিল আহমেদের মতো প্রবীণ নেতা প্রার্থী হতে পারেন বলে আশা করেছিলেন অনেকেই। কিন্তু ঘোষিত তালিকায় একজনও সংখ্যালঘু প্রার্থী না থাকায় দলের অন্দরে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে।
এদিকে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ইতিমধ্যেই প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেছে নওশাদ সিদ্দিকির আইএসএফ এবং হুমায়ুন কবিরের জনতা উন্নয়ন পার্টি। পাশাপাশি রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, তৃণমূলের এই সিদ্ধান্তে সংখ্যালঘু ভোটের একটি অংশ বামেদের দিকেও যেতে পারে। বিশেষ করে সিপিআইএম প্রার্থী আকিক হাসান এবং প্রণয় কার্জির মতো নেতাদের ঘিরে সংখ্যালঘু ভোটের একটা অংশে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে বলেও আলোচনা চলছে।
প্রার্থী তালিকা ঘোষণার পর তৃণমূলের অন্দরেও নতুন করে সামনে এসেছে আদি ও নব্য নেতাদের দ্বন্দ্ব। দীর্ঘদিনের অভিযোগ, অন্য দল থেকে আসা নেতারাই সংগঠনে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছেন, আর কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন পুরনো কর্মীরা। এবারের তালিকায় সেই অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে।
দলের প্রবীণ নেতা আব্দুল জলিল আহমেদ, বিনয়কৃষ্ণ বর্মন, রবীন্দ্রনাথ ঘোষ ও গিরীন্দ্রনাথ বর্মনের মতো পুরনো নেতারা টিকিট পাননি। অন্যদিকে ফরওয়ার্ড ব্লক থেকে আসা উদয়ন গুহ, সঙ্গীতা রায় বসুনিয়া, কংগ্রেস থেকে তৃণমূলে যোগ দেওয়া অভিজিৎ দে ভৌমিকসহ একাধিক নতুন মুখ প্রার্থী হয়েছেন। এমনকি তালিকা ঘোষণার দিনই তৃণমূলে যোগ দেওয়া ক্রিকেটার শিবশঙ্কর পাল ও অনন্ত মহারাজ ঘনিষ্ঠ হরিহর দাসও টিকিট পেয়েছেন। এতে দলের ভিতরে ক্ষোভ বাড়ছে বলে অভিযোগ উঠছে।
এর মধ্যেই কোচবিহারের রাজনীতিতে নতুন জল্পনা তৈরি করেছে গ্রেটার কোচবিহার পিপলস অ্যাসোসিয়েশনের নেতা বংশীবদন বর্মনের নাম। শাসকদল তৃণমূলের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়ার পর তিনি বিজেপি সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে সিতাই বিধানসভা আসন থেকে লড়তে পারেন বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে এখনও কোনও পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।
রাজনৈতিক মহলের মতে, কোচবিহারে রাজবংশী ভোটও একটি বড় ফ্যাক্টর। তাই এই ভোটব্যাঙ্ককে ঘিরে রাজ্যের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলির আগ্রহ বরাবরই বেশি। বিজেপি রাজবংশী নেতা নগেন রায় ওরফে অনন্ত মহারাজকে রাজ্যসভার সাংসদ করেছিল। আবার তৃণমূল এবার অনন্তের ঘনিষ্ঠ হরিহর দাসকে শীতলকুচি বিধানসভায় প্রার্থী করেছে।
সব মিলিয়ে সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্বের প্রশ্ন, আদি-নব্য দ্বন্দ্ব এবং নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের জেরে কোচবিহারের নির্বাচনী পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হয়ে উঠছে। এখন নজর বিজেপির দ্বিতীয় দফার প্রার্থী তালিকার দিকে। সেই তালিকা প্রকাশের পরই জেলার নির্বাচনী সমীকরণ আরও স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন