প্রতি পরিবারে অন্তত একটি স্থায়ী কাজ থেকে দুর্নীতি মুক্ত প্রশাসন গড়ে তোলা। শনিবার প্রকাশিত বামফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহারে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এই ধরণের একাধিক বিষয়ে। সিপিআইএম রাজ্য দপ্তর আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে এক সাংবাদিক সম্মেলনে নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেন বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু। উপস্থিত ছিলেন অন্যান্য বাম শরিক নেতৃত্ব।
১৬ পাতার বাম ইশতেহারে তুলে ধরা হয়েছে একাধিক বিষয়। যাতে সবথেকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে কর্মসংস্থানকে। এছাড়াও ডাক দেওয়া হয়েছে তোলাবাজ মুক্ত নতুন বাংলা গড়ে তোলার। গতকাল সাংবাদিক সম্মেলনে বিমান বসু ইশতেহার প্রকাশ করতে গিয়ে রাজ্যের পুঞ্জীভূত ঋণের কথা তুলে ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ২০১১ সালে যে ঋণ ছিল ১ লক্ষ ৯২ হাজার কোটি টাকা তা মাত্র ১৫ বছরে ৭ লক্ষ কোটি টাকার অঙ্ক ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ স্বাধীনতার পরবর্তী সময় থেকে ২০১১ পর্যন্ত রাজ্যের ঋণের যে পরিমাণ ছিল তা মাত্র ১৫ বছরে ৩ গুণের বেশি হয়ে গেছে।
বামফ্রন্টের ইশতেহারে বলা হয়েছে, ক্ষমতায় এলে প্রতিটি পরিবারের জন্য অন্তত একটি স্থায়ী কাজের ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়াও প্রত্যেক নিবন্ধিত বেকারকে অন্তত ২টি চাকরির কল, গরিব মানুষের জন্য শহরে বছরে ১২০ দিন, গ্রামে ২০০ দিন কাজ, ৬০০ টাকা দৈনিক মজুরির ব্যবস্থা করা হবে।
ক্ষমতায় আসার ৫ বছরের মধ্যে সমস্ত সরকারি শূন্যপদ পূরণ, আবারও বছর-বছর স্বচ্ছতার সঙ্গে এসএসসি, সিএসসি, পিএসসি-র প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে ওই ইশতেহারে।
রাজ্যের শিল্প প্রসঙ্গে ইশতেহারে বামেদের দাবি, ভারী ও মাঝারি শিল্প ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পে দেশে প্রথম স্থান পুনরুদ্ধার করা হবে এবং নতুন সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার পার্ক তৈরি ও প্রতিটি জেলায় শিল্প তালুক স্থাপন করা হবে।
শ্রমিকদের মজুরি প্রসঙ্গে ইশতেহার জানাচ্ছে, শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ন্যূনতম ৭০০ টাকা, ৪টি শ্রমকোড রাজ্যে প্রয়োগ না করা, সমকাজে সমমজুরি, কর্মরত নারী শ্রমিক-কর্মচারিদের জন্য ক্রেশ, তৃতীয় লিঙ্গ ও Queer শ্রমিকদের সমকাজে সমমজুরি, সামাজিক সুরক্ষা এবং কর্মীর মর্যাদা দেওয়া হবে।
বাম ইশতেহারে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে কৃষিতেও। ইশতেহার অনুসারে ক্ষমতায় এলে ১৬টি ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য করা হবে দেড় গুণ।
এছাড়াও শিক্ষায় রাজ্য বাজেটের ২০ শতাংশ, স্নাতক স্তর পর্যন্ত টিউশন ফি মকুব, স্বাস্থ্যে বাজেটের ১০ শতাংশ, হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজে সব শূন্যপদ পূরণ, প্রতি জেলায় মেডিক্যাল কলেজ, আধুনিক হাসপাতাল গড়ে তোলা হবে।
বিদ্যুৎ ক্ষেত্র প্রসঙ্গে ইশতেহারে বলা হয়েছে বন্ধ করা হবে প্রিপেইড ডায়নামিক স্মার্ট মিটার বসানো, যারা আয়করদাতা নন তাদের জন্য— ১০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ সম্পূর্ণ বিনা মাশুলে, ২০০ ইউনিট পর্যন্ত অর্ধেক দামে দেবার ব্যবস্থা করা হবে।
রাজ্যের সব জেলা এখন মাইক্রো ফিনান্সের জালে আক্রান্ত। ঋণের দায়ে হাঁসফাঁস করছেন সাধারণ মানুষ। বামেদের ইশতেহারে মাইক্রো ফিনান্স সংস্থাগুলির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবার কথা জানানো হয়েছে।
এছাড়াও নদীভাঙন রোধে কার্যকর কর্মসূচি, খাল, বিল, পুকুর, জলাভূমি এবং নদী রক্ষায় কঠোর আইন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন তদন্ত, বিচারের জন্য বিশেষ তদন্ত কমিশন গঠন, নারী নিরাপত্তা, ক্ষমতায়ন, ৫ বছরের মধ্যে ২০ লক্ষ স্বনির্ভর গোষ্ঠী তৈরি, তামান্না, অভয়া-সহ সকল নির্যাতিতার ন্যায়বিচার, প্রতিটি জেলায় পুলিশের নিজস্ব কিন্তু ‘স্বশাসিত অভয়া বাহিনী’ গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।
ইশতেহারে প্রবীণদের জন্য ‘স্বাস্থ্য সেবা’ প্রকল্প, সব দরিদ্র প্রবীণ নাগরিকদের জন্য ৬,০০০ টাকা বার্ধক্য ভাতা দেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। বলা হয়েছে, সংখ্যালঘু ও আদিবাসী এলাকায় স্কুল-কলেজ-হোস্টেল তৈরিতে অগ্রাধিকার, উচ্চশিক্ষায় বৃত্তি ও সংরক্ষণ, ধর্মীয় স্বাধীনতায় নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা, সংখ্যালঘু ও আদিবাসী প্রধান অঞ্চলের জন্য আলাদা উন্নয়ন বোর্ড, সংখ্যালঘু ও আদিবাসী সংস্কৃতির পূর্ণ মর্যাদা ও সুরক্ষা দান, আদিবাসীদের জমি ও বনাধিকার আইনি সুরক্ষায় নিশ্চিত করা হবে। তফসিলি জাতি উপজাতি ও অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণীর জন্য সংরক্ষণের অধিকার এবং মর্যাদা ফিরিয়ে আনা হবে।
ইশতেহারে জোর দেওয়া হয়েছে বাংলার পুনর্জাগরণের ওপরেও। দুর্নীতি-মুক্ত স্বচ্ছ সংবেদনশীল প্রশাসন, প্রাণবন্ত গণতন্ত্র, মন্দির-মসজিদ নয়, কাজ, নারী নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়ন, শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, মৌলবাদের প্রশ্নে জিরো টলারেন্স গড়ে তোলা হবে। বাংলাকে লুটেরার ফ্র্যাঞ্চাইজি নয়, তোলাবাজ-মুক্ত নতুন বাংলা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে রাজ্য বামফ্রন্ট।
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন