ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) (Special Intensive Revision - SIR) প্রক্রিয়া নিয়ে ‘অধিকাংশ রাজনৈতিক দল প্রশংসা করেছে’—নির্বাচন কমিশনের এই দাবি 'সত্যের মারাত্মক বিকৃতি' বলে অভিযোগ তুলেছেন সিপিআই(এম) রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্যের বিরোধিতা করে জাতীয় নির্বাচন কমিশনকে তিনি এক চিঠি পাঠিয়েছেন।
সম্প্রতি মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশনের ফুল বেঞ্চ বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি খতিয়ে দেখতে রাজ্যে আসে। গত মঙ্গলবার এক সাংবাদিক সম্মেলনে কমিশনের তরফে প্রেস বিবৃতিতে বলা হয়, ‘অধিকাংশ রাজনৈতিক দল’ এসআইআর প্রক্রিয়ার প্রশংসা করেছে।
সিপিআইএম রাজ্য সম্পাদক দলের পক্ষে লেখা চিঠিতে প্রশ্ন তুলেছেন, কোন কোন রাজনৈতিক দল এই প্রক্রিয়ার প্রশংসা করেছে এবং কারা বিরোধিতা করেছে—তা স্পষ্টভাবে জানানো হয়নি। তাঁর বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট দলগুলির নাম গোপন রেখে ‘অধিকাংশের সমর্থন’-এর দাবি করা সত্যকে বিকৃত করার শামিল।
চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, সিপিআই(এম) লিখিতভাবে এবং নির্বাচন কমিশনের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চের সামনে মৌখিক উপস্থাপনার মাধ্যমেও এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর আপত্তি জানিয়েছে। সেই নথিবদ্ধ আপত্তি উপেক্ষা করে নির্বাচন কমিশনের এই ধরণের বিবৃতি 'বিস্ময়কর' বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
নির্বাচন কমিশনকে লেখা চিঠিতে এসআইআর নিয়ে সিপিআই(এম)-এর আপত্তির তিনটি মূল বিষয় চিঠিতে তুলে ধরেছেন মহম্মদ সেলিম।
সিপিআইএম জানিয়েছে, প্রথমত, ‘লজিক্যাল ডিসক্রেপ্যান্সি’ (Logical Discripency) বা তথাকথিত যৌক্তিক অসঙ্গতির অজুহাতে প্রকৃত ভোটারদের হয়রানি করা হচ্ছে। সিপিআইএম জানিয়েছে, এই অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার ফলে পশ্চিমবঙ্গে ৬০ লক্ষেরও বেশি ভোটার তাদের ভোটাধিকার নিয়ে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।
দ্বিতীয়ত, প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে চিঠিতে সিপিআই(এম) জানিয়েছে, এসআইআর নথি যাচাইয়ে বিচার বিভাগের নজরদারির যে নজিরবিহীন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা নির্বাচন কমিশনের প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার ফল। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কিছু আধিকারিক শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের অনুগামী হিসেবে কাজ করায় বিচার বিভাগের তত্ত্বাবধান প্রয়োজন হয়ে পড়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
তৃতীয়ত, সাংবিধানিক নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে সিপিআই(এম)। চিঠিতে বলা হয়েছে, কোনও যোগ্য ভোটারকে রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা সামাজিক পরিচয় কিংবা আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। আরএসএস-বিজেপি -র আদর্শগত উদ্দেশ্য পূরণের লক্ষ্যে ভোটার তালিকা সাজানোর চেষ্টা হলে তা নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্বের সরাসরি লঙ্ঘন হবে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
সেলিমের দাবি, এই ধরনের ‘বিভ্রান্তিকর ঐকমত্যের’ কথা বলে নির্বাচন কমিশন শুধু নিজের প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতাকেই ক্ষুণ্ণ করছে না, সংবিধানের মর্যাদাকেও আঘাত করছে।
সর্বজনীন ভোটাধিকার রক্ষার প্রশ্নে সারা দেশেই আন্দোলন চালাচ্ছে সিপিআই(এম)। পশ্চিমবঙ্গেও দলীয় প্রচারে সিপিআইএম স্পষ্ট ভাবেই জানিয়েছে, আরএসএস-এর চিন্তার অনুসরণে নির্বাচন কমিশন এসআইআর প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার খর্ব করার চেষ্টা করছে। তাদের অভিযোগ, সংখ্যালঘুদের পাশাপাশি তফসিলি জাতি, মতুয়া ও আদিবাসীসহ সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষ এই প্রক্রিয়ায় হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। এমনকি বিবাহিত মহিলাদের পদবি পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে নাগরিকত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলা হচ্ছে।
চিঠির শেষে সিপিআইএম রাজ্য সম্পাদক নির্বাচন কমিশনকে এই অবস্থান সংশোধনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, একটি স্বচ্ছ, ন্যায্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পুনর্বিবেচনা প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে গণতান্ত্রিক ভোটাধিকার সুরক্ষিত থাকে।
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন