ওড়িশায় অস্ট্রেলিয় ধর্মপ্রচারক গ্রাহাম স্টেইনস এবং তাঁর দুই শিশুপুত্রকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় রেহাই মিললো না বজরঙ দলের প্রচারক দারা সিং ওরফে রবীন্দ্র কুমার পালের। বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টে ওড়িশার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই হত্যার দায়ে যাবজ্জীবন কারাদন্ডের শাস্তিভোগকারী দারা সিং-এর সময়ের আগেই মুক্তির দাবী খারিজ করেছে সেন্টেন্স রিভিউ বোর্ড। ১৯৯৯ সালের এই ঘটনায় দোষী দারা সিংকে যাবজ্জীবন কারাদন্ডের সাজা দেওয়া হয়েছে।
গ্রাহাম স্টেইনস হত্যা মামলায় দোষী প্রমাণিত হবার পর দীর্ঘসময় জেলেই আছেন দারা সিং। গত পরশু ১৫ সেপ্টেম্বর হিন্দুত্ববাদী কর্মী দারা সিং-এর মুক্তির আবেদন খারিজ করে ওড়িশা সরকার। দীর্ঘ ২৫ বছর জেলে কাটানোর পর দারা সিং মুক্তির জন্য আবেদন করেছিলেন। এর আগে গত বছরেও নিজেকে ‘অনুতপ্ত’ বলে দাবী করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন দারা সিং।
গ্রাহাম স্টেইনস এবং তাঁর দুই নাবালক শিশু পুত্রকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হবার পর প্রাথমিকভাবে ভুবনেশ্বরের ডিস্ট্রিক্ট অ্যান্ড সেশনস জাজেস কোর্ট তাঁর মৃত্যুদন্ড ঘোষণা করে। যদিও পরে সেই শাস্তির বদলে তাকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়। বর্তমানে তাঁর বয়স ৬৭ বছর।
বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টে বিচারপতি মনোজ মিশ্র এবং বিচারপতি বিজয় বিষ্ণোই-এর বেঞ্চে ওড়িশা সরকার জানিয়েছে, দারা সিং-এর সময়ের আগেই মুক্তির আবেদনের বিষয়টি সেন্টেন্স রিভিউ বোর্ডে খারিজ হয়ে গিয়েছে।
এদিন সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর দারা সিং-এর আইনজীবী জানিয়েছেন, তিনি এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানাবেন। তিনি আরও বলেন, ওড়িশা সরকারের সাজা মকুব নীতি অনুসারে, কোনও ব্যক্তির ২৫ বছর কারাবাসের মেয়াদ পূর্ণ হলে তাকে সাজা মকুবের জন্য আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হয়। তার ভিত্তিতেই তাঁর মক্কেল সাজা মকুবের আবেদন জানিয়েছিলেন।
তবে দারা সিং-এর সাজা মকুবের আবেদন খারিজ হয়ে গেলেও ২০২৫-এর এপ্রিল মাসে ওড়িশার কেওনঝাড়ে গ্রাহাম স্টেইনস ও তাঁর দুই ছেলের হত্যাকাণ্ডের অন্যতম মূল অভিযুক্ত মহেন্দ্র হেমব্রমকে মুক্তি দেয় আদালত। সংশোধনাগারে ‘ভালো আচরণ’-এর জন্য তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। সেই সময়ের প্রতিবেদনে দ্য হিন্দু জানিয়েছিল, মুক্তির পর মহেন্দ্র হেমব্রমকে ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনিতে সংবর্ধনা জানান তাঁর অনুগামীরা।
ঘটনাচক্রে অতীতে দারা সিং-এর মুক্তির দাবিতে সরব হয়েছিলেন কেওনঝাড়ের বিজেপি বিধায়ক মোহন মাঝি। বর্তমানে তিনিই ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী।
১৯৯৯ সালের ২২ জানুয়ারি গ্রাহাম স্টেইনস ও তাঁর দুই শিশুপুত্র হত্যার ঘটনায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন ২৫ বছর বয়সী মহেন্দ্র হেমব্রম। সারা বিশ্বে সাড়া ফেলে দেওয়া এই হত্যার ঘটনায় যুক্ত থাকার অভিযোগে মোট ৫১ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। যদিও প্রাথমিক তদন্ত পর্বে এঁদের মধ্যে ৩৭ জন মুক্তি পেয়ে যায়। সিবিআই কোর্টে অভিযুক্ত হয় দারা সিং এবং মহেন্দ্র হেমব্রম সহ বাকি ১৪ জন। যদিও এঁদের মধ্যে ১১ জনকে পরবর্তী সময় মুক্তি দেয় ওড়িশা হাইকোর্ট। বাকি ৩ অভিযুক্তের মধ্যে ঘটনার সময় যুক্ত থাকা এক নাবালক, চেঞ্চু হাঁসদাকে ২০০৮ সালে বিশেষ আপিলের পর মুক্তি দেয় আদালত।
কী হয়েছিল সেদিন?
গ্রাহাম স্টেইনস ছিলেন একজন খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারক। ১৯৬০-এর দশকে ময়ূরভঞ্জের ইভাঞ্জেলিক্যাল মিশনারি সোসাইটির সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি ভারতে আসেন। ১৯৮৩ সালে সহকর্মী অস্ট্রেলিয়ান ধর্মপ্রচারক গ্ল্যাডিসকে বিয়ে করেছিলেন। তাঁদের তিন সন্তান ছিল। মূলত কুষ্ঠ রোগীদের সেবা করতেন তাঁরা। কিন্তু বজরং দলের অভিযোগ ছিল, তাঁরা স্থানীয় হিন্দুদের খ্রিস্ট ধর্মে ধর্মান্তরিত করতেন।
১৯৯৯ সালের ২২ জানুয়ারি দুই ছেলে ফিলিপ (১০) এবং টিমোথি (৬)–কে নিয়ে কেওনঝারের মনোহরপুরে এক জঙ্গল শিবিরে খ্রিস্টানদের একটি মণ্ডলীর সাথে দেখা করতে গিয়েছিল স্টেইনস। গ্ল্যাডিস এবং তাদের মেয়ে এথার তখন উটিতে ছিল। ওই দিন রাতে বজরং দলের নেতা দারা সিং ওরফে রবীন্দ্র পাল সিং-এর নেতৃত্বে গ্রাহাম স্টেইনস এবং তাঁর দুই ছেলের উপর হামলা চালানো হয়।
জানা যায়, গ্রাহাম স্টেইনস এবং তাঁর দুই শিশুপুত্র সেই সময় একটি স্টেশন ওয়াগনে ঘুমোচ্ছিলেন। ওই অবস্থায় গাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। গাড়ি থেকে বেরোনোর চেষ্টা করলে, লাঠি হাতে তাদের গাড়ি থেকে বেরোতে বাধা দিয়েছিল হামলাকারীরা। যার ফলে গাড়ির ভিতরেই জীবন্ত অবস্থায় দগ্ধ হয়ে তাঁদের মৃত্যু হয়।
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন