

শেষ মুহূর্তে তিন দিনের প্রস্তাবিত ব্যাঙ্ক ধর্মঘট থেকে সরে এল ব্যাঙ্ক কর্মী ও আধিকারিকদের যৌথ মঞ্চ ইউনাইটেড ফোরাম অব ব্যাঙ্ক ইউনিয়নস (UFBU)। ফলে ২৮ সেপ্টেম্বর, আজ সোমবার থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর, বুধবার পর্যন্ত দেশের ব্যাঙ্ক পরিষেবা স্বাভাবিক থাকছে। পূর্বঘোষিত ধর্মঘটের জেরে পরপর তিন দিন শাখা বন্ধ থাকার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, আপাতত তা দূর হল। যদিও গ্রাহকদের অসুবিধার কথা মাথায় রেখে রবিবার খোলা ছিল সব ব্যাঙ্ক।
রবিবার রাতে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষের সংগঠন ইন্ডিয়ান ব্যাঙ্কস অ্যাসোসিয়েশন (IBA)-এর সঙ্গে জরুরি বৈঠকের পর ধর্মঘট স্থগিতের সিদ্ধান্ত জানায় ইউএফবিইউ। রাত সাড়ে ৯টা নাগাদ শুরু হওয়া বৈঠকে কর্মী সংগঠনগুলির একাধিক দাবি নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকের পরে ইউএফবিইউ জানায়, দাবিগুলি নিয়ে আলোচনার জন্য নির্দিষ্ট আশ্বাস পাওয়া গিয়েছে। সেই কারণেই আপাতত ধর্মঘটের কর্মসূচি প্রত্যাহার করা হচ্ছে।
গতকালের বৈঠকের পর ব্যাঙ্ক ইউনিয়নগুলি পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে এই বিষয়ে একটি উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি (DFS, IBA ও UFBU) গঠন করা হয়েছে। দেশজুড়ে এটি বাস্তবায়নের জন্য ১ ডিসেম্বর, ২০২৬-এর কঠোর সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
ব্যাঙ্ক কর্মীদের অন্যতম প্রধান দাবি ছিল সপ্তাহে পাঁচ দিন কাজ এবং দু’দিন সাপ্তাহিক ছুটি চালু করা। বর্তমানে মাসের দ্বিতীয় ও চতুর্থ শনিবার ব্যাঙ্ক বন্ধ থাকে। কর্মী সংগঠনগুলির দাবি, রবিবারের পাশাপাশি মাসের প্রতিটি শনিবারও ব্যাঙ্ক পরিষেবা বন্ধ রাখা হোক।
এই দাবি দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে। ২০২৪ সালের মার্চে ব্যাঙ্ক কর্মীদের বেতন সংক্রান্ত সমঝোতার সময়ও প্রতি শনিবার ছুটির বিষয়টি আলোচনায় এসেছিল। কিন্তু এখনও পর্যন্ত তা কার্যকর না হওয়ায় কর্মী সংগঠনগুলির মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে তাদের বক্তব্য।
ইউএফবিইউ-এর আরও কয়েকটি দাবি রয়েছে। যার মধ্যে আছে, অবসরপ্রাপ্ত ব্যাঙ্ক কর্মীদের পেনশন বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সংশোধন, পেনশনভোগীদের জন্য অভিন্ন মহার্ঘ ভাতা এবং ন্যাশনাল পেনশন সিস্টেমের আওতায় থাকা কর্মীদের পুরনো পেনশন স্কিম বেছে নেওয়ার সুযোগ।
এর পাশাপাশি নির্দিষ্ট স্তরের আধিকারিকদের জন্য কর্মদক্ষতা-ভিত্তিক ইনসেন্টিভ বা পারফরম্যান্স লিঙ্কড ইনসেন্টিভ (PLI) চালুর দাবিও সামনে এনেছে ইউএফবিইউ।
রবিবারের বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হল, প্রতি শনিবার ব্যাঙ্ক বন্ধ রাখার দাবিটি খতিয়ে দেখতে আইবিএ এবং ইউএফবিইউ-র প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হবে।
এই কমিটি বিষয়টির বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করবে। ব্যাঙ্ক কর্মীদের স্বার্থের পাশাপাশি গ্রাহকদের পরিষেবা, ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষের মতামতও বিবেচনায় নেওয়া হবে। শনিবারগুলিতে ব্যাঙ্ক বন্ধ রাখার সম্ভাব্য বিকল্প নিয়েও আলোচনা হবে। এই বিষয়ে চরম সময়সীমা নির্ধারিত হয়েছে চলতি বছরের ১ ডিসেম্বর।
অর্থাৎ, রবিবারের বৈঠকের পরে শনিবারের ছুটির দাবি সরাসরি মঞ্জুর হয়নি। বরং বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
ব্যাঙ্কের বিভিন্ন স্তরের কর্মী ও আধিকারিকদের ইনসেন্টিভ ব্যবস্থায় যে অসামঞ্জস্য রয়েছে বলে ইউএফবিইউ দাবি করেছে, সেটিও বৈঠকে আলোচিত হয়েছে।
বিশেষ করে স্কেল ৪ এবং তার উপরের পদমর্যাদার আধিকারিকদের জন্য কর্মদক্ষতা-ভিত্তিক ইনসেন্টিভ চালুর বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। ইউএফবিইউ জানিয়েছে, এই বিষয়ে আইবিএ-র সঙ্গে আলোচনা শুরু করা যেতে পারে।
শুধু ইনসেন্টিভ নয়, ধর্মঘটের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য দাবিও আলোচনার আওতায় রাখা হবে বলে জানানো হয়েছে।
ব্যাঙ্ক কর্মী সংগঠনগুলির বক্তব্য, তাদের দাবিগুলি নিয়ে আলোচনার বিষয়ে আইবিএ-র তরফে নির্দিষ্ট আশ্বাস পাওয়া গিয়েছে। সেই আশ্বাসের ভিত্তিতেই আপাতত ধর্মঘটের কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছে।
তবে এর অর্থ সব দাবি মেনে নেওয়া হয়েছে, এমনটা নয়। বরং সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা এবং পর্যালোচনার প্রক্রিয়া শুরু করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ভবিষ্যতে আলোচনার মাধ্যমে দাবিগুলির সমাধান না হলে ফের আন্দোলনের কর্মসূচি নেওয়া হতে পারে বলেও জানিয়েছে ইউএফবিইউ।
তিন দিনের ধর্মঘটের সম্ভাবনা থাকায় আগেই প্রস্তুতি শুরু করেছিল বিভিন্ন ব্যাঙ্ক। জরুরি লেনদেন আগেভাগে সেরে নেওয়ার জন্য গ্রাহকদের মোবাইলে মেসেজ পাঠিয়ে রবিবার ব্যাঙ্ক খোলা থাকবে বলে গ্রাহকদের জানানো হয়েছিল। নগদের প্রয়োজন হলে এটিএম ব্যবহারের পরামর্শও দেওয়া হয়েছিল একাধিক ক্ষেত্রে।
এমনকি সম্ভাব্য পরিস্থিতি সামাল দিতে রবিবার রাষ্ট্রায়ত্ত ও গ্রামীণ ব্যাঙ্কের শাখা খোলা রাখার নির্দেশ দিয়েছিল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। টানা তিন দিন শাখা বন্ধ থাকলে নগদ লেনদেন এবং অন্যান্য ব্যাঙ্কিং পরিষেবায় সমস্যা তৈরি হতে পারে—এই আশঙ্কাতেই অতিরিক্ত প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল।
ধর্মঘটের আশঙ্কায় রবিবার কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় ব্যাঙ্কের শাখাগুলিতে গ্রাহকদের ভিড় দেখা যায়। বিশেষ করে জনবহুল এলাকাগুলিতে সকাল থেকেই পরিষেবা পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে দেখা যায় অনেককে। কোথাও কোথাও কাউন্টার খোলার আগেই শাখার বাইরে লাইন পড়ে যায়।
বয়স্ক গ্রাহক ও পেনশনভোগীদের উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেশ কিছু শাখায় কাউন্টারেও ভিড় বাড়ে।
তবে কলকাতার ডালহৌসি চত্বর-সহ বিভিন্ন অফিসপাড়ার ব্যাঙ্ক শাখায় তুলনামূলকভাবে কম ভিড় দেখা যায়। রবিবার পরিষেবা দেওয়ার সময় ব্যাঙ্ক কর্মীদের বড়ো অংশ কালো ব্যাজ পরে কাজ করেন।
শেষ পর্যন্ত ধর্মঘট প্রত্যাহার হওয়ায় সোমবার থেকে ব্যাঙ্ক পরিষেবা স্বাভাবিক থাকার পথ পরিষ্কার হয়েছে। ফলে জরুরি লেনদেন, নগদ তোলা, জমা দেওয়া এবং অন্যান্য শাখাভিত্তিক পরিষেবা নিয়ে গ্রাহকদের আপাতত তিন দিনের অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হচ্ছে না।
তবে শনিবারের ছুটি, পেনশন, মহার্ঘ ভাতা, পিএলআই এবং এনপিএস-সহ কর্মী সংগঠনগুলির অন্যান্য দাবির ভবিষ্যৎ এখনও আলোচনাধীন। উচ্চপর্যায়ের কমিটির আলোচনা এবং আইবিএ-ইউএফবিইউ-র পরবর্তী বৈঠকের দিকেই এখন নজর থাকবে।
অর্থাৎ, আপাতত ধর্মঘটের চাপ কাটলেও ব্যাঙ্ক কর্মী সংগঠনগুলির সঙ্গে কর্তৃপক্ষের আলোচনার পর্ব এখানেই শেষ হচ্ছে না। বরং দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা দাবিগুলির সমাধানের জন্য নতুন করে আলোচনার পথ খুলল রবিবার রাতের বৈঠক।
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন