"মুৎসুদ্দির ফাটকা পুঁজির জোরে, বিপন্ন আজ তোমার বাংলা ভাষা..."

People's Reporter: ভাষা মানে তো আর শুধু কয়েকটা লব্জ নয়, একটা গোটা সংস্কৃতি দাঁড়িয়ে থাকার পেছনে ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। আজ আমাদের বাংলা ভাষা সব দিক থেকেই কোণঠাসা।
ছবি প্রতীকী
ছবি প্রতীকীগ্রাফিক্স আকাশ
Published on

আদ্যন্ত শহুরে আমি কোনদিন বুঝিনি বাংলা ভাষা উচ্চারিত হলে নিকানো উঠোনে কিভাবে রোদ্দুর ঝরে, সালাম বা বরকতের কোনো ছবি মাধ্যমিক পাস করার সময়ও দেখি নি - কিন্তু ক্লাস ফাইভে বাবা মারা যাওয়ার পরে, অ্যানুয়াল পরীক্ষার শেষে প্রায় ১৫ দিন ছোটমামার বাড়িতে ছুটি কাটিয়ে ভাইজ্যাগ থেকে যখন ফিরছি, তখন খড়গপুরে ট্রেন ঢোকার আগে হঠাৎ একটা স্টেশনের পাঁচিলের গায়ে একটা পোস্টারে দেখলাম বড় বড় করে লেখা "হুকুমত" সিনেমার নাম; নিকানো উঠোনের রোদ্দুর, তৃপ্ত শেষ চুমুকের আবেশ- এসব কিচ্ছু না, মায়ের ভাষা বলতে যে ভালোবাসা বা ভালোলাগাটা মনের মধ্যে চারিয়ে যায়, সেটার শুরু ঐ হুকুমতের পোস্টার... সেই প্রথম বুঝেছিলাম পনেরো দিন পরে বাংলা হরফ দেখার পরে যে ভালোলাগাটা জন্মায় সেটাই ভাষাটার প্রতি ভালোবাসা।

কবি শামসুর রহমান লিখেছেন "বাংলা ভাষা উচ্চারিত হলে চোখে ভেসে ওঠে কত চেনা ছবি..." আমি যেমন চোখ বুঁজলেই দেখতে পাই সেই কোন ছোটবেলায় স্কুলে ঢুকে যাওয়ার মুহূর্তে...অথবা, পরীক্ষা দিতে যাওয়ার সময়...কিংবা, প্রথম ইন্টারভিউ দিতে যাওয়ার আগে...মা আমার থুতনি ছুঁয়ে চুমু খেয়ে বলত "দুগ্গা, দুগ্গা -সাবধানে যাস, ভয় নেই ভালো হবে"... মায়ের হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার সাথে লেপ্টে গেছে এখনো টিকে থাকা ভালোভাষা।

একটা বাচ্চা যখন তার বন্ধুকে বলে "চল এই গেমটা খেলি মজা আসবে"; তখন কেউ তাকে শুধরে দিয়ে বলে না যে হিন্দিতে "মজা আয়েগা" হলেও বাংলা কথ্য ভাষায় মজা "আসে" না, মজা হয়;

ভালো করে আরেকবার পড়ুন আগের লাইনটা, খুব সচেতনভাবেই টিকে থাকা শব্দটা ব্যবহার করেছি। বাংলা ভাষা আজ আর দৌড়চ্ছে না, বরং খুব বাজে ভাবেই ল্যাংচাচ্ছে - যে কোনো মুহুর্তে মুখ থুবড়ে পড়বে এবং সেটাও এই শহর কলকাতাতেই। শহরের খুব বড় বড় নামজাদা স্কুলে রমরম করে দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে হিন্দি পড়ানো হচ্ছে, উজ্জ্বল ঝলমলে আলো জ্বলা রেস্তোরাঁয় শ্যামবাজারের বাঙালি "নুন" বললেও ওয়েটার তাকে "সল্ট সার্ভ" করছে, বৌবাজারের মেয়ের বিয়ের দিন সকালে মণ্ডপে "গায়ে হলুদ" এর জায়গায় বড়বড় করে লেখা থাকছে "হলদি", আজন্মকাল যাবৎ দেখে আসা বাঘছাল পরা "শিব" আচমকাই পেশীবহুল "মহাকাল" হয়ে যাচ্ছেন, গোটা ছোটবেলা উঠতে বসতে হনুমান বলে গাল শোনা ভদ্রলোক ইদানীং সকালে উঠে ব্লুটুথে হনুমান চালিশা শুনে গ্রীন টি খাচ্ছেন...

আরে বাবা, ভাষা মানে তো আর শুধু কয়েকটা লব্জ নয়, একটা গোটা সংস্কৃতি দাঁড়িয়ে থাকার পেছনে ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। আজ আমাদের বাংলা ভাষা সব দিক থেকেই কোণঠাসা - না সেটা হইহই করে উদযাপিত হয়, না সেটার কদর করা হয়, না সেটার চর্চা হয় বা চর্চা করার জন্য মানুষকে উৎসাহিত করা হয়।

মায়ের ভাষা বলতে যে ভালোবাসা বা ভালোলাগাটা মনের মধ্যে চারিয়ে যায়, সেটার শুরু ঐ হুকুমতের পোস্টার... সেই প্রথম বুঝেছিলাম পনেরো দিন পরে বাংলা হরফ দেখার পরে যে ভালোলাগাটা জন্মায় সেটাই ভাষাটার প্রতি ভালোবাসা।

যারা নিয়মিত কলকাতা মেট্রো চড়েন, তারা বাদ দিয়ে মুর্শিদাবাদের বা আরামবাগের একজন গড়পড়তা বাঙালিকে জিজ্ঞেস করে দেখবেন তো " এখানে অগ্নিশমন যন্ত্র উপলব্ধ আছে" কথাটার মানে কি? কেউ এক ধাক্কায় বলতে পারবে না; মাথা চুলকোবে - অগ্নি মানে জানি, শমন মানে জানি কিন্তু দুটোকে মিলিয়ে দিলে যে বকচ্ছপটি জন্ম নিল সেটা কি? এত ঝঞ্ঝাট না পাকিয়ে "এখানে আগুন নেভানোর যন্ত্র আছে" লিখলে কি আগুন নিভবে না?

আসলে, আমরা নিজেরা নিজেদের ভাষা নিয়ে এতটাই উদাসীন যার ফলে খুব সহজেই আমাদের ভাষাকে নিয়ে যা ইচ্ছে করা যায় - কেউ ভাবেও না, সবথেকে বড় কথা অভিভাবকরাও মাথা ঘামান না; ফলে একটা বাচ্চা যখন তার বন্ধুকে বলে "চল এই গেমটা খেলি মজা আসবে"; তখন কেউ তাকে শুধরে দিয়ে বলে না যে হিন্দিতে "মজা আয়েগা" হলেও বাংলা কথ্য ভাষায় মজা "আসে" না, মজা হয়; কোনো অনুষ্ঠানের শুরু বোঝাতে ইদানিং ব্যবহৃত হয় "কটা দিয়ে শুরু?" আজ্ঞে না, ওটা ভুল ব্যবহার, হিন্দিতে "কব সে" হলেও বাংলায় ওটা "ক'টা থেকে" হবে ...

ভাষা মানে তো আর শুধু কয়েকটা লব্জ নয়, একটা গোটা সংস্কৃতি দাঁড়িয়ে থাকার পেছনে ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। আজ আমাদের বাংলা ভাষা সব দিক থেকেই কোণঠাসা

এই অনুশীলনটারই অভাব হচ্ছে আর এই ছিদ্রটা দিয়েই যেটা ঢুকে যাচ্ছে সেটা হল কবীর সুমনের লব্জে "মুৎসুদ্দীর ফাটকা পুঁজির জোরে, বিপন্ন আজ তোমার বাংলা ভাষা..."

বাংলা ভাষা বাঁচাতে হলে আমাদের নামতে হবে, আমরা যারা পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতায় বাস করি, প্রত্যেকটা চ্যানেলের সন্ধ্যাবেলার ডিবেট যে স্টুডিওগুলোতে হয় সেগুলো কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে, আমাদের বলা কথাই ছড়িয়ে যায় গোটা রাজ্যে এমনকি বাইরেও... বাংলা ভাষার মাপকাঠি ঠিক করি আমরা ফলে দায়ও আমাদেরই। এইটুকু তো নিজেরা ভেবে নিতেই পারি, রিলের বাংলা নয়, রিয়েল বাংলাটা বলব - ছোটবেলা থেকে শোনা বাংলাটাই বলব - তাহলেই দেখবেন অর্ধেক ঝামেলা মিটে যায়।

বাংলা এমন কিছু কঠিন না, বাংলা ভাষায় কোনো লিঙ্গভেদ নেই - " যাতি হুঁ ম্যায়.. " গাইতে গেলে অলকা ইয়াগ্নিককেই লাগবে, শানুকে দিয়ে হবে না কিন্তু লোপামুদ্রা মিত্র বা শ্রীকান্ত আচার্য চাইলেই "চলেছি একা, কোন অজানায়..." গাইতে পারবেন, অসুবিধে হবে না... ভাবতে পারছেন আপনার - আমার ভাষাটা কতটা আধুনিক, কতটা প্রগতিশীল?

আসলে, আমরা নিজেরা নিজেদের ভাষা নিয়ে এতটাই উদাসীন যার ফলে খুব সহজেই আমাদের ভাষাকে নিয়ে যা ইচ্ছে করা যায় - কেউ ভাবেও না, সবথেকে বড় কথা অভিভাবকরাও মাথা ঘামান না ;

তবে হ্যাঁ, রাত পোহালেই ২২শে ফেব্রুয়ারি - মাতৃভাষা নিয়ে ভাবার দিন আবার একবছর পরে আসবে... আর এর পরেই ভোটের মরশুম, ফলে "বঙ্কিমদা" বা "সতীদাহ প্রথা"র "পতিদাহ"তে রূপান্তরের আরো পরিমার্জিত সংস্করণ আমরা দেখতে পাব বলেই আশা রাখি... তারপরেই আসবে আরেকটা ২১শে, উঁহু, ফেব্রুয়ারি নয়, জুলাই... চুপ করে থাকতেই পারেন, একদিন হঠাৎ চোখ খুলে দেখবেন বাংলা ভাষাটাও কখন যে এপাং - ওপাং - ঝপাং হয়ে গেছে, টের পান নি...

তখন না হয় সিদ্ধান্ত নেবেন যে বাংলা ভাষাটাকে চুল্লিতে তুলবেন না চিতায় - ততদিন ঘুমোতেই পারেন বা রিল দেখতে...

ছবি প্রতীকী
"আজি ভুসুকু বঙ্গালী ভইলী"
ছবি প্রতীকী
চিঠিতে বাংলাকে 'বাংলাদেশী ভাষা' উল্লেখ! 'নিরক্ষর' দিল্লি পুলিশকে সংবিধান পাঠের পরামর্শ CPIM-তৃণমূলের

SUPPORT PEOPLE'S REPORTER

ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন

Related Stories

No stories found.
logo
People's Reporter
www.peoplesreporter.in