

তখন নরম সরম রোদ এসে পড়েছিলো উঠোনে। বারো ঘরের সেই একটিমাত্র উঠোন। সেখানেই একদিন আশুথ গাছের গুঁড়িতে বসে ডোম লিখেছিলো, নগরের বাহিরে ‘ডোম্বি তোহোরি কুড়িআ’। সেই শুরু থেকেই এই প্রান্তিকায়িত করে রাখার অদ্ভুত প্রক্রিয়া চলছে। অস্ট্রিক জাতির তাম্রবর্ণের মানুষ সব। আর্যরা এদেশে এসে দীর্ঘদিন তো খেয়ালই করেনি এই ভূখন্ড ও ভূখন্ডের মানুষকে। ঋগ্বেদ লেখা হয়ে গেলো। শবর শবরী তখনও কঙ্গুচিনা পেকে ওঠার গন্ধে টের পায়, বসন্ত এসেছে। ঐতরেয় আরণ্যকে লেখা হ’ল, “যা বৈ তা ইমাঃ প্রজাস্তিস্রো অত্যায়মায়ংস্তানীমানি বয়াংসি বঙ্গ-মগধাশ্চেরপাদাঃ”।
উন্নত নাসিকা নেই, দীর্ঘদেহী নয়, গাত্রবর্ণ তামাটে। রমণীও ততটা ম্রিয়মাণ। “মোরঙ্গী পীচ্ছ পরহিণ সবরী গিবত গুঞ্জরীমালী”। তখন টিলার ওদিকে সূর্য ডুবছে। বাড়ি ফিরবে শবর। শবরীর তো আর্যাবর্তের আর পাঁচটা মেয়ের মতো সোনা রূপোর অলঙ্ক নেই। সে অরণ্যে কুড়িয়ে পেয়েছে ময়ূরের একটা পালক। সেই পালক গুঁজেছে খোঁপায়। সূর্যাস্তের নরম আলো ঝিকিয়ে উঠছে তার চকচকে কৃষ্ণবর্ণ কপোলে, চিবুকে। তখন আর্যাবর্তে ভক্তিরস প্রবল। রাজকীয় সম্মানে ভূষিত সংস্কৃত চর্চাকারী কবিরা। সেখানে যেমন ভক্তি থাকবে, তেমনি থাকবে রাজসভাকে তুষ্ট করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রগলভতা। সবই হবে মাপ অনুসারে, ব্যাকরণ মেনে।
বাংলার সেই বারো ঘরের উঠোনে তখন উড়ে বেড়াচ্ছে বুড়ির সুতো। কাপাস ফেটেছে। জীবনও তেমনটাই সহজ ঠেকে কবির কাছে। আনন্দ, প্রেম, সমস্যা, যন্ত্রণা, সবটাই হৃদয়ের গভীর থেকে উঠে আসা। রাজসভাকে খুশি করার দায় নেই। নিয়ম লঙ্ঘনের ভয়ে তটস্থ থাকতে হয়না সদা সর্বদা। বাঙালি কবি সাহসী। লিখে ফেলবে এই বসন্তে পাগল পাগল শরীর ও মনের কথা। “জোইনি তঁই বিনু খনহিঁ ন জীবমি। তো মুহ চুম্বী কমল রস পীবমি”। আমরা তো ইড়া, পিঙ্গলা জানিনা, দেখতে পাই শবরের নির্মল জীবনবোধ।
নদীর সঙ্গে এই যোগাযোগ তো সেই চর্যাপদের কাল থেকেই। বর্ষার জলে যখন দু-কূল ছাপিয়ে খরস্রোতা হয়েছে সে, কবি চাটিলপাদ তখন নিজেও ভাসছেন মনে মনে।
নদীর ধারে বাস তার। এই বাংলার কবি একদিন অনেকটা সময় পেরিয়ে এসে লিখবেন, ‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে – এই বাংলায়।’ নদীর সঙ্গে এই যোগাযোগ তো সেই চর্যাপদের কাল থেকেই। বর্ষার জলে যখন দু-কূল ছাপিয়ে খরস্রোতা হয়েছে সে, কবি চাটিলপাদ তখন নিজেও ভাসছেন মনে মনে। দাদুরী, ঝিল্লি, ময়ূরের আবেদনে প্রকৃতিতে যখন প্রেমের জোয়ার, বাংলা কবিতায় লেখা হলো সেই আখর। “ভবণই গহণ গম্ভীর বেগেঁ বাহী। দুআন্তে চিখিল মাঝেঁ ন থাহী॥” এত কথা বলতে বসেছি কেননা বাংলা বইয়ের পাতা পিছনের দিকে ওলটাতে ওলটাতে শিকড়ে পৌঁছতে চাই।
ভাষা তো ভুঁইফোঁড় নয়। মানুষ যে ভাষায় কথা বলে, হাজার হাজার বছর ধরে নানা পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে সেই ভাষা আজকের অবয়ব পেয়েছে।
ভাষা তো ভুঁইফোঁড় নয়। মানুষ যে ভাষায় কথা বলে, হাজার হাজার বছর ধরে নানা পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে সেই ভাষা আজকের অবয়ব পেয়েছে। ভাষাবিজ্ঞানের সুনির্দিষ্ট নিয়ম আছে। মাতৃভাষার সঙ্গে জড়িয়ে আছে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ভূ-প্রকৃতি সমস্তটাই। একদিন বাঙালিকে জোর করে অন্যভাষা বলানোর চেষ্টা হয়েছিলো, বয়াংসি অর্থাৎ পাখির মতো ছোটোখাটো বাঙালির মধ্যে যে ভীষণ প্রতিরোধ ক্ষমতা রয়েছে, সম্ভবত আঁচ করতে পারেনি তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের শাসক।
বাংলাভাষা নিয়ে, এই ভাষায় বাঙালির সাহিত্য সংস্কৃতির চর্চা নিয়ে বাঙালি যে একটু বেশিই গর্বিত এমনটাই শুধুমাত্র নয়। আত্মাভিমান আছে, কিন্তু বাস্তবতাও কম নেই এই উপলব্ধির পিছনে।
শাসক কোনোকালেই বাঙালিকে বুঝতে পারেনা। চাপিয়ে দিতে চায় তার প্রবল আদেশ। যেমনটা ভাষার ক্ষেত্রে তেমনি চরিত্রগতভাবেও কাঁটাতারে বিভক্ত দুটি দেশের বাঙালির অনুভবে শাসকের এই চাপিয়ে দেবার আর তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলবার অনিবার্যতা আছে। বাংলাভাষা নিয়ে, এই ভাষায় বাঙালির সাহিত্য সংস্কৃতির চর্চা নিয়ে বাঙালি যে একটু বেশিই গর্বিত এমনটাই শুধুমাত্র নয়। আত্মাভিমান আছে, কিন্তু বাস্তবতাও কম নেই এই উপলব্ধির পিছনে।
খুব সাম্প্রতিক একটা ঘটনার কথা বলি। এক আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফুটবল দলের ফেসবুক পেজে দিনকয়েক আগে তাদের ফুটবল দলের চলমান ছবি দেওয়া হয়েছে। সুকুমার রায়ের লেখা, তবলা বাদক রাতুল বসাকের বাজানো ‘হাট্টিমা টিম টিম’ কবিতার তালে তালে। অতএব, বাঙালি এবং বাংলা ভাষা নিজস্ব স্বভাবেই রয়ে গেছে। কিন্তু পাশাপাশি দমনপীড়নও আছে। এই তো মাসকয়েক আগে। এক রাজনৈতিক দলের এক ওজনদার নেতা বাড়ি তৈরির কাজ করতে থাকা বাঙালি শ্রমিকরা যখন নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলো বাংলায়, তিনি বুঝে ফেলেছিলেন, এঁরা নাকি বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী।
এই তো মাসকয়েক আগে। এক রাজনৈতিক দলের এক ওজনদার নেতা বাড়ি তৈরির কাজ করতে থাকা বাঙালি শ্রমিকরা যখন নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলো বাংলায়, তিনি বুঝে ফেলেছিলেন, এঁরা নাকি বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী।
কাঁটাতারের ওইদিকে বাঙালির একটা দেশ আছে। সে দেশে যখন ধর্মের নামে রক্ত ঝরে, দীপু দাস নামের বাঙালি যুবকটিকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়, আমাদের বাংলা বইয়ের পাতা রক্তে ভিজে যায়। উড়িষ্যাতে বাঙালি হবার অপরাধে প্রাণ দিতে হল মুর্শিদাবাদের জুয়েল রাণাকে। বিছিন্ন ঘটনা বললে মানবো না। ধারাবাহিকভাবে বাঙালির রক্ত ঝরছে তো ঝরছেই।
একটা স্বাভাবিক নিরাময় কিন্তু আছে। ‘ব্যাঘাত আসুক নব নব, আঘাত খেয়ে অটল রব’। দাঁড়াবার, ঘুরে দাঁড়াবার মন্ত্রও লেখা আছে বর্ণমালায়। যতবার মারণমন্ত্র জপ করবে শাসক অথবা পুঁজিবাদ, ততবার বিশল্যকরণী খুঁজে নিয়ে ভুসুকু বলনে, ‘আজি ভুসুকু বাঙালি ভইলি’।
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন