WB Election 26: কংগ্রেসের 'একলা চলো' ভাবনা আদৌ বাস্তবসম্মত? নাকি সবটাই আবেগতাড়িত?

People's Reporter: রাজ্যে বাম কংগ্রেস জোটের সবথেকে বড়ো সমস্যা পারস্পরিক দোষারোপ। একমাত্র ২০১৬-র বিধানসভা নির্বাচন ছাড়া এরকম আর কোনও নির্বাচন হয়নি যেখানে বাম কংগ্রেসের পারফরমেন্স খুব ভালো।
প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার
প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকারছবি, গ্রাফিক্স আকাশ
Published on

প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি হবার পর থেকে শুভঙ্কর সরকার বারবার রাজ্যে কংগ্রেসের একক শক্তি বৃদ্ধির পক্ষে সওয়াল করেছেন। রাজ্য সভাপতি হবার পরপরই ২০২৪-এর অক্টোবর মাসে পিপলস রিপোর্টার-কে দেওয়া এক এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারেও তিনি সেকথাই জানিয়েছিলেন। মাস ছয়েক আগেও এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি জানিয়েছিলেন “২৯৪ আসনেই একক শক্তিতে লড়াই করতে চায় কংগ্রেস।” “আমি কোনও জোটের কথা ভাবছি না”। আর এবার নির্বাচনের বছরেও সেই একই কথা উঠে এল কংগ্রেসের অন্দর থেকে। সিপিআইএম নির্ভরতা কমিয়ে একক শক্তিতেই লড়াই করতে চাইছে কংগ্রেস। চূড়ান্ত বলার সময় না এলেও এখনও পর্যন্ত যা গতিপ্রকৃতি তাতে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে সম্ভবত একক শক্তিতেই লড়াই করতে চলেছে কংগ্রেস।

২০২৪ লোকসভা নির্বাচন ও রাজ্যে কংগ্রেসের ফলাফল

বিগত কয়েক মাসে রাজ্যে কংগ্রেসের কতটা শক্তি বৃদ্ধি হয়েছে তা বলা না গেলেও, কংগ্রেসের নীচ তলা পর্যন্ত কিছুটা যে নড়াচড়া হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলের দিকে চোখ রাখলে দেখা যাবে কংগ্রেসের প্রাপ্ত ভোট ছিল ৪.৭০ শতাংশ। কংগ্রেস লড়াই করেছিল ১২ আসনে। যার মধ্যে মালদায় একটি মাত্র আসনে জয়ী হয় কংগ্রেস। যদিও সেবার বাম কংগ্রেস জোট করেই লড়েছিল কংগ্রেস এবং সম্মিলিতভাবে বাম কংগ্রেস জোটের প্রাপ্ত ভোটের হার ছিল ১১ শতাংশ।

জেলাওয়াড়ি হিসেবে গত লোকসভা নির্বাচনে বামেদের সঙ্গে নিয়ে যে ১২ আসনে কংগ্রেস লড়াই করেছিল তাঁর মধ্যে সবথেকে বেশি ভোট পেয়েছিল মালদহ দক্ষিণ কেন্দ্রে, ৫,৭২,৩৯৫ ভোট। অধীর চৌধুরীর গড় বলে চিহ্নিত মুর্শিদাবাদের বহরমপুর এবং জঙ্গীপুর আসনে কংগ্রেসের প্রাপ্ত ভোট ছিল যথাক্রমে ৪,৩৯,৪৯৪ এবং ৪,২৭,৭৯০। হতাশাব্যঞ্জক ফলাফল ছিল কোচবিহার, কাঁথি, বনগাঁ, দার্জিলিং, উলুবেড়িয়া প্রভৃতি কেন্দ্রে। যেসব কেন্দ্রের প্রতিটিতেই ১ লক্ষেরও কম ভোট পেয়েছিল কংগ্রেস প্রার্থীরা।

বাম কংগ্রেস জোট - অতীত ও বর্তমান

এই রাজ্যে বাম কংগ্রেস জোটের সবথেকে বড়ো সমস্যা পারস্পরিক দোষারোপ। একমাত্র ২০১৬-র বিধানসভা নির্বাচন ছাড়া এরকম আর কোনও নির্বাচন হয়নি যেখানে বাম কংগ্রেসের পারফরমেন্স খুব ভালো। কিন্তু সেইসময় থেকে এখনও পর্যন্ত চলছে অভিযোগ পাল্টা অভিযোগের পর্ব। বাম কর্মী সমর্থকদের অভিযোগ, তারা কংগ্রেসের হয়ে খেটে ভোট বৈতরণী পার করার চেষ্টা করলেও কংগ্রেসের পক্ষ থেকে সেই উদ্যোগ দেখা যায় না। সোজা কথায়, বাম সমর্থকরা কংগ্রেসকে ভোট দিলেও কংগ্রেস সমর্থকরা বাম প্রার্থীদের ভোট দেননা। অনেকেরই বক্তব্য, বামেরা একক শক্তিতে লড়াই করলে অনেক ভালো ফলাফল হবে। অন্যদিকে বহু গোঁড়া কংগ্রেস সমর্থকের প্রশ্ন, বামেদের সাথে জোট কেন? এই জটিলতা, ধাঁধা আজও কাটেনি। ফলে ওপরতলা থেকে জোটের সিদ্ধান্ত বারবার চাপিয়ে দেওয়া হলেও সেই বার্তা নীচ পর্যন্ত পৌঁছে দিতে ব্যর্থ দুই দলের নেতারাই।

জোট রাজনীতির এই সময়ে বাম বা কংগ্রেস কর্মীদের এই ভাবনা কতটা বাস্তবসম্মত আর কতটা আবেগতাড়িত তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে, করা যেতে পারে বিশ্লেষণও। কিন্তু শুধুমাত্র ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেই আলোচনা করে রাজ্যের দুই প্রবল ক্ষমতাবান শক্তি তৃণমূল এবং বিজেপির মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। সরল পাটিগণিত বোঝে সরল অঙ্ক। সেই হিসেবে জোট না হবার অর্থ বিরোধী ভোট ভেঙে ছত্রখান হওয়া। কারণ এই মুহূর্তে শুধুমাত্র মালদা অথবা মুর্শিদাবাদের কয়েকটি আসন ছাড়া রাজ্যে এরকম কোনও আসন খুঁজে পাওয়া মুশকিল যেখানে একক শক্তিতে কংগ্রেস লড়াই করে জেতার মত অবস্থায় আছে। বামেদের ক্ষেত্রেও সেই ধরণের সম্ভাবনাময় আসন হাতেগোণা।

একক শক্তিতে লড়াই ও দু'একটি কথা

একক শক্তিতে লড়াই করতে চাওয়া খুব ভালো কথা। তা হলে অন্তত রাজ্যের কংগ্রেস এবং বাম কর্মী সমর্থকরা বুঝতে পারবেন তাদের পায়ের তলায় মাটি ঠিক কতটা আছে। এই চরম প্রতিষ্ঠান বিরোধী হাওয়ার সময়েও একক একক ভাবে লড়াই করে কংগ্রেস বা বামেদের পক্ষে খুব একটা ভালো ফলাফল করার সম্ভাবনা নেই। একথা অস্বীকার করার কোনও জায়গা নেই যে, বামেদের এই মরা বাজারেও রাজ্যের সমস্ত বুথে এখনও কিছু সিপিআইএম কর্মী সমর্থক খুঁজে পাওয়া যাবেই। যা কংগ্রেসের ক্ষেত্রে, এমনকি বিজেপির ক্ষেত্রেও পাওয়া যাবেনা।

সোমবার প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার গত সোমবার রাজ্যের দলীয় পদাধিকারীদের সঙ্গে যে বৈঠক করেছেন তাতে বহু জেলা থেকেই একলা চলো রে-র কথা বলা হয়েছে। বিচ্ছিন্ন দু’একটা জেলা ছাড়া সকলেরই বক্তব্য একা লড়ার। বহু জেলা নেতৃত্বেরই বক্তব্য এবারের নির্বাচনে একক শক্তিতে লড়াই করা উচিত। তাতে নিজেদের অবস্থা বোঝা যাবে। হাতে গোনা দু’একজন অবশ্য জানিয়েছেন, জোট যদি করতেই হয় সেক্ষেত্রে সিপিআইএম-এর সঙ্গে করাই ভালো।

পশ্চিমবঙ্গে বাম কংগ্রেস জোট রাজনীতি

২০১১ সালে তৃণমূলের সঙ্গে জোট করে রাজ্যে পালাবদলের পর এক বছর কাটতে না কাটতেই সুর কেটে যায় জোটের। কিছুদিনের মধ্যেই সরকার ছেড়ে বেরিয়ে আসে কংগ্রেস। যদিও আজ পনেরো বছর পরে দাঁড়িয়ে কংগ্রেসের অনেক শীর্ষ নেতৃত্বই মনে করেন তৃণমূলের সঙ্গে সমঝোতা করে কিছু আসন বের করে নেওয়া ভালো। আর দিল্লির কংগ্রেস নেতৃত্ব মনে করেন বিজেপি আটকানোর কাজ ভালোভাবেই করছে তৃণমূল। তাই এই মুহূর্তে এমন কোনও পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত নয় যাতে তৃণমূল বিব্রত হয়। ফলে দিল্লি থেকে কোনওসময়েই তৃণমূল বিরোধী সুর চড়ানো হয়নি। এমনকি দিল্লির যেসব মুখ বাংলায় কংগ্রেস কর্মীদের কাছে পরিচিত এবং গ্রহণযোগ্য, তারাও তৃণমূলের বিষয়ে খুব একটা মুখ খোলেননা। অন্যদিকে প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি তৃণমূল বিরোধিতা তথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতায় যতটা একগুঁয়ে ছিলেন, সেই ধরণের একরোখা মনোভাব শুভঙ্কর সরকারের আচরণে দেখা যায় না। বরং তা বেশ কিছুটা নরম।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে এই মুহূর্তে যদি আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস একক শক্তিতে লড়তে যায় তা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হতে পারে। কারণ সেই একই। সাংগঠনিক দিক থেকে একেবারে তলানিতে থাকা কংগ্রেসের সংগঠন। যে সংগঠন দিয়ে ২৯৪ আসনে লড়াই করার সিদ্ধান্ত কতটা বাস্তবসম্মত তা নিয়ে প্রশ্ন থাকবেই। বরং সে ক্ষেত্রে নিজের নাক কেটে পরের যাত্রাভঙ্গটাই না বেশি হয়ে যায়। খুঁজে পেতে ২৯৪ আসনে প্রার্থী হয়তো দিয়ে দিতে পারবে কংগ্রেস। কিন্তু তারা কতজন আদৌ লড়াই দেবার জন্য ফিট প্রশ্ন থাকবে তা নিয়েও। আসন বের করে নিয়ে আসা তো অনেক পরের প্রশ্ন। লোকসভা নির্বাচনের ৪.৭% ভোটও নিজেদের ঘরে ঢুকবে কিনা প্রশ্ন থাকবে তা নিয়েও।

প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার
১০০ দিনের কাজে মুছে যাচ্ছে গান্ধীজির নাম! বাড়ছে দিনসংখ্যাও, কেন্দ্রের সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ কংগ্রেস
প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার
Video: পিপলস রিপোর্টারের মুখোমুখি পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার

SUPPORT PEOPLE'S REPORTER

ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন

Related Stories

No stories found.
logo
People's Reporter
www.peoplesreporter.in