UGC: ইউজিসি-র নতুন সমতা বিধি নিয়ে বিতর্ক: কেন প্রতিবাদে উচ্চবর্ণের শিক্ষার্থী ও বিজেপি নেতৃত্ব?

People's Reporter: উচ্চশিক্ষায় বৈষম্য রোধে চালু ‘ইক্যুইটি রেগুলেশনস, ২০২৬’-এর বিরুদ্ধে দেশজুড়ে প্রতিবাদ। অপব্যবহারের আশঙ্কা তুলে নিয়ম প্রত্যাহারের দাবি, সুপ্রিম কোর্টে দায়ের PIL।
ইউজিসি
ইউজিসিফাইল ছবি দ্য প্রিন্ট-এর সৌজন্যে
Published on

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (University Grants Commission – UGC) নতুন নিয়মের বিরুদ্ধে উচ্চবর্ণের শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিজেপির একাধিক উচ্চবর্ণের নেতৃত্বের প্রকাশ্য প্রতিবাদে বিষয়টি আরও জটিল আকার ধারণ করছে। এই বছরের ১৩ জানুয়ারি ইউজিসি ‘ইক্যুইটি ইন হায়ার এডুকেশন ইন্সটিটিউশন রেগুলেশনস, ২০২৬ চালু করেছে। ইতিমধ্যেই এই বিধির বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছে (Public Interest Litigation - PIL)।

উত্তরপ্রদেশ সহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ইউজিসি-র বিধির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ কেন?

উত্তরপ্রদেশের উচ্চ বর্ণের বিজেপি নেতারা ইতিমধ্যেই এই বিধির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেছেন। নতুন এই বিধিকে ‘কালা আইন’ (Black Laws) বলেও তারা অভিহিত করেছেন। একাধিক বিজেপি নেতা ইউজিসি-র বিধির প্রতিবাদে পদত্যাগ করেছেন বলেও জানা গেছে। তাঁদের মতে উচ্চশিক্ষায় বৈষম্য দূর করার কথা বলে এই বিধি জারি করা হলেও এই বিধি আসলে উচ্চবর্ণের বিরোধী।

লখনৌতে এই আইনের বিরুদ্ধে করণী সেনার মিছিলের পর জটিলতা আরও বেড়েছে। বিক্ষোভকারীদের দাবি অবিলম্বে এই নিয়ম প্রত্যাহার করতে হবে। উচ্চবর্ণভুক্ত বিজেপির প্রবীণ নেতা কলরাজ মিশ্র ইউজিসি-র নয়া বিধির বিরোধিতা করে তা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। এই বিধির বিরুদ্ধে লখনৌ, রায়বেরিলি, বনারস, প্রয়াগরাজ, আগ্রা প্রভৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ দেখিয়েছে বিজেপি প্রভাবিত ছাত্র সংগঠন। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, নতুন এই বিধিতে প্রাতিষ্ঠানিক কমিটিগুলোকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। মিথ্যে অভিযোগ থেকে রক্ষা পেতে কোনও সুনির্দিষ্ট সুরক্ষা ব্যবস্থা নেই। ফলে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এই বিধির অপব্যবহারের সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে।

বিজেপির উচ্চবর্ণের নেতৃত্ব এবং ছাত্র সংগঠনের অভিযোগ, সমতার নামে এই নিয়ম উচ্চশিক্ষায় বিভাজন নিয়ে আসবে। উচ্চবর্ণ বিরোধী ইউজিসি-র নয়া বিধি প্রত্যহারের দাবিতে এদিন উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন জায়গায় মিছিল হয়েছে। এই বিধি পুনর্বিবেচনা করা না হলে আন্দোলন আরও তীব্র হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছে বিজেপি যুব মোর্চা।

রোহিত ভেমুলা ও পায়েল তাদভির ঘটনা

হায়দ্রাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক রোহিত ভেমুলা ২০১৬ সালে আত্মহত্যা করেন। অভিযোগ তিনি জাতিভিত্তিক হয়রানির শিকার হয়েছিলেন। ২০১৯ সালে, মুম্বাইয়ের টোপিওয়ালা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ এবং বিওয়াইএল নায়ার হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক পায়েল তাদভি আত্মহত্যা করেন। তাঁর ক্ষেত্রেও সিনিয়রদের বিরুদ্ধে জাতিগত হয়রানির অভিযোগ ছিল।

ভারতের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতিগত বৈষম্য - তথ্য কী বলে?

ইউজিসি-র তথ্য অনুসারে গত পাঁচ বছরে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্ণ বৈষম্যের অভিযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে ১১৮ শতাংশ। হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৯-২০ সালে এই ধরণের ঘটনার সংখ্যা যেখানে ছিল ১৭৩, ২০২৩-২৪-এ তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭৮। ওই প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৯-২০ থেকে ২০২৩-২৪-এর মধ্যে দেশের ৭০৪টি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১,৫৫৩টি কলেজ থেকে ইউজিসি-র কাছে এই সংক্রান্ত ১১৬০টি অভিযোগ জমা পড়েছে।

ইউজিসি-র নতুন বিধিতে কী বলা হয়েছে?

ইউনিভার্সিটি গ্রান্টস কমিশন (উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সমতা প্রতিষ্ঠা) রেগুলেশনস, ২০২৬, বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজ জুড়ে সুবিধাবঞ্চিত গোষ্ঠীগুলোর জন্য অভিযোগ নিষ্পত্তি, অন্তর্ভুক্তি এবং সহায়তার জন্য একটি কাঠামোগত রূপরেখা তৈরি করেছে।

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের ভিত্তিতে এই বিধিমালা তৈরি করা হয়েছে। রোহিত ভেমুলা এবং পায়েল তাদভির মায়েদের পক্ষ থেকে দায়ের করা পিটিশনের শুনানির সময় এই ধরণের ঘটনা রোধ করতে ইউজিসিকে সুনির্দিষ্ট বিধি জমা দিতে বলা হয়। এই পিটিশন ২০১২ সালের ইউজিসি-র বৈষম্যবিরোধী বিধিমালা বাস্তবায়নের সঙ্গে সম্পর্কিত।

ইউজিসি-র নতুন এই বিধির মূল লক্ষ্য উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্য প্রতিরোধ এবং সময়মতো প্রতিকার নিশ্চিত করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

সূত্র অনুসারে, ইউজিসি-র নতুন বৈষম্যবিরোধী বিধিমালা নিয়ে বিতর্কের জেরে শিক্ষা মন্ত্রক দ্রুত তাদের অবস্থান স্পষ্ট করবে বলে জানা গেছে।

নতুন কাঠামোর অধীনে দেশের সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজে সমতা কেন্দ্র (Equal Opportunity Centres), সমতা কমিটি (Equity Committee), অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা (Grievance Redressal Mechanism) এবং ২৪ × ৭ হেল্পলাইন চালু করতে হবে। এই সংস্থাগুলিকে তফশিলি জাতি (SC), তফশিলি উপজাতি (ST) এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণীর (OBC) শিক্ষার্থীদের অভিযোগের সমাধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।  

মূলত তফশিলি জাতি, তফশিলি উপজাতি এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণী তথা প্রান্তিক সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীদের সহায়তার জন্য এই বিধি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলি এই নিয়মবিধি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত করছে কিনা তা নিশ্চিত করবে ইউজিসি।

হেল্পলাইনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বর্ণ ভিত্তিক বৈষম্য বিষয়ক অভিযোগ জানাতে পারবে। অভিযোগের পর এই বিষয়ক কমিটি অভিযোগ খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেবে।

ইউজিসি-র নতুন বিধির বিরোধীদের কী অভিযোগ?

যদিও এই বিধি সম্পর্কে বিরোধীদের অভিযোগ, এই বিধির ক্ষেত্রে অপব্যবহারের সম্ভাবনা থেকে যায় এবং মিথ্যা অভিযোগ আনা হলে তা কীভাবে তা খতিয়ে দেখা হবে তা স্পষ্ট নয়। দ্বিতীয়ত, এই কমিটিগুলিতে তফসিলি জাতি (এসসি), তফসিলি উপজাতি (এসটি), অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণী (ওবিসি), মহিলা এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ইক্যুইটি কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। যেখানে সাধারণ শ্রেণীভুক্ত শিক্ষার্থীদের কোনও প্রতিনিধিত্ব নেই। ফলে বিচারের ক্ষেত্রে ভারসাম্যের অভাব হতে পারে। অন্যদিকে, ছাত্রদের একাংশের মতে, এর ফলে শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট হবে।

ইউজিসি
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে মোদীর ছবি! UGC-র নির্দেশিকা অমান্য করার অভিযোগ শিক্ষক সংগঠনের
ইউজিসি
UGC: এমফিল কোর্সের বৈধতা থাকছে না, আর ভর্তি নয় - সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশ ইউজিসি-র

SUPPORT PEOPLE'S REPORTER

ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন

Related Stories

No stories found.
logo
People's Reporter
www.peoplesreporter.in