

নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর ১ মাস ৪ দিনের মাথায় তিন টুকরো হয়ে গেল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিষ্ঠিত তৃণমূল। ১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি কংগ্রেস ভেঙে যেভাবে তিনি তৃণমূল গঠন করেছিলেন এবং নিজের দিকে কংগ্রেসের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠিত শীর্ষ নেতৃত্বকে টেনে এনেছিলেন অনেকটা সেভাবেই ভেঙে খান খান হয়ে গেল তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল। যে দলের ওপর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আর কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। হয়তো দলের নাম এবং প্রতীকও আর তাঁর কাছে থাকবে না।
কিন্তু এই মুহূর্তে সব থেকে বড়ো প্রশ্ন তৃণমূল ঠিক ক’ভাগে ভাগ হল? দু’ভাগ? নাকি তিনভাগ? রাজ্যের ভাগাভাগি এবং কেন্দ্রের ভাগাভাগিকে আলাদা আলাদা ভাবে ধরলে এই মুহূর্তে তৃণমূল তিন টুকরো। একভাগের নেতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, একভাগের ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অন্য একভাগের নেতা কাকলী ঘোষ দস্তিদার।
আপাতত সাদা চোখে তৃণমূলের যে স্পষ্ট তিন বিভাজন দেখা যাচ্ছে তাতে এখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে আছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, দোলা সেন, সাগরিকা ঘোষ, মেনকা গুরুস্বামী, ডেরেক ও ব্রায়েন, মালা রায়, কীর্তি আজাদ, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, মদন মিত্র, কুণাল ঘোষ, বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখেরা। এই তালিকায় যদিও গতকাল পর্যন্ত ফিরহাদ হাকিম ছিলেন, কিন্তু আজই তিনি যেহেতু রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দলনেতা, বিদ্রোহী ও বহিষ্কৃত তৃণমূল বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে গিয়ে দেখা করেছেন, তাই রাজনৈতিক মহল মনে করছে তিনিও এবার শিবির বদল করতে চলেছেন।
রাজ্যের ভাগাভাগি এবং কেন্দ্রের ভাগাভাগিকে আলাদা আলাদা ভাবে ধরলে এই মুহূর্তে তৃণমূল তিন টুকরো। একভাগের নেতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, একভাগের ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অন্য একভাগের নেতা কাকলী ঘোষ দস্তিদার।
এরপর ধরা যাক দ্বিতীয় ভাগ। যেখানে এখনও পর্যন্ত বলা হচ্ছে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ৫৮ জন বিধায়কের সমর্থন আছে। বিধানসভায় বিরোধী দলনেতার প্রস্তাব প্রসঙ্গিত সই কান্ডে দল থেকে তিনি এবং সন্দীপন সাহা বহিষ্কৃত হবার পর রাতারাতি তৃণমূল শিবিরে ভাঙন ধরান এবং দলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৫৮ জনকে নিজের পক্ষে আনতে সমর্থ হন। যদিও রাজনৈতিক মহলের মতে এই সংখ্যা এখন প্রায় ৭০ ছুঁই ছুঁই। অর্থাৎ, রাজ্যের বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে আছে ৭০ তৃণমূল বিধায়কের সমর্থন। সেক্ষেত্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূলে পড়ে থাকবেন কম বেশি ১০ জন বিধায়ক। তাঁরাও শেষ পর্যন্ত কোন দিকে থাকবেন বা যাবেন তা এখনও স্পষ্ট নয়।
এবার আসা যাক তৃণমূলের তৃতীয় ভাগে। যেখানে আছেন তৃণমূল থেকে বা তৃণমূলের হয়ে নির্বাচিত রাজ্যসভা এবং লোকসভার সাংসদরা। যাঁদের মধ্যে ইতিমধ্যেই লোকসভার ২৯ (এই মুহূর্তে ২৮) সাংসদের মধ্যে ২০ জনই নাকি কাকলী ঘোষ দস্তিদারের নেতৃত্বে এনডিএ শিবিরে যোগদান করতে চেয়েছেন। যেহেতু এই সংখ্যা দুই তৃতীয়াংশের বেশি তাই তাঁদের ওপর দলত্যাগ বিরোধী আইন প্রযোজ্য হবেনা। রাজ্যসভার ক্ষেত্রে ১৩ জন সাংসদের মধ্যে ইতিমধ্যেই ইস্তফা দিয়েছেন সুখেন্দু শেখর রায় এবং কোয়েল মল্লিক। কানাঘুষোয় শোনা যাচ্ছে, দু’একদিনের মধ্যে আরও বেশ কয়েকজন রাজ্যসভার সাংসদ বিরোধী শিবিরে নাম লেখাতে চলেছেন। অর্থাৎ এখানেও আর কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। রাজ্যসভার বিদ্রোহী শিবির কাকলী ঘোষ দস্তিদার গোষ্ঠীর হাত ধরবে নাকি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় গোষ্ঠীর হাত ধরবে তা এখনও স্পষ্ট নয়।
কিন্তু তৃণমূলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অংশ বাদ দিয়ে বাকি দুই অংশের মধ্যে আসল তৃণমূল কারা এবং তাদের রাজনৈতিক অবস্থানই বা কী? ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে থাকা তৃণমূলের যে অংশ তারা জানিয়েছেন রাজ্য বিধানসভায় বিরোধীর ভূমিকা পালন করবেন। অর্থাৎ বিজেপি বিরোধিতা বা এনডিএ বিরোধিতা। শাসকপক্ষের বিরোধিতা করবেন বলেই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বিরোধী দলনেতার পদ পেয়েছেন। তাই তারা কোনোভাবেই এনডিএ-র সঙ্গে নেই।
এবার আসা যাক কাকলী ঘোষ দস্তিদার ও শতাব্দী রায়ের নেতৃত্বে থাকা তৃণমূলের বাকি অংশ। সূত্র অনুসারে, এই গোষ্ঠী ইতিমধ্যেই লোকসভায় চিঠি লিখে জানিয়েছে, তারা এনডিএ-র শিবিরে যোগ দিতে ইচ্ছুক। অর্থাৎ রাজ্য তৃণমূলের ঋতব্রত অংশ এবং সংসদে তৃণমূলের কাকলী ঘোষ দস্তিদার গোষ্ঠীর রাজনৈতিক অবস্থান সম্পূর্ণ আলাদা হতে চলেছে। সেক্ষেত্রে তৃণমূলের তিন অংশের মধ্যে কারা আসল তৃণমূল তা যেমন স্পষ্ট নয়, তেমনই কোন গোষ্ঠী নাম এবং প্রতীক পাবেন তা স্পষ্ট নয়।
দেশের রাজনৈতিক সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি থেকে এটুকু নিঃসন্দেহে বলা যায় যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কোনোভাবেই তৃণমূলের নাম এবং প্রতীক পাচ্ছেন না। এক্ষেত্রে আদালতের দ্বারস্থ হয়েও কোনও লাভ হবার সম্ভাবনা কম। কারণ তাঁর কাছে কোনোভাবেই কোনও সংখ্যা নেই। যে সংখ্যার দাবিদার বর্তমানে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কাকলী ঘোষ দস্তিদার। এক্ষেত্রে কি তৃণমূলের এই দুই অংশের নেতা নেত্রী কোনও সমঝোতার পথে হাঁটবেন নাকি বিরোধিতার পথে তা স্পষ্ট নয়। নাকি সংসদের তৃণমূল গোষ্ঠী এনডিএ-তে থাকবেন আর রাজ্যের তৃণমূল গোষ্ঠী এনডিএ বিরোধী হিসেবে থাকবেন। নিন্দুকেরা বলে, রাজনীতিতে যে কোনও কিছুই হতে পারে! এখন সময় তাই অপেক্ষার। তিন টুকরো তৃণমূলের কে কোন দিকে যান সেটাই এখন দেখার।
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন