ভারত হারাল তার অন্যতম শ্রেষ্ঠ লোকসংস্কৃতির দূতকে। পদ্মবিভূষণ সম্মানপ্রাপ্ত কিংবদন্তী পাণ্ডবানী শিল্পী ড. তীজন বাঈ ৫ জুলাই ২০২৬ সালে, দীর্ঘদিনের অসুস্থতার পর রায়পুরের AIIMS-এ চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭০ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণের মধ্য দিয়ে ভারতীয় লোকঐতিহ্যের এক অনন্য অধ্যায়ের অবসান ঘটল। তবে তাঁর রেখে যাওয়া শিল্প, সংগ্রাম এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার আগামী প্রজন্মকে যুগের পর যুগ অনুপ্রাণিত করে যাবে।
১৯৫৬ সালের ২৪ এপ্রিল, বর্তমান ছত্তীসগঢ়ের এক অত্যন্ত সাধারণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন তীজন বাঈ। শৈশব থেকেই মহাভারতের কাহিনি, লোকগান এবং গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রতি তাঁর গভীর আকর্ষণ ছিল। পরিবারের প্রবীণদের কাছ থেকে তিনি পাণ্ডবানীর শিক্ষা গ্রহণ করেন। কিন্তু সেই সময়ে সমাজের প্রচলিত ধারণা ছিল, পাণ্ডবানীর শক্তিশালী কাপালিক (Kapalik) শৈলীতে কেবল পুরুষরাই পরিবেশন করতে পারেন। একজন নারী সেই মঞ্চে দাঁড়িয়ে মহাভারতের বীরত্বগাথা পরিবেশন করবেন, এ কথা অনেকেই মেনে নিতে পারেননি।
তবুও তিনি থেমে থাকেননি। সামাজিক কুসংস্কার, দারিদ্র্য, অবহেলা এবং ব্যক্তিগত সংগ্রামকে অতিক্রম করে তিনি নিজের প্রতিভা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। হাতে একটি তানপুরা, মুখে অসাধারণ কণ্ঠস্বর এবং অভিনয়, সংলাপ, সঙ্গীত ও আবেগের দুর্দান্ত সমন্বয়ে তিনি এমনভাবে মহাভারতের কাহিনি জীবন্ত করে তুলতেন, যেন দর্শকরা নিজের চোখের সামনে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ, ভীমের গর্জন, অর্জুনের দ্বিধা কিংবা দ্রৌপদীর অপমান প্রত্যক্ষ করছেন।
তীজন বাঈ শুধু একজন গায়িকা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একাই একটি জীবন্ত নাট্যমঞ্চ। তাঁর পরিবেশনার বৈশিষ্ট্য ছিল কণ্ঠের অসাধারণ শক্তি, নাটকীয় অভিব্যক্তি, চরিত্র অনুযায়ী কণ্ঠ ও ভঙ্গির পরিবর্তন এবং দর্শকদের সঙ্গে এক আত্মিক সংযোগ। ভাষা না বুঝেও বিদেশি দর্শকরা তাঁর শিল্পে মুগ্ধ হতেন। কারণ তিনি প্রমাণ করেছিলেন, প্রকৃত শিল্প ভাষার সীমা অতিক্রম করে সরাসরি মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে যেতে পারে।
ভারতের বিভিন্ন প্রান্তের পাশাপাশি ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া এবং বিশ্বের বহু দেশে তিনি পাণ্ডবানী পরিবেশন করেছেন। তাঁর হাত ধরেই ছত্তীসগঢ়ের এই প্রাচীন লোকশিল্প আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করে। লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রথমবারের মতো তাঁর মাধ্যমে ভারতীয় লোকসংস্কৃতির এই অনন্য ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হন। তিনি শুধু একজন শিল্পী ছিলেন না; তিনি ছিলেন ভারতের সাংস্কৃতিক দূত, যিনি বিশ্বমঞ্চে ভারতীয় লোকঐতিহ্যের মর্যাদা আরও উজ্জ্বল করেছিলেন।
ভারতীয় সংস্কৃতিতে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ভারত সরকার তাঁকে ১৯৮৮ সালে পদ্মশ্রী, ২০০৩ সালে পদ্মভূষণ এবং ২০১৯ সালে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান পদ্মবিভূষণ-এ ভূষিত করে। এছাড়াও তিনি সঙ্গীত নাটক আকাদেমি পুরস্কার, সঙ্গীত নাটক আকাদেমি ফেলোশিপ, নৃত্য শিরোমণি-সহ বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মানে সম্মানিত হন। এই সম্মানগুলো শুধু একজন শিল্পীর প্রাপ্তি নয়; এগুলো ছিল ভারতের লোকসংস্কৃতির প্রতি জাতির শ্রদ্ধার প্রতীক।
ড. তীজন বাঈয়ের প্রয়াণ ভারতীয় শিল্প-সংস্কৃতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। কিন্তু তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, প্রতিকূলতা যতই কঠিন হোক, প্রতিভা, অধ্যবসায় এবং নিজের সংস্কৃতির প্রতি অগাধ ভালোবাসা থাকলে একজন মানুষ গোটা বিশ্বের কাছে নিজের মাটির পরিচয় তুলে ধরতে পারেন।
তাঁর কণ্ঠস্বর থেমে গেছে, কিন্তু পাণ্ডবানীর প্রতিটি সুরে, মহাভারতের প্রতিটি কাহিনিতে এবং প্রতিটি নতুন শিল্পীর অনুপ্রেরণায় তীজন বাঈ চিরকাল বেঁচে থাকবেন। তিনি শুধু একটি লোকশিল্পকে সংরক্ষণ করেননি; তাকে নতুন জীবন দিয়েছেন, বিশ্বদরবারে প্রতিষ্ঠিত করেছেন এবং ভারতীয় সাংস্কৃতিক ইতিহাসে অমর করে রেখেছেন।
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন