● গত ৭ জুন রাম মন্দিরে অনুদান তহবিলের গরমিল নিয়ে প্রথম অভিযোগ করেছিলেন অখিলেশ যাদব।
● অখিলেশ যাদবের অভিযোগের পর কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে অভিযোগ অস্বীকার করেন উত্তরপ্রদেশের উপ মুখ্যমন্ত্রী ব্রজেশ পাঠক।
● মন্দির ট্রাষ্টের অভ্যন্তরীণ তদন্তে বেশ কিছু গরমিলের ঘটনা ধরা পড়ে। মুখ্যমন্ত্রীর কাছে তদন্তের আর্জি জানানো হয়।
● মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের নির্দেশে ওই ঘটনার তদন্তে ১৩ জুন তিন সদস্যের সিট গঠন করা হয়েছে।
গত ৭ জুন প্রথম রামমন্দির ট্রাষ্টের অনুদানের বিষয়ে অভিযোগ করেছিলেন সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব। তাঁর সুস্পষ্ট অভিযোগ ছিল রাম মন্দিরে অনুদান বাবদ প্রাপ্ত বহু টাকার কোনও হিসেব নেই এবং এ বিষয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, “এই বিষয়ে সরকারের নীরবতা সন্দেহজনক।” দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে ১৩ জুন এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ক্রমশ জটিল আকার ধারণ করছে রাম মন্দিরের অনুদান অপব্যবহারের ঘটনা। অনুমান করা হচ্ছে প্রায় ৭ কোটি টাকা অপব্যবহারের ঘটনা ঘটেছে।
অভিযোগের উত্তরে কী জানিয়েছিল ট্রাষ্ট?
প্রাথমিক ভাবে অখিলেশ যাদবের এই অভিযোগের উত্তরে ট্রাষ্টের সাধারণ সম্পাদক চম্পৎ রাই জানিয়েছিলেন, অভ্যন্তরীণ হিসেব পরীক্ষা চলছে এবং এখনও পর্যন্ত এই ধরণের অভিযোগের পক্ষে কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে অখিলেশ যাদবের অভিযোগের পর কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন উত্তরপ্রদেশের উপ মুখ্যমন্ত্রী ব্রজেশ পাঠক।
অখিলেশ যাদবের অভিযোগের পর কী প্রতিক্রিয়া ছিল শাসকদলের?
গত ৮ জুন এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, অখিলেশ যাদব অযোধ্যা রাম মন্দির দানের টাকা চুরির ভুয়ো অভিযোগ ছড়াচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, যারা শ্রীরাম মন্দির নিয়ে গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করছেন তাঁরা একটি মিথ্যা গল্প তৈরির চেষ্টা করছে। রাজ্যের মানুষ এই ধরণের রাজনীতি বোঝেন। অন্যদিকে উত্তরপ্রদেশের বিজেপি সভাপতি পঙ্কজ চৌধুরী বলেন, এই বিষয়টি শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাষ্টের সঙ্গে সম্পর্কিত, এখানে রাজ্য সরকারের কোনও ভূমিকা নেই। ট্রাষ্ট এই বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।
এই বিষয়ে বিরোধীরা কী দাবি তুলেছিলেন?
অখিলেশ যাদবের অভিযোগের পরেই বিষয়টি নিয়ে সরব হন আম আদমি পার্টির নেতা সঞ্জয় সিং। বিজেপি সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, রাম মন্দিরে দান সংগ্রহ এবং জমি সংক্রান্ত অনিয়মের পর এবার দানবাক্স থেকে চুরির অভিযোগও উঠেছে। এই ঘটনার তদন্ত দাবি করেন কংগ্রেস সাংসদ তনুজ পুনিয়াও। উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন মন্ত্রী এবং সমাজবাদী পার্টির নেতা পবন পান্ডে অভিযোগ করেন, রাম মন্দির থেকে কমপক্ষে ৫ থেকে সাড়ে ৭ কোটি টাকা ঘুরপথে সরানো হয়েছে।
ট্রাষ্টের করা অভ্যন্তরীণ তদন্তে কী উঠে আসে?
যদিও অখিলেশ যাদবের অভিযোগের পরেই প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া যাই হোক না কেন নড়েচড়ে বসে ট্রাষ্ট এবং অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হয়। এখনও পর্যন্ত সূত্র মারফৎ অভ্যন্তরীণ তদন্তের যেটুকু খবর পাওয়া গেছে তাতে দেখা যাচ্ছে অযোধ্যার রাম মন্দিরে জমা হওয়া অনুদান, গয়না সব মিলিয়ে প্রায় ৭ কোটি টাকা অন্যভাবে ব্যবহার করেছেন ট্রাষ্টেরই কিছু কর্মী। যদিও ঠিক কতজন কর্মী এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত সেই বিষয়ে এখনও প্রকাশ্যে কিছু জানায়নি ট্রাষ্ট।
রবিবার ১৪ জুন সংবাদ সংস্থা পিটিআই তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, তদন্ত শুরুর পরে অযোধ্যার রাম মন্দির কমপ্লেক্সের এক কর্মীর বেশ কিছু অভিযোগ উঠেছে। ট্রাষ্টের ওই কর্মীর বিরুদ্ধে সম্প্রতি ৪০ লক্ষ টাকা দিয়ে এক জমি কেনার বিষয়টিও সামনে এসেছে। দৈনিক জাগরণে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুসারে, ওই জমিতে নির্মাণ কাজও শুরু করেছিলেন ওই কর্মী।
এছাড়াও মন্দিরের গর্ভগৃহে কর্মরত অপর এক কর্মীকেও সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছে। অনুমান করা হচ্ছে মন্দিরে ভক্তরা সোনা ও রূপার যেসব গয়নাগাটি দান করতেন তিনি তার থেকে বেশ কিছুটা আত্মসাৎ করেছেন। যে ঘটনা ঘটেছে গত মহাকুম্ভের সময়। সূত্র অনুসারে, সম্প্রতি তিনি দেড় কোটি টাকা দিয়ে একটি জমি কিনেছেন। এক্ষেত্রে সবথেকে বড়ো প্রশ্নের আকারে যা সামনে এসেছে তা হল, কীভাবে মাসে ১৮ বা ২০ হাজার টাকা বেতন পাওয়া কর্মীরা এত বড়ো অঙ্কের টাকা খরচ করে জমি কিনেছেন।
এছাড়াও ইতিমধ্যেই শ্রীরাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাষ্টের দুই কর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। যাঁদের বিরুদ্ধে মন্দির ট্রাষ্টের অনুদানের টাকা অন্যভাবে ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে। এবিপি নিউজের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, এই ঘটনার তদন্ত অত্যন্ত গোপনে করা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্ট আধিকারিকরা কোনও মন্তব্য করতে অস্বীকার করেছেন। ট্রাষ্টের আধিকারিকরাই অভ্যন্তরীণভাবে এই তদন্ত করছেন। দেখা গেছে, মন্দিরের অনুদান গণনার কাজে যুক্ত একাধিক কর্মীর সাম্প্রতিক সময়ে হঠাৎ করেই আর্থিকভাবে ফুলে ফেঁপে ওটার ঘটনা ঘটেছে। যা তদন্ত শুরু করার পর ট্রাষ্টের নজরে এসেছে।
এই ঘটনায় নাম উঠে এসেছে ট্রাষ্টেরই এক কর্মীর। যার ওপর রাম মন্দির কমপ্লেক্সের অনুদানের টাকা গোণার দায়িত্ব ছিল। সূত্র অনুসারে, তাঁর বাড়ি থেকেও নগদ প্রায় ১২ লক্ষ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। যদিও ঠিক কত টাকা উদ্ধার করা হয়েছে তা ট্রাষ্টের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়নি।
কী সিদ্ধান্ত নিয়েছে উত্তরপ্রদেশ সরকার?
এখনও পর্যন্ত এই ঘটনায় কোনও এফআইআর দায়ের করা না হলেও উত্তরপ্রদেশ সরকার ঘটনার গুরুত্ব অনুধাবন করে তিন সদস্যের এক সিট গঠন করেছে। মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের নির্দেশে গতকাল ১৩ জুন তিন সদস্যের ওই সিট গঠন করা হয়েছে। মূলত ট্রাষ্টের অনুরোধে সাড়া দিয়ে সিট গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। সিট-কে আগামী ৭ দিনের মধ্যে প্রাথমিক রিপোর্ট এবং আগামী ১৫ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে। বিশেষ এই তদন্তকারী দলের নেতৃত্ব দেবেন লখনৌ ডিভিশনাল কমিশনার বিজয় বিশ্বাস পন্থ এবং তাঁকে সহায়তা করবেন আই জি কিরণ এস এবং অর্থ দপ্তরের বিশেষ সচিব নীলরতন কুমার। বিজেপি নেতা ডঃ রজনীশ সিং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে এক চিঠি লিখে এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার অনুরোধ জানিয়েছেন।
সাংবাদিকদের কী জানিয়েছেন বিজেপি নেতা ব্রিজ ভূষণ শরণ সিং?
গত ১১ জুন এই ঘটনা প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বিজেপি নেতা ও প্রাক্তন সাংসদ ব্রিজ ভূষণ শরণ সিং বুধবার জানান, অযোধ্যার রাম মন্দির সংক্রান্ত অনুদানের কথিত অপব্যবহার ও চুরির বিষয়ে তিনি অবগত; তবে তিনি জানিয়েছেন, এই মুহূর্তে বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করার মতো অবস্থায় তিনি নেই।
দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন জানাচ্ছে, দিল্লি থেকে বিষ্ণোহোরপুরে নিজের বাড়িতে ফেরার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “আমি খুবই দুর্বল একজন মানুষ। সত্যি কথা বললে আমি বিপদে পড়ে যাব, কারণ তাঁরা অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি। এই মুহূর্তে সত্যি কথা বলার মতো সাহস আমার নেই। উপযুক্ত সময় এলে আমি অবশ্যই কথা বলব।”
এলাহাবাদ হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা
গতকাল ১৩ জুন রাম মন্দিরের তহবিল চুরির অভিযোগ এনে এলাহাবাদ হাইকোর্টে এক জনস্বার্থ মামলা দায়ের করেছেন আইনজীবী মোহিত অশোক। যে আবেদনে তিনি সিবিআই তদন্তের দাবি জানিয়েছেন এবং সিএজি-কে দিয়ে রাম মন্দিরের অনুদানের ফরেনসিক অডিটেরও দাবি তুলেছেন।
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন