বেশ কিছুদিন ধরেই নয়ডার শিল্পাঞ্চল জুড়ে চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকদের ক্ষোভ জমা হচ্ছিল। সেই ক্ষোভই সোমবার বিস্ফোরণের আকার নেয়, যখন হাজার হাজার শ্রমিক রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা পাথর ছোঁড়ে, গাড়ি ভাঙচুর করে এবং বেশ কিছু গাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয় বলেও জানা গেছে। শ্রমিক বিক্ষোভের জেরে উত্তরপ্রদেশ সরকার সংশোধিত বেতন কাঠামো ঘোষণা করার পরেও, নয়ডার শ্রমিকরা উন্নত বেতনের দাবিতে এখনো বিক্ষোভ চালিয়ে যাচ্ছেন। গত ১০ এপ্রিল এই বিক্ষোভ শুরু হয় এবং ১৩ এপ্রিল নাগাদ তা সহিংস রূপ ধারণ করে। এর ফলে প্রায় ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পুলিশের পক্ষ থেকে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়। বর্তমানে পুলিশ জানিয়েছে যে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে এবং সক্রিয় কোনো বিক্ষোভ চলছে না।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস সহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে, প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার শ্রমিক নয়ডার ফেজ ২, সেক্টর ৬০, ৬২ এবং ৮৪-সহ ৮০টিরও বেশি জায়গায় রাস্তায় নেমে পড়েন। সকাল থেকেই শুরু হওয়া এই বিক্ষোভের জেরে শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলিতে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়, যা সন্ধ্যা পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। পুলিশ একাধিক জায়গায় হস্তক্ষেপ করে এবং বহু শ্রমিককে আটক করে। এই ঘটনায় একাধিক এফআইআরও দায়ের হয়েছে।
এই শ্রমিক বিক্ষোভের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ। শ্রমিকদের অভিযোগ—কম মজুরি, অতিরিক্ত কাজের চাপ এবং অনিশ্চিত চাকরি। ১৮ বছর বয়সি এক পোশাক শ্রমিক বলেন, সামান্য মজুরি বাড়লেও কাজের চাপ বেড়েছে। অসুস্থ হলেও ছুটি নেই, রবিবার কাজ না করলে চাকরি হারানোর ভয় দেখানো হয়। অন্য এক শ্রমিক জানিয়েছেন, মাসে প্রায় ১৩,৫০০ টাকা আয় করে ভাড়া, খাবার খরচ মেটানোর পর হাতে কিছুই থাকে না, বাড়িতে টাকা পাঠানো তো দূরের কথা।
বিক্ষোভের আগে শ্রমিকরা টানা দু'দিন কারখানার বাইরে ধর্না দিয়েছিলেন। শ্রমিক বিক্ষোভের পর সরকার কিছু পদক্ষেপ ঘোষণা করে—ডাবল ওভারটাইমের বাধ্যবাধকতা এবং সময়মতো মজুরি প্রদানের আশ্বাস দেয়। কিন্তু শ্রমিকদের মতে, এই পদক্ষেপ যথেষ্ট নয় এবং বাস্তবে তার প্রয়োগও অনিশ্চিত।
উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ (Yogi Adityanath) প্রথমে এই ঘটনার পেছনে “উসকানিমূলক শক্তি” আছে বলে জানান। তিনি দাবি করেন, কিছু বাইরের শক্তি রাজ্যের উন্নয়ন ব্যাহত করতে অশান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে তিনি শিল্পপতিদের শ্রমিকদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা চালিয়ে যাবার আবেদন করেন। যদিও এর পর তিনি শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় বেশ কিছু সরকারি পদক্ষেপের ঘোষণা করেন।
পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, হিংসার পেছনে কারা রয়েছে তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে “বাইরে থেকে কোনও প্ররোচনা দেওয়া হয়েছে কিনা” তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং তা চিহ্নিত করা গেলে তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শ্রমিকদের বিক্ষোভের জেরে চাপের মুখে পড়ে রাজ্য সরকার ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। নতুন হারে অদক্ষ শ্রমিকদের মাসিক আয় কিছুটা বাড়বে বলে মনে করা হলেও অনেক শ্রমিকই এই বৃদ্ধিকে পর্যাপ্ত বলে মনে করছেন না। তাদের বক্তব্য, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে এই বাড়তি মজুরি বাস্তবে খুব একটা স্বস্তি দেবে না।
শুধু নয়ডা নয়, প্রতিবেশী হরিয়ানার পালওয়াল ও ফরিদাবাদেও একই ধরনের ক্ষোভ দেখা গেছে। সেখানে প্রায় ৭,৫০০ শ্রমিক বিক্ষোভে অংশ নেন। তাদের অভিযোগ, ঘোষিত মজুরি বৃদ্ধি বাস্তবে কার্যকর করা হচ্ছে না।
নয়ডায় বিক্ষোভের রেশ কাটতে না কাটতেই অন্য এক স্তরের শ্রমজীবী মানুষের অসন্তোষও সামনে আসে। বিলাসবহুল আবাসন ‘ক্লিও কাউন্টি’-র সামনে শতাধিক গৃহকর্মী জড়ো হয়ে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে বিক্ষোভ দেখান। তাদের বক্তব্য, বাড়ির মালিকদের আয় বিপুল হলেও গৃহকর্মীদের বেতন বাড়াতে অনীহা দেখা যায়, যা বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির পরিস্থিতিতে টিকে থাকা কঠিন করে তুলছে।
সব মিলিয়ে, এই ঘটনাগুলি একটি বড় বাস্তবতাকে সামনে এনে দিয়েছে—শিল্পাঞ্চলের ভিতরে জমে থাকা অর্থনৈতিক চাপ, অনিশ্চয়তা এবং অসন্তোষ এখন আর চাপা থাকছে না। মজুরি বৃদ্ধি, কাজের পরিবেশ এবং সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই ধরনের বিক্ষোভ আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন