NCPI: তৃণমূলের দুই-তৃতীয়াংশ সাংসদ, আর এক অচেনা দল: কী কৌশল বিক্ষুব্ধ শিবিরের?

People's Reporter: ফেসবুক বায়োতে বলা আছে, “এনসিপিআই (NCPI) হলো সমাজকল্যাণমূলক উদ্দেশ্য নিয়ে গঠিত একটি সংস্থা। এনসিপিআই আমাদের সমাজের দরিদ্র মানুষদের সহায়তা করে।”
গতকাল দিল্লিতে স্পিকারের সঙ্গে দেখা করেন তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ সাংসদরা
গতকাল দিল্লিতে স্পিকারের সঙ্গে দেখা করেন তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ সাংসদরা ছবি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত
Published on

ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া (NCPI) নামক অখ্যাত এক রাজনৈতিক দলে যোগ দিলেন তৃণমূলের ২০ জন সাংসদ। রাজনীতির আলোচনায় এর আগে এই দলের নাম বিশেষভাবে সামনে আসেনি। এই দলের নেতা কে, প্রতিষ্ঠাতা কে তাও স্পষ্ট নয়। সেভাবে কোনও তথ্য পাওয়া না গেলেও এই সংগঠনের একটা ফেসবুক পেজ আছে। যেখানে কোথাও অবশ্য এই সংগঠনকে রাজনৈতিক দল হিসেবে দাবি করা নেই। বরং স্পষ্টই বলা আছে অলাভজনক সংস্থা (Non Profit Organization)। ঠিকানা হিসেবে দেওয়া আছে আন্দুল, মৌড়ি, হাওড়া। ফেসবুক বায়োতে বলা আছে, “এনসিপিআই (NCPI) হলো সমাজকল্যাণমূলক উদ্দেশ্য নিয়ে গঠিত একটি সংস্থা। এনসিপিআই আমাদের সমাজের দরিদ্র মানুষদের সহায়তা করে।”

এই সংগঠনের ফেসবুক পেজে উত্তীয় কুন্ডু নামক এক ব্যক্তির একটি রেকমেন্ডেশন আছে। যেখানে ২০২৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি তিনি লিখেছেন, “NCPI কেবল একটি রাজনৈতিক দলই নয়, বরং এটি একটি রাজনৈতিক দলের কার্যপদ্ধতির আদর্শ উদাহরণও বটে। এটি মানুষের জীবনের প্রতিটি ধাপে সহায়তা প্রদান করে। তাই আমি পরামর্শ দেব, আপনিও NCPI-তে যোগ দিন; তাহলে আপনিও সর্বদা হাসিখুশি থাকার সুযোগ পাবেন।” এই ব্যক্তির ব্যক্তিগত প্রোফাইলে গেলে সেখানে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে তাঁর একটি ব্যক্তিগত ছবি দেখা যাচ্ছে। যে ছবি পোষ্ট হয়েছে চলতি বছরের ১০ মে।

গতকাল রাত পর্যন্ত ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া-র ফেসবুক পেজে ফলোয়ারের সংখ্যা ছিল ১৩৪। যা এই লেখার সময় বেড়ে হয়েছে ২১০। যেহেতু অনামী এই এনজিও-কে নিয়ে মানুষের কৌতূহল বেড়েছে তাই অনুমান করা যায় আগামী কয়েক দিনে এই ফলোয়ার সংখ্যা আরও বাড়বে। এই ফেসবুক পেজে শেষ পোষ্ট হয়েছিল ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩। নির্বাচন কমিশনের সূত্র অনুসারে, এনসিপিআই ২০২৩-এর জানুয়ারি কমিশনে নাম নথিভুক্ত করে। যাঁদের রেজিস্টার্ড অফিস, সাঁকরাইল, হাওড়া, পশ্চিমবঙ্গ।

গত ১০ মে উত্তীয় কুন্ডুর ফেসবুক পোষ্ট
গত ১০ মে উত্তীয় কুন্ডুর ফেসবুক পোষ্টছবি উত্তীয় কুন্ডুর ফেসবুক পেজ থেকে স্ক্রিনশট

এনসিপিআই-এর ফেসবুক পেজ থেকে জানা যাচ্ছে ২০২৩ সালের ত্রিপুরা বিধানসভা নির্বাচনে এই সংগঠন কৈলাশহর, আমবাসা, চামুনু কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল। এই তিন কেন্দ্রে প্রার্থী ছিলেন যথাক্রমে জাহাঙ্গীর আলি, কৃষ্ণ কুমার দেববর্মা এবং বরজেদা ত্রিপুরা। এই তিন প্রার্থীর পোস্টারে দলের সভাপতি হিসেবে নাম আছে শিউলি কুন্ডুর। সহ সভাপতি উত্তীয় কুন্ডু এবং সাধারণ সম্পাদক শান্তনু দে। ফেসবুক প্রোফাইল অনুসারে সভাপতি শিউলি কুন্ডু অল ইন্ডিয়া অ্যান্টি করাপশান ফোরাম নামক অপর এক সংগঠনেরও সভাপতি।

এই সংগঠনের ফেসবুক পেজে ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩-র এক রেকমেন্ডেশন পোষ্টে বলা আছে, “স্বাধীনতার ৭৫ বছর পরেও আমরা দারিদ্র্য, বেকারত্ব, নিরক্ষরতা ও ক্ষুধার মতো নানাবিধ সামাজিক সমস্যার মোকাবিলা করছি। এর কারণ সম্পদের অপর্যাপ্ততা নয়; বরং এর মূল কারণ হলো জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোর যথাযথ বাস্তবায়নের অভাব এবং রাজনীতিবিদ ও সরকারি কর্মকর্তাদের যোগসাজশে সংঘটিত দুর্নীতি ও কেলেঙ্কারি।”

কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আনুগত্য ত্যাগ করা তৃণমূল সাংসদরা হঠাৎ এইরকম এক অনামি সংগঠনের দ্বারস্থ হলেন কেন? আদৌ কি এই সংগঠনে মিশে যাবার আগে তাদের কোনও নেতা কর্মীর সঙ্গে প্রাথমিক আলাপ আলোচনা হয়েছে? নাকি সেরকম কিছু করা হয়নি। এই বিষয়টি নিয়ে ধোঁয়াশা আছে এবং যে কারণে যথেষ্ট বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।

তবে নিজেদের পদক্ষেপ সম্পর্কে গতকালই বিভ্রান্তি দূর করার চেষ্টা করেছেন  সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৪ জুন তৃণমূল ত্যাগী গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে জানান, “আমরা ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টির সঙ্গে মিশে যাচ্ছি। এটাই নিয়ম। যখন কোনও দলের দুই তৃতীয়াংশ একসঙ্গে বেরিয়ে যায় তখন সঙ্গে সঙ্গেই পুরোনো দলের নাম দাবি করা যায়না। যেহেতু আমাদের সঙ্গে দুই তৃতীয়াংশ সাংসদ আছে তাই জুলাই মাসে আমরা তৃণমূল কংগ্রেসের মান্যতা চাইবো। তারপর আদালত সিদ্ধান্ত নেবে।” অর্থাৎ তৃণমূলের মালিকানা নিয়ে তৃণমূলের ভেঙে বেরিয়ে যাওয়া অংশ যে আদালত পর্যন্ত যাবেন তা গতকালই ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছেন সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়।  

রবিবার লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লার সঙ্গে বৈঠকের পর ডাঃ কাকলী ঘোষ দস্তিদার সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, “আমাদের সাংসদরা স্পিকারের সঙ্গে দেখা করেছেন এবং আলাদা বসার ব্যবস্থা করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। আমরা তৃণমূলের দুই তৃতীয়াংশের বেশি সাংসদ ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়ার সঙ্গে মিশে গেছে। আমরা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং এনডিএ-র সঙ্গে দেশের স্বার্থে কাজ করবো।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কোনওরকমের আইনি জটিলতা এড়াতেই তৃণমূলের শিবির বদলানো সাংসদদের এই পদক্ষেপ। যেহেতু স্পিকারের সঙ্গে তাদের দেখা করার আগেই তৃণমূলের পক্ষ থেকে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চিঠি স্পিকারের কাছে পৌঁছে দেন তৃণমূল সাংসদ সাগরিকা ঘোষ, কীর্তি আজাদ, সেক্ষেত্রে তৃণমূল ভেঙে পৃথক ব্লক দাবি করলে আইনি জটিলতায় পড়ার সম্ভাবনা ছিল। তা এড়াতেই আপাতত অন্য একটি দলে সম্পূর্ণ মিশে যাওয়ার অর্থ এঁদের বিরুদ্ধে আর কোনোভাবেই দলত্যাগ বিরোধী আইন জারি করা যাবে না।

তাছাড়াও এই রাজ্যের বিজেপি শীর্ষ নেতৃত্বের একটা বড়ো অংশই এখনই তৃণমূলের এই সাংসদদের বিজেপিতে ঢুকতে দিতে চান না। তাদের মতে এর ফলে জনমানসে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে। কারণ এবারের বিধানসভা নির্বাচনে মানুষ এই তৃণমূলের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েই বিজেপিকে জয়ী করেছে।

গতকাল দিল্লিতে স্পিকারের সঙ্গে দেখা করেন তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ সাংসদরা
TMC: কাজ করার সুযোগ না থাকায় তৃণমূল ছাড়লেন মানস ভুঁইয়া, ছাড়ছেন না রাজনীতি
গতকাল দিল্লিতে স্পিকারের সঙ্গে দেখা করেন তৃণমূলের বিক্ষুব্ধ সাংসদরা
TMC: আরও ভাঙলো তৃণমূল, বিদ্রোহী শতাব্দী রায়ের সঙ্গে ভূপেন্দ্র যাদবের বাড়িতে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

SUPPORT PEOPLE'S REPORTER

ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন

logo
People's Reporter
www.peoplesreporter.in