প্রাক্তন সেনাপ্রধানের অপ্রকাশিত স্মৃতিকথা ঘিরে বিতর্কের মধ্যেই বই লেখা ও প্রকাশ নিয়ে সশস্ত্র বাহিনীর কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের জন্য কড়া নির্দেশিকা আনার কথা ভাবছে কেন্দ্রীয় সরকার। প্রস্তাবিত নির্দেশিকায় বই প্রকাশের আগে সর্বোচ্চ ২০ বছরের ‘কুলিং-অফ’ পিরিয়ড চালুর বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে হিন্দুস্থান টাইমস।
বিতর্কের সূত্র
প্রাক্তন সেনাপ্রধান মনোজ মুকুন্দ নারাভানে-র অপ্রকাশিত স্মৃতিকথা ফোর স্টারস অফ ডেস্টিনি (Four Stars of Destiny) নিয়ে সম্প্রতি রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়। বইটিতে ২০২০ সালের আগস্টে পূর্ব লাদাখে ভারত-চীন সংঘাতের সময়কার কিছু ঘটনার উল্লেখ রয়েছে, বিশেষ করে ৩১ আগস্ট প্যাংগং তসোর দক্ষিণ তীরে কৈলাস পর্বতমালায় সেনা মোতায়েন সংক্রান্ত প্রসঙ্গ। পাণ্ডুলিপির কিছু অংশে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে চীনা পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক নির্দেশ স্পষ্ট ছিল না। এই দাবিকে ঘিরেই সরকার পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
বাজেট অধিবেশন চলাকালীন লোকসভায় বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী বইটির উল্লেখ করলে বিতর্ক আরও তীব্র হয়। সরকার জানায়, বইটি এখনও প্রকাশিত হয়নি। পরে সংসদে এই বইয়ের একটি কপি দেখান রাহুল গান্ধী এবং এরপরেই অল্প সময়ের মধ্যেই এই বইয়ের পিডিএফ সংস্করণ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
২০ বছরের কুলিং-অফ পিরিয়ডের প্রস্তাব
হিন্দুস্থান টাইমস তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, শীর্ষ সরকারি সূত্র অনুসারে, সম্প্রতি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। কয়েকজন মন্ত্রী সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে বই লেখা ও প্রকাশের আগে উচ্চপদস্থ সামরিক ও সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য বাধ্যতামূলক কুলিং-অফ পিরিয়ডের পক্ষে মত দেন। যদিও বিষয়টি বৈঠকের আনুষ্ঠানিক এজেন্ডার অংশ ছিল না। তবুও সাধারণ আলোচনায় তা উঠে আসে। এই বিষয়ে শীঘ্রই আনুষ্ঠানিক নির্দেশিকা জারি হতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগ
দ্য হিন্দু জানিয়েছে, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এই বিষয়ে এক বিস্তৃত কাঠামো তৈরির কাজ শুরু করেছে। নতুন কাঠামোয় বই প্রকাশের আগে কর্মরত এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের জন্য স্পষ্ট নির্দেশিকা নির্ধারণ করা হবে। যাতে বর্তমান পরিষেবা বিধিমালা এবং অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট (OSA)-এর বিধান অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
বর্তমানে কর্মরত সামরিক কর্মীদের বই, প্রবন্ধ বা অন্য কোনও পারিশ্রমিকমূলক কাজ করার আগে লিখিত অনুমতি নিতে হয়। এই আবেদন নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে যায়। যেখানে শ্রেণিবদ্ধ তথ্য, সংবেদনশীল সামরিক বিষয়, গোয়েন্দা মূল্যায়ন বা বৈদেশিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে—এমন বিষয় প্রকাশ কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে যদিও এই সংক্রান্ত কোনও নির্দিষ্ট আইন নেই। যদিও OSA আজীবন প্রযোজ্য থাকে। ফলে জাতীয় নিরাপত্তা, গোপন সামরিক তথ্য বা সংবেদনশীল নথি প্রকাশ এক্ষেত্রে আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
প্রতিরক্ষা সচিব রাজেশ কুমার সিং যদিও জানিয়েছেন, নতুন নির্দেশিকা নিয়ে নির্দিষ্ট কোনও প্রস্তাব সম্পর্কে তাঁর জানা নেই। তাঁর কথায়, বর্তমান আইন ও নির্দেশিকাই যথেষ্ট; এক্ষেত্রে দেখার বিষয়, সেগুলি এড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে কি না।
ফাঁস ও তদন্ত
বইটির প্রি-প্রিন্ট সংস্করণ ডিজিটালভাবে ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগে ৯ ফেব্রুয়ারি দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল এফআইআর দায়ের করেছে। পরে এর সঙ্গে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের ধারাও যুক্ত করা হয়।
ইতিমধ্যেই প্রকাশনা সংস্থা Penguin Random House India-কে নোটিশ পাঠানো হয়েছে এবং তাদের কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। পুলিশের দাবি, একই শিরোনামের একটি টাইপসেট পিডিএফ বিভিন্ন ওয়েবসাইটে ঘুরছে এবং কিছু অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এই বইয়ের প্রচ্ছদও দেখা গেছে, যা থেকে বোঝা যায়, এই বই বিক্রির জন্য তৈরি ছিল।
বইটি নিয়ে বিতর্ক দানা বাধলে প্রকাশকের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়, বইটি এখনও প্রকাশের জন্য প্রস্তুত নয় এবং কোনও মুদ্রিত বা ডিজিটাল কপি জনসাধারণের জন্য দেওয়া হয়নি। কপিরাইট লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বিবৃতিতে বলা হয়েছে। নারাভানেও প্রকাশকের বক্তব্য সমর্থন করে জানিয়েছেন, বইটির কোনও কপি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়নি।
যদিও এক্ষেত্রে অনেকেই জেনারেল নারাভানের ২০২৩ সালের এক ট্যুইটের উল্লেখ করেছেন। যেখানে তিনি স্বয়ং জানিয়েছিলেন, বইটির প্রি বুকিং চলছে। যদিও দিন কয়েক আগে এক্স হ্যান্ডেলে দেওয়া বিবৃতিতে তিনি বইটি প্রকাশ হয়নি বলেই জানিয়েছেন।
জেনারেল নারাভানের স্মৃতিকথা
জেনারেল নারাভানের এই স্মৃতিকথা ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশের কথা ছিল। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে প্রেস ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়া এই বইয়ের কিছু অংশ, বিশেষ করে অগ্নিবীর প্রকল্প সংক্রান্ত অংশ প্রকাশ করলে প্রথম বিতর্কের সূত্রপাত হয়। পরে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় পাণ্ডুলিপিটি আনুষ্ঠানিক ছাড়পত্রের জন্য জমা দেবার কথা জানায়। সেনাবাহিনী পর্যালোচনা করে তাদের মতামত মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠালেও এখনও তা চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি।
এই ঘটনার পর সেনা কর্মকর্তাদের লেখালিখি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জাতীয় নিরাপত্তা—এই তিনের ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। সম্ভাব্য ২০ বছরের কুলিং-অফ পিরিয়ড ঘোষিত হলে সেই বিতর্ক আরও তীব্র হতে পারে।
সংসদে বিতর্কের সূচনা
এই বইটি নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্কের বড় অংশ জুড়ে রয়েছে লোকসভার বাজেট অধিবেশনের ঘটনাপ্রবাহ। অধিবেশন চলাকালীন গত ২ ফেব্রুয়ারি বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী এই বইটি থেকে উদ্ধৃতি দিতে শুরু করেন। তখন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং তাতে আপত্তি জানান। তাঁদের বক্তব্য ছিল, যে বই এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়নি, সেখান থেকে উদ্ধৃতি দেওয়া সংসদীয় রীতি ও প্রথার পরিপন্থী।
এই আপত্তির জেরে সংসদে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। বিরোধী শিবিরের দাবি ছিল, বইটির কপি তাঁদের কাছে রয়েছে এবং সেখানে উল্লিখিত তথ্য জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ। সরকারপক্ষ পাল্টা যুক্তি দেয়, অপ্রকাশিত ও আনুষ্ঠানিক ছাড়পত্রহীন পাণ্ডুলিপি থেকে উদ্ধৃতি দেওয়া ঠিক নয়। যে ঘটনা ঘিরে রাজনৈতিক উত্তাপ এবং বিতর্ক আরও বাড়ে।
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন