ভোটার তালিকায় স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (Special Intensive Revision - SIR) বা বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুললেন দেশের প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এস. ওয়াই. কুরেশি (S Y Quraishi)। তাঁর সুস্পষ্ট অভিযোগ, ভোটার তালিকা শুদ্ধিকরণের নামে এমন এক প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে যার মূল লক্ষ্য ভোটারদের অন্তর্ভুক্ত করা নয়, বরং যত বেশি সম্ভব ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া। সম্প্রতি এক পুস্তক প্রকাশ অনুষ্ঠানের আগে সংবাদসংস্থা পিটিআই-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি একথা জানিয়েছেন।
সম্প্রতি ‘India and I: A Hundred Memories, Not a Memoir’ শীর্ষক পুস্তক প্রকাশের আগে সংবাদসংস্থার সাংবাদিকের মুখোমুখি হন এস ওয়াই কুরেশী। যেখানে তিনি বলেন, ভোটার হিসেবে নথিভুক্ত হওয়া কোনও দয়া বা অনুগ্রহ নয়, প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার। অথচ বর্তমান পরিস্থিতিতে এমন একটা ধারণা তৈরি করা হচ্ছে যেন ভোটার তালিকায় নাম থাকা নির্বাচন কমিশনের দেওয়া বিশেষ সুবিধা।
কুরেশির মতে, বর্তমান এসআইআর প্রক্রিয়া পরিচালনার ধরণই একাধিক প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। তিনি বলেন, “কতজনকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যায়, সেটাই যেন এখন প্রধান লক্ষ্য। মনে হচ্ছে যত বেশি মানুষকে বাদ দেওয়া যাবে, ততই যেন সাফল্যের নম্বর বাড়বে।”
তাঁর কার্যকালের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি জানান, সেই সময়ে নির্বাচনকর্মীদের স্পষ্ট নির্দেশ ছিল, কোনও ভোটারের নামের বানান, বয়স বা ঠিকানায় সামান্য ভুল থাকলেও যদি নিশ্চিত হওয়া যায় যে তিনি প্রকৃত ভোটার, তবে তাঁকে কোনওভাবেই ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। মূল উদ্দেশ্য ছিল একটাই, একজনও যোগ্য ভোটার যাতে বাদ না পড়েন।
প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের দাবি, বর্তমানে সেই দৃষ্টিভঙ্গির সম্পূর্ণ উল্টো ছবি দেখা যাচ্ছে। তাঁর কথায়, “কোটি কোটি মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এর ফলে গণতন্ত্রের ওপর গুরুতর আঘাত এসেছে। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনী প্রক্রিয়াও বিঘ্নিত হয়েছে। এই কারণেই বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।”
কুরেশি জানান, ২০০২-০৩ সালে বিহারে শেষ বড় আকারের নিবিড় সংশোধনের পর নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে ভোটার তালিকা কম্পিউটারাইজড হয়ে যাওয়ায় আর এ ধরনের নিবিড় সংশোধনের প্রয়োজন নেই। তার পরিবর্তে চালু হয় ‘সামারি রিভিশন’ বা সংক্ষিপ্ত সংশোধন প্রক্রিয়া। এতে বুথ লেভেল অফিসার (বিএলও) বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার তালিকা দেখাতেন, তথ্য মিলিয়ে নিতেন এবং প্রয়োজনীয় সংশোধন বা সংযোজন সেখানেই সম্পন্ন করা হত। যখন ৯৯ শতাংশ নাম ইতিমধ্যেই তালিকায় রয়েছে, তখন আবার শূন্য থেকে শুরু করে কে কোথায় থাকে তা খুঁজতে যাওয়া বাস্তবসম্মত নয়।
বিহারে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী শনাক্ত করার উদ্দেশ্যে এসআইআর চালু করা হয়েছিল বলেও উল্লেখ করেন কুরেশি। তবে তাঁর প্রশ্ন, প্রায় আট কোটি মানুষকে নথিপত্র নিয়ে দৌড় করানোর পর শেষ পর্যন্ত কতজন বিদেশি শনাক্ত হলেন? “আজ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন সেই সংখ্যা প্রকাশ করেনি। দেশের মানুষ জানতে চায়, আমরা জানতে চাই, কতজন বিদেশিকে চিহ্নিত করা হয়েছে?”
তিনি দাবি করেন, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী প্রায় ৫০০ বিদেশিকে চিহ্নিত করা হয়েছিল, যার মধ্যে ১৫০ জন বাংলাদেশি এবং ৩৫০ জন নেপালি হিন্দু নারী, যারা বিয়ের সূত্রে বিহারে এসেছিলেন। কুরেশির প্রশ্ন, “মাত্র ১৫০ জন বাংলাদেশিকে খুঁজে বের করতে আট কোটি মানুষকে হয়রান করা হল, লক্ষ লক্ষ ভোটারের নাম মুছে ফেলা হল। এতে কী উদ্দেশ্য পূরণ হয়েছে?”
রাষ্ট্রসংঘের বিশেষ প্রতিবেদকদের পক্ষ থেকে এসআইআর নিয়ে উদ্বেগ প্রসঙ্গেও কুরেশি বলেন, দেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে বিদেশি সংস্থার মন্তব্য করা দুর্ভাগ্যজনক। তবে বিষয়টিকে শুধুমাত্র ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে উড়িয়ে দেওয়াও ঠিক হবে না। অভিযোগগুলি গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখে স্পষ্ট জবাব দেওয়া উচিত।
তাঁর মতে, বিষয়টি আন্তর্জাতিক সংবাদে পরিণত হয়েছে। ফলে নির্বাচন কমিশন যদি নীরব থাকে, তাহলে সন্দেহ আরও বাড়বে। “বিশ্বের কাছে গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে হবে,” বলেন তিনি।
নতুন ভোটারদের জন্য ফর্ম-৬ জমা দেওয়ার সময় বাবা-মায়ের এসআইআর সংক্রান্ত তথ্য বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তেরও সমালোচনা করেন কুরেশি। তাঁর অভিযোগ, এটি ভোটারদের জীবনকে আরও জটিল ও দুর্বিষহ করে তোলার ধারাবাহিক প্রচেষ্টার অংশ।
ভারতীয় সংবিধানের ৩২৬ নম্বর অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে কুরেশি বলেন, নির্দিষ্ট কিছু সীমাবদ্ধতা ছাড়া প্রত্যেক নাগরিকের ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হওয়ার অধিকার রয়েছে। “এটি সাংবিধানিক অধিকার, নির্বাচন কমিশনের দয়া নয়,” তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য।
বর্তমানে নির্বাচন কমিশন ১৬টি রাজ্য ও তিনটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ধাপে ধাপে এসআইআরের তৃতীয় পর্যায় শুরু করেছে। এই পর্যায়ে প্রায় ৩৬.৭৩ কোটি ভোটার এই প্রক্রিয়ার আওতায় আসবেন।
সাক্ষাৎকারে প্রাক্তন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার টি. এন. শেষণের ভূয়সী প্রশংসা করে কুরেশি বলেন, শেষণ এমন সময় নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছিলেন, যখন অনেকেই কমিশনকে আইন মন্ত্রকের একটি সাধারণ দপ্তর বলেই মনে করতেন।
বর্তমান সময়ে আবারও কি দেশের একজন টি. এন. শেষণের প্রয়োজন রয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তরে কুরেশি বলেন, সময় বদলেছে, পরিস্থিতিও বদলেছে। তবে আজও মানুষের কাছে দৃশ্যমানভাবে নিরপেক্ষ, ন্যায্য এবং সমদূরত্ব বজায় রেখে কাজ করা একটি নির্বাচন কমিশনের প্রয়োজনীয়তা আগের মতোই রয়েছে।
“গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের আস্থা বজায় রাখতে নির্বাচন কমিশনের কাজ শুধু নিরপেক্ষ হওয়াই যথেষ্ট নয়, সেই নিরপেক্ষতা মানুষের চোখেও স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হতে হবে,” মন্তব্য করেন তিনি।
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন