সংসদের সদ্য সমাপ্ত বর্ষাকালীন অধিবেশনকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় সরকারকে তীব্র আক্রমণ শানালো কংগ্রেস। কংগ্রেসের দাবি, পুরো অধিবেশন জুড়ে মোদী সরকার “ভীত ও বিপর্যস্ত” ছিল। অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের ঐক্য ও সমন্বয় দৃঢ় ছিল। একই সঙ্গে বিজেপি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে সংসদীয় আলোচনা এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগও তুলেছে প্রধান বিরোধী দল।
বৃহস্পতিবার অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য মুলতবি হওয়ার পর আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে কংগ্রেসের যোগাযোগ বিভাগের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ এবং লোকসভায় বিরোধী দলের উপনেতা গৌরব গগৈ সরকারের ভূমিকার কড়া সমালোচনা করেন।
জয়রাম রমেশের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ অধিকাংশ সময় সংসদীয় কার্যক্রম থেকে দূরে ছিলেন। তাঁর দাবি, অধিবেশনের শেষ দিনে মুলতবির ঠিক আগে তাঁদের সংসদে দেখা যায়।
২০১৫ সালের বর্ষাকালীন অধিবেশনের প্রসঙ্গ টেনে জয়রাম রমেশ বলেন, তখন ‘ব্যাপম’ কেলেঙ্কারির কারণে সংসদের কাজকর্ম ব্যাহত হয়েছিল। রমেশের মতে, এক দশকেরও বেশি সময় পরে এবারও যুবসমাজকে ঘিরে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুর জেরে অধিবেশন কার্যত অচল হয়ে পড়ে।
কংগ্রেস নেতা জানান, অধিবেশন চলাকালীন ‘ইন্ডিয়া’ জোটভুক্ত দলগুলোর মধ্যে নিয়মিত সমন্বয় বজায় ছিল। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের কক্ষে একাধিক বৈঠকের মাধ্যমে বিভিন্ন সংসদীয় কৌশল নির্ধারণ করা হয় এবং বিরোধীরা একসঙ্গে অবস্থান নেয়।
রমেশের দাবি, বিরোধী দলগুলোর চাপের কারণেই সরকারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আইন প্রণয়নের উদ্যোগ পিছিয়ে গেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ‘এক দেশ, এক নির্বাচন’ সংক্রান্ত বিল শীতকালীন অধিবেশন পর্যন্ত স্থগিত রাখতে হয়েছে। পাশাপাশি ‘বিকশিত ভারত শিক্ষা অধিষ্ঠান বিল, ২০২৫’-এর ওপরও অগ্রগতি হয়নি, কারণ সংশ্লিষ্ট যৌথ সংসদীয় কমিটি এখনও তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়নি।
এছাড়া প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রীকে টানা ৩০ দিন গ্রেপ্তার ও আটক রাখার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে পদচ্যুত করার প্রস্তাব-সংবলিত সংবিধান সংশোধনী বিলও সংসদে আনা সম্ভব হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
এফসিআরএ সংশোধনী বিল যৌথ কমিটির কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্তকেও বিরোধী শিবিরের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেন রমেশ। একই সঙ্গে তিনি বলেন, আসন পুনর্বিন্যাস বা ডিলিমিটেশন সংক্রান্ত প্রস্তাবিত সংবিধান সংশোধনী বিলও সংসদে পেশ করা যায়নি, যা সরকারের প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সমর্থনের অভাবকেই সামনে এনেছে।
তবে বিরোধীদের আপত্তি সত্ত্বেও কোনো আলোচনা ছাড়াই ‘খনি ও খনিজ (উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ) সংশোধনী বিল, ২০২৬’ এবং ‘জাতীয় সমবায় উন্নয়ন কর্পোরেশন (সংশোধনী) বিল, ২০২৬’ পাস হওয়ার বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে কংগ্রেস।
অন্যদিকে গৌরব গগৈ জানান, বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে নিট (NEET) পরীক্ষায় কথিত দুর্নীতি, রাম মন্দিরে অনুদান চুরির অভিযোগ, ইথানল মিশ্রণ নীতি, বিজেপি-শাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ, বিদেশনীতি এবং পরিকাঠামো খাতে সরকারি ব্যয় নিয়ে আলোচনা দাবি করেছিল।
শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি জানানোর পাশাপাশি আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের অভিযোগ এবং সেই বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
গগৈ-এর অভিযোগ, বিরোধীদের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও প্রশ্নপত্র ফাঁস-বিরোধী বিল নিয়ে আলোচনার সময় শাহ উপস্থিত ছিলেন না। অধিবেশন শেষ হওয়ার প্রাক্কালে সরকার আলোচনা করতে রাজি হলেও, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পেলেট ব্যবহারের নির্দেশ কে দিয়েছিলেন, সে বিষয়ে সরাসরি কোনো উত্তর দেওয়া হয়নি বলেও দাবি করেন তিনি।
কংগ্রেসের বক্তব্য, অধিবেশন জুড়ে তৈরি হওয়া অচলাবস্থার জন্য বিরোধীরা নয়, বরং সরকারই দায়ী। কারণ, বিরোধীদের উত্থাপিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ওপর আলোচনা ও জবাবদিহি এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতাই এই পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে।
গগৈ বলেন, “সরকার বারবার শক্তিশালী নেতৃত্বের দাবি করলেও এই অধিবেশনে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। বরং বিরোধী ঐক্য ও সরকারের অস্বস্তিই বেশি স্পষ্ট হয়েছে।”
সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশন ঘিরে সরকার ও বিরোধীদের এই রাজনৈতিক সংঘাত আগামী শীতকালীন অধিবেশনেও প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন