নদীর ধারে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে কয়েকজন আদিবাসী মহিলা। প্রত্যেকের গলায় ঝুলছে ফাঁসের দড়ি। কয়েক মাস আগেই তাঁদের অনেককে দেখা গিয়েছিল প্রতীকী চিতার উপর শুয়ে থাকতে। আন্দোলনরত এই আদিবাসী মহিলাদের বার্তা খুব স্পষ্ট - যে উন্নয়ন তাঁদের ঘর, জমি, জঙ্গল আর ভবিষ্যৎ কেড়ে নিতে চায়, সেই জীবনের চেয়ে মৃত্যু ভালো।
কেন এই আন্দোলন?
মধ্যপ্রদেশের ছত্তরপুর ও পান্না জেলার আদিবাসী গ্রামে যে আন্দোলন চলছে তাকে শুধুমাত্র ক্ষতিপূরণ বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন ভাবলে ভুল হবে। আসলে এই আন্দোলন জল জমি জঙ্গল বাসস্থান রক্ষার লড়াই, অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। প্রজন্মের পর প্রজন্মের ধরে যাঁদের জীবন নদী, জঙ্গল এবং কৃষিজমিকে ঘিরে গড়ে উঠেছে, অথচ উন্নয়নের নতুন মানচিত্রে তাদের জন্য জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে, এই লড়াই সেইসব মানুষদের।
প্রকল্প প্রসঙ্গে সরকারের বক্তব্য কী?
২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী কেন-বেতওয়া নদী সংযোগ (Ken-Betwa River Linking Project) প্রকল্পের সূচনা করেন। প্রায় ৪৪,৬০৫ কোটি টাকার এই প্রকল্পকে দেশের প্রথম বৃহৎ নদী-সংযোগ প্রকল্প হিসেবে তুলে ধরা হয়। ২২০ কিলোমিটার খাল কেটে এই দুই নদীকে যুক্ত করা হবে।
কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, এর মাধ্যমে বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলের ৬২ লক্ষ মানুষের পানীয় জলের ব্যবস্থা হবে এবং ১০.৬২ লক্ষ হেক্টর জমিতে সেচ পৌঁছাবে। কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্য অনুসারে এই নদী সংযুক্তির ফলে ছত্তরপুর, পান্না, টিকমগড়, নিওয়ারি, দামোহ, সাগর, দাঁতিয়া, শিবপুরী, বিদিশা এবং রাইসান জেলা উপকৃত হবে। এছাড়াও মাহোবা, ঝাঁসি, বান্দা এবং ললিতপুরও উপকৃত হবে। এই প্রকল্প থেকেই ১০৩ মেগাওয়াট হাইড্রোপাওয়ার এবং ২৭ মেগাওয়াট সোলার পাওয়ার তৈরি হবে। যদিও আপাত ঝকঝকে এই প্রকল্পের আড়ালে লুকিয়ে বেশ কিছু নির্মম বাস্তব। উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে স্থানীয় মানুষের সব হারানোর আশঙ্কা।
সরকারের দেওয়া হিসেব অনুযায়ই, দৌধন বাঁধ (Daudhan Dam) নির্মাণের ফলে ছত্তরপুরে ৫,২৮৮টি এবং পান্নায় প্রায় ১,৪০০টি পরিবারকে বাস্তুচ্যুত হতে হবে। সরাসরি প্রভাবিত হবে মোট ২৪টি গ্রামের মানুষ। যাঁদের অধিকাংশই গোন্দ এবং কোল আদিবাসী সম্প্রদায়ের সদস্য। যাদের জীবন ও সংস্কৃতির মূল ভিত্তিই হল বনভূমি। এই প্রকল্পের কারণে যা প্রায় হারিয়ে যাবার মুখে।
আন্দোলনকারীদের বক্তব্য কী?
এই প্রকল্প ঘোষিত হবার পর থেকেই আন্দোলনে নেমেছেন এই অঞ্চলের মানুষ। গত কয়েক মাস ধরে আন্দোলন নানা রূপ নিয়েছে। প্রাথমিক অবস্থায় অবস্থান-বিক্ষোভ, মিছিল, অবরোধ, ঘেরাওয়ের পর গত এপ্রিল মাসে আদিবাসী মহিলারা শুরু করেন ‘চিতা আন্দোলন’। প্রতীকী চিতায় শুয়ে তাঁরা জানিয়ে দেন, জোরপূর্বক উচ্ছেদ তাঁদের কাছে মৃত্যুর সমান। দফায় দফায় প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা হলেও এখনও সমস্যার সমাধান হয়নি। ক্রমশ ক্রমশ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে আন্দোলন। নদীর পাড়ে গলায় ফাঁস ঝুলিয়ে আন্দোলনকারীরা রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করছেন, তাঁদের জীবনের বিনিময়েই কি উন্নয়ন হবে?
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি বাস্তবে পর্যাপ্ত নয়। বহু পরিবার এখনও পুনর্বাসনের আওতার বাইরে। নগদ টাকা দিয়ে সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করছে সরকার। যদিও এই অঞ্চলের মানুষের দাবি জমির বদলে জমি, গ্রামের বদলে গ্রাম। কারণ এই অঞ্চলের মানুষের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সামাজিক বন্ধন কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা করা টাকার অঙ্কে প্রতিস্থাপন করা যায় না।
বিতর্ক আরও বাড়ে, যখন দেখা যায়, যাঁরা উচ্ছেদের শিকার, তাঁদের অনেকেই প্রকল্পের প্রত্যক্ষ সুবিধাভোগী নন। একদিকে লক্ষ লক্ষ মানুষের জন্য জল ও সেচের প্রতিশ্রুতি, অন্যদিকে কয়েক হাজার আদিবাসী পরিবারের জীবন-জীবিকা হারানোর আশঙ্কা। ফলে প্রশ্ন উঠছে, উন্নয়নের সুফল এবং তার মূল্য কি সমভাবে বণ্টিত হচ্ছে?
বনাধিকার আইন ২০০৬ কী বলছে?
আইনি দিক থেকেও এই প্রশ্ন যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। বনাধিকার আইন, ২০০৬ বনবাসী আদিবাসীদের জমি ও বনসম্পদের উপর অধিকার স্বীকার করেছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও ‘ফ্রি, প্রায়র অ্যান্ড ইনফর্মড কনসেন্ট’ বা স্বাধীন, পূর্ববর্তী ও অবহিত সম্মতির নীতি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু এক্ষেত্রে আন্দোলনকারীদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, তাঁদের মতামতকে যথাযথ গুরুত্ব না দিয়েই প্রকল্প এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে কারা?
এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন গ্রামের মহিলারা। চিতা আন্দোলন থেকে শুরু করে গলায় ফাঁস ঝুলিয়ে প্রতিবাদ, বারবার তাঁরাই সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন, দাঁড়াচ্ছেন। কারণ তাঁরা জানেন, জমি হারানো মানে শুধু বাড়ি হারানো নয়; আসলে হারিয়ে ফেলা এক সমাজ, এক সংস্কৃতি এবং আগামী প্রজন্মের নিরাপত্তা।
ছত্তরপুরের নদীর ধারে ঝুলে থাকা সেই ফাঁসগুলো তাই শুধু প্রতিবাদের প্রতীক নয়। এই প্রতিবাদ আমাদের উন্নয়ন ভাবনার সামনে ছুঁড়ে দেওয়া এক কঠিন প্রশ্ন। কোটি মানুষের জলনিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কিসের বিনিময়ে সেই লক্ষ্যপূরণ? সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য যদি কয়েক হাজার আদিবাসী পরিবারকে তাদের ভূমি, বন, সংস্কৃতি ও মর্যাদা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হয়, তাহলে উন্নয়নের ন্যায়বিচার কোথায়?
কেন-বেতওয়া প্রকল্পের বিরুদ্ধে এই আন্দোলন তাই শুধুমাত্র কোনও স্থানীয় বিক্ষোভ নয়। বরং এই আন্দোলন ভারতের উন্নয়ন মডেলকে ঘিরে এক মৌলিক প্রশ্ন, মৌলিক বিতর্ক। উন্নয়ন যদি মানুষের জন্যই হয়, তাহলে সেই উন্নয়নের জন্য মানুষকেই কেন বলি হতে হবে?