Kerala: হাতে মাত্র ২১ দিন; প্রার্থী ঘোষণায় পিছিয়ে কংগ্রেস, বিজেপি; প্রচার তুঙ্গে বাম প্রার্থীদের

People's Reporter: অতীতে কেরালায় প্রচারে সবচেয়ে কম সময় পাওয়া গেছিল ১৯৭০-এর ভোটে। ৩১ দিন। ২০২১-এর ভোটে প্রচারে সময় ছিল ৩৯ দিন। ২০১৬-র ভোটে ঘোষণা থেকে ভোটগ্রহণ পর্যন্ত ৭৩ দিন সময় ছিল।
মালমপুঝা বিধানসভা কেন্দ্রের সিপিআই(এম) প্রার্থী এ. প্রভাকরণ, প্রার্থী ঘোষণার পরেই রোড শো তে
মালমপুঝা বিধানসভা কেন্দ্রের সিপিআই(এম) প্রার্থী এ. প্রভাকরণ, প্রার্থী ঘোষণার পরেই রোড শো তে ছবি লেফট ভিউ থেকে সংগৃহীত
Published on

কেরালা বিধানসভা নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষিত হয়ে গেছে ১৫ মার্চ। ১৮ মার্চ থেকে হিসেব ধরলে রাজনৈতিক দলগুলোর হাতে প্রচারের জন্য সময় রয়েছে মাত্র ২১ দিন। কেরালার ইতিহাসেও এত কম প্রচারপর্বে এর আগে কোনও নির্বাচন হয়নি।  

এর আগে কেরালায় নির্বাচনী প্রচারে সবচেয়ে কম সময় পাওয়া গেছিল ১৯৭০ সালের নির্বাচনে। সেবার প্রচারের জন্য ৩১ দিন সময় ছিল। সাম্প্রতিক সময়ের দিকে তাকালে পার্থক্যটা আরও স্পষ্ট হয়। ২০২১ সালের নির্বাচনে প্রচারের সময় ছিল প্রায় ৩৯ দিন। ২০১৬ সালে নির্বাচন ঘোষণা থেকে ভোটগ্রহণ পর্যন্ত প্রায় ৭৩ দিন সময় পেয়েছিল রাজনৈতিক দলগুলো। ফলে এবারের নির্বাচনী লড়াইতে রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রথম থেকেই সময়ের সঙ্গে দৌড়োতে হচ্ছে।

দ্রুত সিদ্ধান্তে এগিয়ে এল এলডিএফ

সময়ের এই চাপের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে এলডিএফ জোটের পক্ষ থেকে। নির্বাচন ঘোষণার কিছুক্ষণ পরেই জোটের প্রধান দুই দল সিপিআই ও সিপিআই(এম) অধিকাংশ আসনের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে দেয়। বিধানসভা নির্বাচনের জন্য বাম জোট যে আগেভাগেই যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল তা নির্বাচন ঘোষণার মাত্র দেড় ঘণ্টার মধ্যে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ থেকেই বোঝা যায়।

সিপিআই(এম) যখন তাদের প্রথম তালিকা প্রকাশ করে, সেখানে নির্দল প্রার্থীসহ মোট ৮১ জনের নাম ছিল। এই তালিকায় প্রায় ৭০ শতাংশই ছিলেন বর্তমান বিধায়ক। মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন সহ দলের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে সিপিআইএম-এর দুই মেয়াদের সীমাবদ্ধতা থেকে ছাড় দেওয়া হয়েছে। মোট ১৬ জনকে এই নিয়মের বাইরে রেখে আবারও নির্বাচনে লড়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কারণ বাম জোটের অভ্যন্তরীণ সমীক্ষা অনুসারে এঁদের জয়ের সম্ভাবনা বেশি।

প্রার্থীদের নাম ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই বাম জোটের প্রার্থীরা রাস্তায় নেমে প্রচার শুরু করে দিয়েছেন। প্রচার চলছে সোশ্যাল মিডিয়াতেও।

ইউডিএফে ধীরগতি

যদিও এর সম্পূর্ণ উল্টো ছবি বিরোধী ইউডিএফ শিবিরে। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউডিএফ জোট এখনও পর্যন্ত প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করতে পারেনি। উল্টে নির্বাচন ঘোষণার পরপরই কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বকে বেশ কিছুটা অপ্রস্তুত অবস্থায় দেখা যাচ্ছে। ১৭ মার্চ বিকেলে কংগ্রেসের প্রথম প্রার্থী তালিকা প্রকাশিত হলেও তাতে মাত্র ৫৫টি নাম ঘোষিত হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এত কম সময়ের মধ্যে সংগঠিত প্রচার গড়ে তোলা ইউডিএফের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। প্রার্থী বাছাইয়ে দেরির কারণে দলের পক্ষে প্রচারে নামাও সম্ভব হচ্ছে না। ফলে প্রাথমিকভাবে কিছুটা হলেও বাম জোটের তুলনায় পিছিয়ে ইউডিএফ।

বিভিন্ন সমীক্ষকদের মতে, কেরালায় নির্বাচন ঘোষণা এবং তার পরবর্তী পরিস্থিতি থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে বামজোট নির্বাচনের জন্য বহু আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। যা ইউডিএফ নেয়নি। ফলে এখনও তারা নিজেদের ঘর গুছিয়ে উঠতে পারেনি। একই কথা বিজেপির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। কিছু আসনে প্রস্তুতি থাকলেও অধিকাংশ আসনেই বিজেপি এখনও প্রস্তুত নয়।

প্রচারের সময় কম হবার কারণে কারা সুবিধা পাবেন?

প্রচারের সময় কম হবার কারণে যে সব প্রার্থী আগে থেকেই পরিচিত তারা অনেকটাই সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবেন। বিশেষ করে শাসকজোট এলডিএফ-এর বর্তমান মন্ত্রী বা বিধায়কদের ক্ষেত্রে এই সুবিধা কিছুটা হলেও বেশি।

কিন্তু নতুন প্রার্থীদের জন্য পরিস্থিতি যথেষ্ট কঠিন। কারণ এই অল্প সময়ের মধ্যে পুরো বিধানসভা এলাকা ঘোরা, ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলা খুবই কঠিন। স্থানীয় সংগঠন মজবুত থাকলেও তা অনেকসময়েই কঠিন হয়ে যায়।

ইউডিএফের প্রার্থী তালিকা প্রকাশিত না হওয়ায় তা প্রকাশিত হবার পর ক্ষোভ বিক্ষোভ কতটা থাকবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। সবকিছু মিটিয়ে প্রচারে নামতে নামতে আরও দু’একদিন লেগে যাবার সম্ভাবনা। অহেতুক এই দেরি বিরোধী ইউডিএফ-কে অনেকটাই পিছিয়ে দিচ্ছে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

এলডিএফের সামনে অন্য চ্যালেঞ্জ

তবে এবার কেরালায় এলডিএফ শিবিরেও যথেষ্ট সমস্যা আছে। বেশ কয়েকজন প্রতিষ্ঠিত নেতার মনোনয়ন না পেয়ে শিবির ত্যাগ তাদের কিছুটা হলেও বিপাকে ফেলতে পারে। এছাড়াও একটানা ১০ বছর শাসন ক্ষমতায় থাকার কারণে রাজ্যের বেশ কিছু অঞ্চলে প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার হাওয়া চলছে।

এছাড়াও বাম জোটের প্রার্থী ঘোষণার পর মনোনয়ন না পেয়ে ক্ষুব্ধ কিছু নেতার নির্দল হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত ঘোষণাও বাম জোটের বিপক্ষে যাবে। এইসব বিদ্রোহী নেতারা জনমানসে কতটা প্রভাব ফেলতে পারবেন তা আরও কয়েকটা দিন না গেলে স্পষ্ট হবে না।

বিজেপির সম্ভাব্য ভূমিকা

এই নির্বাচনে বিজেপির ভূমিকাও আলোচনায় রয়েছে। কিছু কিছু পর্যবেক্ষক মনে করছেন, বিজেপি আগের তুলনায় ভালো ফল করতে পারে। যদিও এখনও পর্যন্ত কোনও আসনে বিজেপির নিশ্চিত জয়ের সম্ভাবনা স্পষ্ট নয়। তবে বেশ কিছু অঞ্চলে দলত্যাগী বাম নেতৃত্বকে দলে নেবার ফলে স্থানীয় বিজেপি কর্মীদের ক্ষোভ বাড়ছে। এঁদের প্রার্থী করা হলে এই ক্ষোভ আরও বাড়বে। ফলে প্রতিষ্ঠান বিরোধী ভোট কিছুটা হলেও যা বিজেপির দিকে যাবার সম্ভাবনা ছিল তা নষ্ট হবে।

যদিও বিজেপির ভোট বাড়লে তা পরোক্ষে বামেদের সুবিধা করে দেবে বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল। ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার আসনে তৃতীয় শক্তি বেশ কিছু ভোট কেটে নিলে তাতে শাসকদলের সুবিধা হবার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

প্রার্থী ঘোষণার নিরিখেও এখনও অনেকটাই পিছিয়ে এনডিএ তথা বিজেপি। এখনও পর্যন্ত বিজেপির পক্ষ থেকে প্রথম দফায় ৪৭ জন প্রার্থীর নাম ঘোষিত হয়েছে।

বিতর্কিত সময়সূচি

নির্বাচনের সময়সূচি নিয়েও কিছু প্রশ্ন উঠেছে। সুপ্রিম কোর্টে শবরীমালা মন্দিরে নারীদের প্রবেশাধিকারের বিষয়টি নিয়ে শুনানি শুরু হওয়ার কথা ৭ এপ্রিল থেকে এবং তা চলবে ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত।

অন্যদিকে কেরালায় নির্বাচনী প্রচার শেষ হবে ৭ এপ্রিল সন্ধ্যায়। ফলে এই সংবেদনশীল ইস্যুটি নির্বাচনী প্রচারের মূল আলোচনায় খুব বেশি জায়গা পাবে না।

কিছু কিছু বিশ্লেষকের মতে, এই সময়সূচি হয়তো কাকতালীয়। আবার কেউ কেউ ধারণা করছেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে হিসাব করেও এই তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও এর পক্ষে কোনো নিশ্চিত প্রমাণ নেই।

উপসাগরীয় প্রেক্ষাপট

কেরালার রাজনীতিতে এবং ভোটের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে উপসাগরীয় যুদ্ধ। রাজ্যের বিপুল সংখ্যক মানুষ পেশাগত কারণে বিভিন্ন উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকেন। পশ্চিম এশিয়ার অস্থির পরিস্থিতি অনেক পরিবারের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যার প্রভাব পড়তে পারে নির্বাচনে।

এই প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন ভোটারদের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ফলে অনেকেই পরিচিত প্রশাসন বা বর্তমান সরকারের দিকেই ঝুঁকতে পারেন।

ম্যারাথন থেকে স্প্রিন্ট

যে নির্বাচনী লড়াই দীর্ঘ সময় ধরে চলবে বলে মনে করা হয়েছিল, তা এখন অনেকটা স্বল্প সময়ের তীব্র প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে দলগুলোকে প্রার্থী ঘোষণা, প্রচার সংগঠিত করা, ভোটারদের কাছে পৌঁছানো—সবকিছু করতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে সবথেকে সুবিধাজনক অবস্থায় থাকবে শাসক জোট এলডিএফ।

এই দ্রুতগতির নির্বাচনী পরিবেশে যে দল সংগঠন, বার্তা এবং প্রার্থী নির্বাচন—এই তিনটি ক্ষেত্রেই দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, শেষ পর্যন্ত তারাই সম্ভবত এগিয়ে থাকবে। আর ইউডিএফের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে নিজেদের ভেতরের ঐক্য বজায় রেখে এই দ্রুতগতির নির্বাচনী লড়াইয়ে তাল মিলিয়ে চলা।

মালমপুঝা বিধানসভা কেন্দ্রের সিপিআই(এম) প্রার্থী এ. প্রভাকরণ, প্রার্থী ঘোষণার পরেই রোড শো তে
Kerala: মনোনয়ন না পেয়ে ক্ষোভ; কংগ্রেসে যোগ দিতে ব্যর্থ হয়ে বিজেপিতে যোগ দিলেন বাম বিধায়ক
মালমপুঝা বিধানসভা কেন্দ্রের সিপিআই(এম) প্রার্থী এ. প্রভাকরণ, প্রার্থী ঘোষণার পরেই রোড শো তে
Kerala: কেরালায় কে কে শৈলজার কেন্দ্র বদল; কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটিতে কেন? প্রশ্ন দলের অন্দরেই

SUPPORT PEOPLE'S REPORTER

ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন

Related Stories

No stories found.
logo
People's Reporter
www.peoplesreporter.in