কেরালার রাজনীতিতে মহিলাদের উপস্থিতি নিয়ে যে প্রত্যাশা বারবার তৈরি হয়, তা বাস্তবে এসে যেন থমকে যায়। ভোটার তালিকায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও প্রার্থী তালিকায় নারীদের অংশগ্রহণ এখনও আশানুরূপ নয়। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন সেই পুরোনো ছবিটাই আবার সামনে এনেছে। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, কেরালায় ১,৩২,২০,৮১১ জন পুরুষ ভোটারের বিপরীতে মহিলা ভোটারের সংখ্যা ১,৩৯,২১,৮৬৮ জন।
রাজ্যে ১.৩৯ কোটির বেশি মহিলা ভোটার থাকা সত্ত্বেও মোট ১৪০টি আসনের মধ্যে মহিলা প্রার্থীর সংখ্যা মাত্র প্রায় ৪০। অর্থাৎ, যারা নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা নেন, তারাই সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে প্রায় অনুপস্থিত। এই বৈপরীত্য শুধু যে সংখ্যার সমস্যা সেরকম নয়, বরং রাজনৈতিক কাঠামোর গভীরে থাকা সীমাবদ্ধতার ইঙ্গিত।
২০২৩ সালে ‘নারী শক্তি বন্দন’ আইন পাস হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলাবে—এমন আশা তৈরি হয়েছিল। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু-র অনুমোদনের পর অনেকেই ভেবেছিলেন, অন্তত রাজনৈতিক দলগুলো স্বেচ্ছায় মহিলাদের বেশি সুযোগ দেবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। এই আইন কার্যকর হওয়ার আগেই দলগুলোর মনোভাব স্পষ্ট হয়ে গেছে—প্রার্থী নির্বাচনে মহিলারা এখনও অগ্রাধিকার পাচ্ছেন না।
এবারের নির্বাচনে বিভিন্ন দলের তালিকা সেই কথাই বলছে। সিপিআই(এম) ১২ জন, সিপিআই - ৫ জন, কংগ্রেস ৯ জন, বিজেপি ১৪ জন মহিলা প্রার্থী দিয়েছে। সংখ্যার এই সীমাবদ্ধতাই দেখিয়ে দিচ্ছে, দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকলেও মহিলাদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর ক্ষেত্রে তেমন উদ্যোগ নেই। এমনকি ঐতিহাসিকভাবে রক্ষণশীল বলে বিবেচিত ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লীগ প্রথমবারের মতো মাত্র দুজন মহিলা প্রার্থী দিয়েই নিজেদের ‘অগ্রগতি’ দেখাতে চেয়েছে।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের বক্তব্যেও এক ধরনের বৈপরীত্য দেখা যায়। কংগ্রেস নেতা পি সি বিষ্ণুনাথ স্বীকার করেছেন যে দল মহিলা প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে চায়, কিন্তু জয়ের সম্ভাবনা বিবেচনা করতে গিয়ে অনেক সময় পিছিয়ে যেতে হয়। এই যুক্তি যদিও নতুন নয়, তবে তা সমস্যার গভীরতাকেই তুলে ধরে—যোগ্যতা নয়, বরং ‘নিরাপদ’ প্রার্থী বেছে নেওয়ার প্রবণতাই এখানে প্রধান।
অন্যদিকে, বামপন্থী নেত্রী পি কে শ্রীমতী প্রকাশ্যে এই বিষয়ে অসন্তোষ জানিয়েছেন। তাঁর মতে, নারীদের জন্য বরাদ্দ আসন এখনও অত্যন্ত কম, এবং দলীয় পর্যায়ে আরও শক্ত অবস্থান নেওয়া জরুরি। তবে তিনিও স্বীকার করেছেন, প্রার্থী তালিকা তৈরির সময় বাস্তবে সেই চাপ কার্যকর হয় না।
এই প্রেক্ষাপটে বিজেপি নারী ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে কেন্দ্রের উদ্যোগকে সামনে আনলেও, সমালোচকরা এটিকে নির্বাচনী কৌশল হিসেবেই দেখছেন। বিশেষ করে আইনটি বাস্তবায়নে বিলম্ব হওয়ায় সন্দেহ আরও বেড়েছে—এটি কি সত্যিই কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রচেষ্টা, নাকি ভোটের আগে একটি রাজনৈতিক বার্তা?
সংরক্ষণের প্রভাব নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন কংগ্রেস সাংসদ জেবি মাথের। তাঁর মতে, স্থানীয় স্বশাসন প্রতিষ্ঠানগুলোতে সংরক্ষণের ফলে মহিলাদের অংশগ্রহণ ৫৪ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, আইনি কাঠামো থাকলে পরিবর্তন সম্ভব—এটা ইতিমধ্যেই প্রমাণিত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক জি গোপাকুমার এই সমস্যার মূল কারণ হিসেবে দলীয় কাঠামোর ভেতরে থাকা পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতাকে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট—স্বেচ্ছায় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা কম, তাই আইনি বাধ্যবাধকতা জরুরি।
ইতিহাসও একই কথা বলে। ১৯৫৭ সালে কেরালা বিধানসভা গঠনের পর থেকে মহিলা প্রতিনিধিত্ব কখনও ১০ শতাংশ ছাড়ায়নি। এত দীর্ঘ সময়েও যদি পরিস্থিতি না বদলায়, তাহলে বোঝাই যায় সমস্যাটা কতটা গভীর।
সব মিলিয়ে, কেরালার রাজনীতিতে মহিলাদের উপস্থিতি এখনো প্রতিশ্রুতির স্তরেই আটকে আছে। ভোটের সময় তাদের গুরুত্ব স্বীকার করা হলেও, ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছানোর পথ এখনও সংকীর্ণ। এই ব্যবধান না কমলে ‘নারী ক্ষমতায়ন’ শব্দটি কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন