

দেশে প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পৌঁছানোর পথে প্রায় ৭৩ শতাংশ শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এক সংসদীয় কমিটি (Parliamentary Committee on Estimates)। কমিটির সমীক্ষা অনুসারে, উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে স্কুলের সংখ্যা কম থাকা এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ। কমিটির সমীক্ষা রিপোর্টে বর্তমান প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলিকে ধাপে ধাপে পূর্ণাঙ্গ উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে উন্নীত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার সংসদে পেশ করা ‘দেশে সাশ্রয়ী ও মানসম্মত শিক্ষা প্রদানের বাজেট ও নীতিগত দিক এবং সিবিএসই-এর পর্যালোচনা’ (‘Budget and Policy aspects for providing Affordable and Quality Education in the Country including Review of Central Board of Secondary Education’) শীর্ষক প্রতিবেদনে এই সমীক্ষা সংক্রান্ত বিস্তারিত বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। সমীক্ষার ক্ষেত্রে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
ইউনিফায়েড ডিস্ট্রিক্ট ইনফরমেশন সিস্টেমস ফর এডুকেশন (Unified District Information System for Education - UDISE)-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৬.১৮ কোটির বেশি। উচ্চ প্রাথমিক স্তরে যা (ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি) নেমে এসেছে ৪ কোটির কিছু বেশি সংখ্যায়। এই সংখ্যাই নবম ও দশমের ক্ষেত্রে আরও কমে যাচ্ছে। মাধ্যমিক স্তরে দেখা যাচ্ছে শিক্ষার্থী রয়েছে প্রায় ২.৩ কোটি এবং একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১.৬ কোটিতে। অর্থাৎ প্রাথমিক স্তরের ৬.১৮ কোটি ছাত্রের মধ্যে মাত্র ১.৬ কোটি দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত পড়াশুনো চালিয়ে যাচ্ছে।
রিপোর্টে স্কুলের সংখ্যা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংসদীয় কমিটি। স্কুলের সংখ্যার ক্ষেত্রে সরকারি ও সরকার-পোষিত মিলিয়ে দেশে প্রায় ১০ লক্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৯.১ লক্ষই প্রাথমিক বিদ্যালয়। উচ্চ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৪ লক্ষের কিছু বেশি, মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রায় ১.৬ লক্ষ এবং উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয় মাত্র ৯০ হাজারের কাছাকাছি। এক্ষেত্রে কমিটি তাদের রিপোর্টে জানিয়েছে, শিক্ষা যত উচ্চ স্তরে যাচ্ছে ততই ছাত্র সংখ্যা যেমন কমছে তেমনই কমছে স্কুলের সংখ্যায়। ফলে বড়ো সংখ্যায় শিক্ষার্থীরা উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে পৌঁছানর আগেই শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে সরে যাচ্ছে।
প্রতিবেদনে বর্তমান প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলিকে পর্যায়ক্রমে উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে উন্নীত করার বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে শিক্ষামন্ত্রককে। কমিটির মতে, এর ফলে বিভিন্ন সামাজিক ও ভৌগোলিক অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা আরও সহজলভ্য হবে এবং ড্রপ আউটের সম্ভাবনাও কমবে।
কমিটি আরও জানিয়েছে, দেশে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের স্কুলের সংখ্যা দ্রুত বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। যেহেতু শিক্ষা সংবিধানের সমবায়ী তালিকাভুক্ত বিষয় এবং অধিকাংশ স্কুল রাজ্য সরকার ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির অধীনে পরিচালিত হয়, তাই কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রককে রাজ্যগুলির সঙ্গে সমন্বয় করে এই ক্ষেত্রে উদ্যোগ বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
জিডিপির ৬ শতাংশ শিক্ষায় ব্যয়ের লক্ষ্য এখনও অধরা
বর্তমানে কেন্দ্র ও রাজ্য মিলিয়ে শিক্ষাখাতে মোট ব্যয় জিডিপির মাত্র ৪.১ শতাংশ। এক্ষেত্রে রিপোর্টে জাতীয় শিক্ষা নীতি (NEP) ২০২০-এর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য, শিক্ষাখাতে সরকারি ব্যয় জিডিপির ৬ শতাংশে উন্নীত করার বিষয়টির উল্লেখ করা হয়েছে।
কমিটির পর্যবেক্ষণ অনুসারে, এনইপি ২০২০ বাস্তবায়নের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেলেও নির্ধারিত লক্ষ্যের তুলনায় শিক্ষাখাতে ব্যয় এখনও উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে শিক্ষা মন্ত্রকের জন্য ১,৩৯,২৮৬ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৮.২৭ শতাংশ বেশি হলেও প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয় বলে মত কমিটির।
শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ আরও বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে ওই রিপোর্ট জানিয়েছে, শিক্ষা দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন, মানবসম্পদ গঠন এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির ভিত্তি। তাই পরিকাঠামো সম্প্রসারণ, শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বরাদ্দ আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
নিপুণ ভারত প্রকল্পে বিপুল অর্থ অব্যবহৃত
সংসদীয় কমিটির রিপোর্টে বলা হয়েছে, কেন্দ্রের ‘নিপুণ ভারত’ (NIPUN Bharat) কর্মসূচির অর্থ যথাযথভাবে ব্যবহার হয়নি। বেশ কিছু ক্ষেত্রে বরাদ্দকৃত অর্থ খরচ করা হয়নি বলেও নিজেদের পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে কমিটি।
২০২১ সালে চালু হওয়া নিপুণ ভারত প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের মধ্যে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত সমস্ত শিক্ষার্থীর মৌলিক ভাষা ও গণিত বিষয়ে দক্ষতা নিশ্চিত করা।যদিও এই প্রকল্পে ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে বরাদ্দ অর্থের উল্লেখযোগ্য অংশ খরচ করা যায়নি। মোট ৩,০২,৯২৬.৮২ লক্ষ টাকা অনুমোদিত বাজেট থাকলেও খরচ হয়েছে মাত্র ১,৮৪,৭০৭.৫৮ লক্ষ টাকা। অর্থাৎ এই খাতে প্রায় ৩৯ শতাংশ অর্থ অব্যবহৃত থেকে গেছে।
কমিটির রিপোর্টে যেসব রাজ্যে এই তহবিল ব্যবহারের হার অত্যন্ত কম বলে জানানো হয়েছে তার মধ্যে আছে অসম, দিল্লি, গোয়া, গুজরাট, কেরল, লক্ষদ্বীপ, সিকিম, পাঞ্জাব, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ এবং তামিলনাড়ুসহ একাধিক রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল।
কমিটির মতে, মৌলিক সাক্ষরতা ও গণিতের জ্ঞান উন্নয়নের মতো জাতীয় অগ্রাধিকারমূলক ক্ষেত্রে বরাদ্দকৃত অর্থের এই অব্যবহার অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নে কোথায় কোথায় প্রশাসনিক বা প্রাতিষ্ঠানিক বাধা রয়েছে, তা চিহ্নিত করে দ্রুত সমাধান করা জরুরি। এই কাজের জন্য শিক্ষা মন্ত্রককে বিস্তারিতভাবে সমস্ত বিষয়টি পর্যালোচনা করে দেখার সুপারিশ করা হয়েছে।
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন