Bullet Train: বুলেট ট্রেন প্রকল্পের জন্য ৮৪৭ টি ম্যানগ্রোভ কাটার আবেদন; উদ্বেগ বোম্বে হাইকোর্টের

People's Reporter: হাইকোর্টের পক্ষ থেকে বলা হয়, যদি এভাবেই ম্যানগ্রোভ ধ্বংস চলতে থাকে আগামী দিনে হয়তো এমন দিন আসতে পারে যখন মুম্বাইবাসীদের সব সময় অক্সিজেন সিলিন্ডার সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে হবে
ছবি প্রতীকী
ছবি প্রতীকীছবি নেচার জিওসায়েন্স থেকে সংগৃহীত
Published on

কী নিয়ে বিতর্ক?

মুম্বাই আহমেদাবাদ বুলেট ট্রেন প্রকল্পের বিদ্যুতায়নের জন্য ৮৪৭টি ম্যানগ্রোভ কাটতে হবে। মহারাষ্ট্র স্টেট ইলেক্ট্রিসিটি ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড-এর এই আবেদনে কড়া প্রতিক্রিয়া জানালো বোম্বে হাই কোর্ট। মহাট্রান্সকো-কে তীব্র তিরস্কার করে হাইকোর্ট এর পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। মহারাষ্ট্রের পালঘর জেলার দাহানু এবং আম্বেসারির মধ্যবর্তী অঞ্চল দিয়ে বিদ্যুতের লাইন নিয়ে যাবার কারণে এই গাছ কাটার আবেদন জানিয়েছে মহাট্রান্সকো (Mahatransco)।

পালঘর জেলায় দাহানু ও আম্বেসারাইয়ের মধ্যে ১৩২ কেভি (KV) বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নির্মাণের জন্য প্রায় ৩.৩৫ হেক্টর বনভূমি অঞ্চলের গাছ কাটতে হবে। বিদ্যুৎ সঞ্চালনকারী সংস্থা 'মহাট্রান্সকো' (Mahatransco) এই প্রকল্পের প্রয়োজনে ১.৯৬৫৬ হেক্টর ম্যানগ্রোভ এলাকার অন্তর্গত প্রায় ৮৪৭টি গাছ কাটার অনুমতি চেয়ে বম্বে হাইকোর্টে আবেদন করেছে।

মহাট্রান্সকো-র বক্তব্য

আদালতে শুনানির সময় মহাট্রান্সকো-র পক্ষ থেকে জানানো হয় মুম্বাই আহমেদাবাদ বুলেট ট্রেন প্রকল্পের জন্য বিদ্যুতের লাইন নিয়ে যেতে পালঘড় জেলায় ৮৪৭টি ম্যানগ্রোভ গাছ কাটতে হবে। পরিবর্তে ৫০০ কিলোমিটার দূরবর্তী অঞ্চলে সম সংখ্যক গাছ লাগিয়ে দেবে মহাট্রান্সকো। প্রসঙ্গত, এর আগে বুলেট ট্রেন প্রকল্পের জন্য যে পরিমাণ গাছ কাটা হয়েছে সেই ক্ষতিপূরণের জন্য ৬০ হাজার গাছ লাগানোর কথা থাকলেও তা এখনও শেষ হয়নি বলে অভিযোগ।

এর আগেই ২০১৮ সালে বোম্বে হাইকোর্টের পক্ষ থেকে এক মামলার রায়ে জানানো হয়েছিল, ম্যানগ্রোভ কাটার আগে বাধ্যতামূলক ভাবে আইনি অনুমোদন নিতে হবে। সে কারণেই এবার ৮৪৭টি ম্যানগ্রোভ কাটবার আগে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে মহাট্রান্সকো।

আদালতের ডিভিশন বেঞ্চের বক্তব্য

মহাট্রান্সকো-র এই প্রস্তাবে উদ্বেগ জানিয়ে বোম্বে হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ-এর পক্ষে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি রবীন্দ্র ঘুগে এবং বিচারপতি গৌতম আঙ্খাড জানান, কয়েকশ কিলোমিটার দূরে গাছ লাগিয়ে মুম্বাই মহানগর অঞ্চলের ম্যানগ্রোভ কেটে ফেলার ক্ষতিপূরণ কীভাবে সম্ভব? হাই কোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুসারে, এই উপকূলীয় অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রে এই গাছগুলির বড়ো ভূমিকা আছে। এতগুলি গাছ কেটে ফেলা হলে তা পরিবেশের পক্ষে ক্ষতিকারক হবে।

আদালত আরও কী জানিয়েছে?

হাইকোর্টের পক্ষ থেকে বলা হয়, যদি এভাবেই ম্যানগ্রোভ ধ্বংস চলতে থাকে আগামী দিনে হয়তো এমন দিন আসতে পারে যখন মুম্বাইবাসীদের সব সময় অক্সিজেন সিলিন্ডার সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে হবে এবং প্রতি তিন ঘণ্টা অন্তর অক্সিজেন নিতে হবে। ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণের ওপর জোর দিয়ে বিচারপতিরা একে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য বলে বর্ণনা করেছেন।

আগামী ২০ জুলাই এই মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য হয়েছে। আদালতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কোনও দূরবর্তী এলাকায় নয়, ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের পাশেই কোনও অঞ্চলে এই বনায়ন করতে হবে এবং বিদ্যুতায়নের কাজ শুরু করার আগেই গাছ লাগানোর কাজ শেষ করতে হবে। বৃক্ষরোপণের জন্য নির্ধারিত বনভূমির তালিকা জমা দেওয়ারও নির্দেশ দিয়েছে আদালত।

বুলেট ট্রেন প্রকল্পের বিরোধিতা না করেও আদালত জানিয়েছে, কোনও অবস্থাতেই পরিবেশ সুরক্ষার বিনিময়ে পরিকাঠামোগত উন্নয়ন হওয়া উচিত নয়। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে যে, বর্তমানে এই প্রকল্প স্থগিত রাখার কোনো প্রস্তাব নেই। তবে আদালত রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে, সোলাপুরের মতো দূরবর্তী স্থানের বদলে প্রকল্প এলাকার মধ্যেই গাছ লাগানোর জন্য কোনো উপযুক্ত বিকল্পের কথা বিবেচনা করতে হবে।

আদালত উল্লেখ করে যে, এর মাধ্যমে স্থানীয় পরিবেশের ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। শুধুমাত্র মৌখিক আশ্বাস যথেষ্ট নয়। গাছ কাটার আগেই ক্ষতিপূরণমূলক গাছ লাগানো শুরুর বিষয়টি বিবেচনা করুন। পাশাপাশি, সোলাপুরে গাছ লাগানোর মাধ্যমে কীভাবে মুম্বাই ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকার ম্যানগ্রোভ ধ্বংসের ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব, তাও ভেবে দেখা জরুরি।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি বলেন, "এই প্রকল্পের কারণে মুম্বাই ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় পরিবেশগত ক্ষতি হচ্ছে। বন দপ্তরের ওপর যে কাজের চাপ রয়েছে, তা আমরা স্বীকার করি। তবে গাছ লাগানোর জন্য উপযুক্ত জমি যে কেবল ৫০০ কিলোমিটার দূরেই পাওয়া যাচ্ছে—এই যুক্তি মেনে নেওয়া কঠিন।"

বুলেট ট্রেন প্রকল্পে এর আগে কত গাছ কাটা হয়েছে?   

যদিও বিষয়টি মোটেই এরকম নয় যে বুলেট ট্রেন প্রকল্পের জন্য এই প্রথম গাছ কাটা হচ্ছে। এর আগেও বুলেট ট্রেন প্রকল্প এবং মুম্বাই ভাদোদরা এক্সপ্রেসওয়ের জন্য পালঘর এবং থানে জুড়ে ৫০০০-এর বেশি গাছ কাটার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ভিখরোলি অঞ্চলে ১৭০০ গাছ কাটার প্রস্তাব নিয়ে গণশুনানি চলছে।

২০২২ সালে প্রকাশিত ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল, বোম্বে হাইকোর্ট ‘ন্যাশনাল হাই স্পিড রেল কর্পোরেশন’-কে মুম্বাই-আহমেদাবাদ বুলেট ট্রেন প্রকল্পের পথ তৈরির জন্য মুম্বাই, পালঘর ও থানে এলাকায় ২১,৯৯৭টি ম্যানগ্রোভ গাছ কাটার অনুমতি দিয়েছে।

পরিবেশবাদী সংগঠনের কী বক্তব্য?

গাছ কাটার প্রতিবাদ জানিয়ে একাধিক পরিবেশবাদী সংগঠন লাগাতার আন্দোলন চালাচ্ছে। এই বিষয়ে ম্যানগ্রোভ সোসাইটি অফ ইন্ডিয়ার এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে এই বুলেট ট্রেন প্রকল্পের জন্য ১১ টি ম্যানগ্রোভ প্রজাতি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, ১৭০টির বেশি পাখির প্রজাতি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং কচ্ছপ, ভোদড়, বুনো শুয়োর সহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। এছাড়াও এই উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ এক ঢাল হিসেবে কাজ করে। যা ভূমিক্ষয় রোধ, কার্বন শোষণ এবং বন্যা এবং ঝড়ের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে অঞ্চলকে রক্ষা করে।

রাজ্য সরকার আদালতে কী জানিয়েছে?

শুনানি চলাকালীন অ্যাডভোকেট জেনারেল মিলিন্ড সাঠে আদালতকে জানান, মহাট্রান্সকো প্রয়োজনীয় ক্ষতিপূরণের অর্থ জমা দিয়েছে এবং সোলাপুর জেলায় প্রায় ৬.৭ হেক্টর জমিতে ক্ষতিপূরণমূলক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা প্রস্তুত করা হয়েছে। এছাড়া, গাছ লাগানো ও সেগুলোর বেড়ে ওঠার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যের জন্য 'ম্যানগ্রোভ সেল' একটি অনলাইন পোর্টালও তৈরি করেছে।

সরকার আদালতকে জানিয়েছে, ভবিষ্যতে প্রকল্পের কাছাকাছি এলাকায় ক্ষতিপূরণমূলক বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণের প্রচেষ্টা চালানো হবে।

ছবি প্রতীকী
Ashwini Vaishnaw: একের পর এক রেল দুর্ঘটনা, কিন্তু রেলমন্ত্রীর মুখে বুলেট ট্রেন প্রকল্পের প্রশংসা!
ছবি প্রতীকী
Great Nicobar Project: গ্রেট নিকোবর প্রকল্পের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ জানালো কংগ্রেস

SUPPORT PEOPLE'S REPORTER

ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন

logo
People's Reporter
www.peoplesreporter.in