BMC: মুম্বাইয়ের মেয়র পদে সব দলের নজর কেন? শুধুই মারাঠা আত্মাভিমান? নাকি সবথেকে ধনী পুরসভার দখল?

People's Reporter: ৩০ জানুয়ারি বিজেপির মেয়র বিএমসি-র দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। তবে সূত্র অনুসারে, শিন্ডেসেনা মেয়র পদে শিবসেনা থেকে কাউকে নির্বাচিত করার চাপ বজায় রেখেছে। চেষ্টা চালাচ্ছে উদ্ধব গোষ্ঠীও।
উদ্ধব ঠাকড়ে ও দেবেন্দ্র ফড়নবিশ
উদ্ধব ঠাকড়ে ও দেবেন্দ্র ফড়নবিশফাইল ছবি সংগৃহীত
Published on

শুধুই কি মারাঠা আত্মাভিমান? নাকি ভারতের সবচেয়ে ধনী, সমৃদ্ধ পুরসভা নিজেদের দখলে রাখা? বৃহণমুম্বাই মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন-এর মেয়র পদ ঘিরে শাসক এবং বিরোধী শিবিরে যে টানাপোড়েন চলছে তার আসল কারণ কী? ঠিক কোন কারণে দীর্ঘ ২৫ বছর পর বিএমসি-তে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েও মেয়র পদ নিয়ে এখনও নিশ্চিত নয় বিজেপি? কেনই বা তড়িঘড়ি নিজের দলের নির্বাচিত কর্পোরেটরদের পাঁচতারা হোটেলে নিশ্চিদ্র নিরাপত্তার ঘেরাটোপে রেখেছেন শিবসেনা শিন্ধে গোষ্ঠীর প্রধান একনাথ শিন্ধে? মহারাষ্ট্রের রাজনৈতিক মহলে এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে এসব প্রশ্ন।

এখনও পর্যন্ত যা খবর, তাতে আগামী ৩০ জানুয়ারি বিজেপির মেয়র বিএমসি-র দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। যদিও সূত্র অনুসারে, শিন্ডে সেনা এখনও পর্যন্ত মেয়র পদে শিবসেনা থেকে কাউকে নির্বাচিত করার চাপ বজায় রেখেছে। এক্ষেত্রে শিন্ধে সেনার দাবি, প্রথম আড়াই বছর শিন্ধে গোষ্ঠীর শিবসেনা থেকে কাউকে মেয়র পদে দায়িত্ব দিতে হবে। যদিও দিল্লি থেকে বিজেপি নেতৃত্ব স্পষ্টই জানিয়ে দিয়েছে, শিবসেনার কোনও চাপের কাছে নতি স্বীকার করা হবেনা এবং মেয়র হবেন বিজেপি থেকেই।

দীর্ঘ সময় পর অনুষ্ঠিত হওয়া বিএমসি নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হয়েছে বিজেপি। যদিও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও বিএমসি-র ক্ষমতা যে বিজেপিই পাবে তা এখনও নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। যদিও অঙ্কের হিসেবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে বিজেপি তথা এনডিএ শিবির তথা মহাযুতির।

বিএমসি-র ২২৭ আসনের মধ্যে এবার বিজেপি পেয়েছে ৮৯ আসন, একনাথ শিন্ধের শিবসেনা পেয়েছে ২৯ আসন। অর্থাৎ মহাযুতির অংশ হলেও অজিত পাওয়ারের এনসিপি-র ৩ আসন বাদ দিয়েই সংখ্যাগরিষ্ঠতার চেয়ে ৪ আসন বেশি, অর্থাৎ ১১৮ আসন আছে মহাযুতি শিবিরের।

এর বিপরীতে বিরোধী মহা বিকাশ আঘাদি (যদিও বিএমসি নির্বাচনে মহা বিকাশ আঘাদি জোট বেঁধে লড়াই করেনি)-র উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনা শিবির, রাজ ঠাকরের মহারাষ্ট্র নবনির্মাণ সেনা, এনসিপি শারদ পাওয়ারের প্রাপ্ত আসন যথাক্রমে ৬৫, ৬ এবং ১। যা যোগ করলে দাঁড়ায় ৭২। অর্থাৎ অনেকটাই পেছনে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতার ধারেকাছে নেই। কিন্তু এরপরেও উদ্ধব সেনার মুখপাত্র সঞ্জয় রাউথ দাবি করেছেন সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে তাঁরা মাত্র ৬ আসন দূরে আছেন।

সঞ্জয় রাউথের এই ধরণের দাবির ভিত্তি কী স্পষ্ট নয়। তবে বহু জোড়াতালি একটা মোটামুটি অঙ্ক দাঁড় করানো যেতে পারে। যা হতে পারে কংগ্রেসের ২৪, মিম-এর ৮ এবং সমাজবাদী পার্টির ২ আসন এর সঙ্গে যুক্ত করা। যা করা হলে বিরোধী জোটের মোট আসন দাঁড়াবে ১০৬।

মহারাষ্ট্রের রাজনৈতিক মহলের এক অংশ মনে করছে এক্ষেত্রে অজিত পাওয়ারের শিবসেনাও বিরোধী শিবিরে নাম লেখাতে পারে। যাদের আসন সংখ্যা ৩। সেক্ষেত্রে বিরোধী জোটের আসন দাঁড়াবে ১০৯। যদিও এনসিপি-র বিরোধী জোটে যোগ দেবার সম্ভাবনা খুবই কম। তার দুটি কারণ আছে। প্রথমত অজিত পাওয়ারের উপমুখ্যমন্ত্রীত্ব এবং দ্বিতীয়ত তাঁর বিরুদ্ধে থাকা বহু কোটি টাকার মামলা। যা আপাতত জোট ধর্ম মেনে চাপা দেওয়া আছে। কিন্তু সমস্যায় পড়লে সেই তাস যে এনডিএ বের করবে না তা নিশ্চিত করে বলা যায়না।

তবুও এখনও পর্যন্ত কোনও পক্ষই যে হাল ছাড়েনি তা স্পষ্ট ১৬ জানুয়ারি ফল প্রকাশের পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক কার্যকলাপে। প্রথমত একনাথ শিন্ধে গোষ্ঠীর কর্পোরেটরদের নামী দামী হোটেলে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া। এক্ষেত্রে তাঁর গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অকারণ বিষয়টি নিয়ে জলঘোলা হচ্ছে। কর্পোরেটর একাগ্রতা বাড়ানোর জন্য তাদের বিশ্রামে রাখা হয়েছে। যদিও রাজনৈতিক মহলের দাবি, এক্ষেত্রে সিঁদুরে মেঘ দেখছেন একনাথ শিন্ধে। তিনি যেভাবে ২০২২-এ দলের বিধায়কদের নিয়ে মুম্বাই ছেড়ে গা ঢাকা দিয়ে উদ্ধব ঠাকরের মহা বিকাশ আঘাদির সরকারের পতন ঘটিয়েছিলেন এবার তিনি নিজের কর্পোরেটরদের নিয়ে সেই ভয়ই পাচ্ছেন। তাই দল ভাঙা আটকাতে আগেভাগেই কর্পোরেটরদের সরিয়ে নিয়েছেন।

দ্বিতীয়ত, যেহেতু বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি তাই বিএমসি-র ক্ষমতা দখল করতে একনাথ শিন্ধের সহযোগিতা ছাড়া বিজেপির সামনে অন্য কোনও পথ খোলা নেই। কারণ সেই সংখ্যা। এছাড়াও একনাথ শিন্ধের ওপর যথেষ্ট চাপ আছে শিবসেনা থেকেই মেয়র করার। এই বিশেষ পরিস্থিতিতে একনাথ শিন্ধে বিজেপির সঙ্গে যথেষ্ট দর কষাকষি করার সুযোগ পাবেন এবং তাঁর সামনেই কিং মেকার হবার সবথেকে বড়ো সুযোগ। মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচনের পর অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাঁকে যেভাবে মুখ্যমন্ত্রী পদ ছাড়তে বাধ্য করেছে বিজেপি এবং উপ মুখ্যমন্ত্রীর পদেই তুষ্ট থাকতে হয়েছে এবার সেই ঘটনার মধুর প্রতিশোধ তিনি নিতেই পারেন।

তৃতীয়ত, একনাথ শিন্ধের বিরুদ্ধে শিবসেনা ভাঙার অভিযোগ আছে। দলের নাম এবং প্রতীক এখন তাঁরই দখলে। বহু বালাসাহেব অনুগামীই এখনও পর্যন্ত এই এক কারণে ঘোরতর শিন্ধে বিরোধী। একনাথ শিন্ধে যতই নিজেকে বালাসাহেবের প্রকৃত উত্তরাধিকারী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করুন না কেন, তাদের কাছে শিন্ধের থেকে অনেক কাছের উদ্ধব ঠাকরে, এমনকি রাজ ঠাকরেও। এক্ষেত্রে শিবসেনা শিন্ধে গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে কেউ মুম্বাইয়ের মেয়র হলে তাতে লাভবান হবে একনাথ শিন্ধে গোষ্ঠী এবং নিজেদের বালাসাহেবের প্রকৃত উত্তরাধিকারী হিসেবে তুলে ধরতে পারবে।

এবারে আসা যাক উদ্ধব ঠাকরের শিবসেনা গোষ্ঠীর কথায়। ২০২২-এর আগে পর্যন্ত শিবসেনা এক থাকলেও বর্তমানে তা ভেঙে দু’টুকরো। শিবসেনা দু’টুকরো না হলে আদৌ বিজেপি ৮৯ আসনে জয়লাভ করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হত কিনা সন্দেহ আছে। কারণ বালাসাহেব ঠাকরের মৃত্যুর পরেও শিবসেনা মুম্বাইতে তাদের সাম্রাজ্য ধরে রেখেছে। শিবসেনা দলের মূল রাজনৈতিক শক্তি প্রধানত মুম্বাই কেন্দ্রিক। তাই মুম্বাইয়ের মেয়র পদ হাতছাড়া হয়ে গেলে সে শক্তি অনেকটাই কমে যাবে আগামীদিনে। দেশের সবথেকে ধনী পুরসভা দখলে থাকলে দলের শক্তিও যে অটুট থাকবে সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

এই পরিস্থিতিতে উদ্ধব ঠাকরের ‘লড়াই চলবে’ মন্তব্যও খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। ভোটে হেরে গেলেও তিনি যে মুম্বাইয়ের মেয়র পদ নিয়ে এখনও আশাবাদী একথা তারই ইঙ্গিত। বিশেষ করে মুম্বাইয়ের মেয়র পদ যদি সংরক্ষিত হয়ে যায় তাহলেও এগিয়ে থাকবেন উদ্ধব ঠাকরে। কারণ ৫৩ এবং ১২১ নম্বর ওয়ার্ডে জয়ী হয়েছে শিবসেনা ইউবিটি-র এক তফশিলি জাতি এবং তফশিলি উপজাতি প্রার্থী। ২২ জানুয়ারি যদি সংরক্ষণ ঘোষিত হয় এবং লটারির মাধ্যমে মেয়র নির্বাচনের সম্ভাবনা দেখা দেয় সেক্ষেত্রে এই পরিস্থিতিতেও এগিয়ে থাকবেন উদ্ধব ঠাকরে।

উদ্ধব ঠাকড়ে ও দেবেন্দ্র ফড়নবিশ
BMC: মুম্বাইয়ের পরবর্তী মেয়র নিয়ে শিন্ধের নয়া দাবি! উদ্ধব অথবা বিজেপি - কার ভয়ে হোটেলে কর্পোরেটররা?
উদ্ধব ঠাকড়ে ও দেবেন্দ্র ফড়নবিশ
BMC Polls: বিএমসি ঘিরে নাটক! কোন আশঙ্কায় দলের জয়ী কর্পোরেটরদের হোটেলে সরাচ্ছেন একনাথ শিন্ধে?

SUPPORT PEOPLE'S REPORTER

ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন

Related Stories

No stories found.
logo
People's Reporter
www.peoplesreporter.in