

ঘরে বাইরে প্রবল চাপের মুখে পড়ে নালসার ইউনিভার্সিটি সংক্রান্ত নির্দেশিকা বাতিল করলো বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া। সম্প্রতি বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান তথা বিজেপির রাজ্যসভা সাংসদ মনন কুমার মিশ্র জানিয়েছিলেন ২০২৬ সালে নালসার ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক হওয়া কোনও স্নাতককে দেশের কোথাও আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে দেওয়া হবেনা। ১৩ আগস্ট দীর্ঘ ৬ পাতার এক চিঠিতে তিনি বার কাউন্সিলের পক্ষে এই নির্দেশিকা জারি করেছিলেন। যা নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্কের পর পিছু হটলো বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া।
নালসার ইউনিভার্সিটিতে কী ঘটেছিল?
গত সপ্তাহেই নালসার ইউনিভার্সিটি অফ ল-র কিছু ছাত্র ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তকে তাদের সমাবর্তনে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণের বিরোধিতা করে। দিল্লীর যন্তর মন্তরে ছাত্র আন্দোলন প্রসঙ্গে প্রধান বিচারপতির সাম্প্রতিক মন্তব্যই তাঁদের ক্ষোভের কারণ বলে জানা গেছে।
কী নির্দেশ দিয়েছিলেন বিজেপি সাংসদ ও বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মনন কুমার মিশ্র?
গতকালের লেখা চিঠিতে বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান মনন কুমার মিশ্র সব রাজ্যের বার কাউন্সিলকে নির্দেশ দেন নালসার ইউনিভার্সিটি অফ ল, হায়দারাবাদ থেকে ২০২৬ সালে স্নাতক হওয়া কোনও ছাত্রকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা যাবে না।
এই ঘটনার পর বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান মনন কুমার মিশ্র ওই নির্দেশিকা জারি করেন। পাশাপাশি তিনি নালসার ইউনিভার্সিটির উপাচার্যকে নির্দেশ দেন কোন কোন ছাত্র এই বিরোধিতা করেছে, ছাত্রদের সংগঠিত করেছে, সংবাদমাধ্যমে যোগাযোগ করেছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচার চালিয়েছে তাঁদের চিহ্নিত করে তাঁদের নাম জানানোর। এর পাশাপাশি তিনি জানতে চান বিক্ষোভকারী ছাত্ররা কোনও সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত কিনা বা এই বিক্ষোভের পেছনে বহিরাগত কেউ আছে কিনা তাও জানাতে হবে।
চিঠিতে মনন কুমার মিশ্র লেখেন, কিছু নির্ভরযোগ্য সূত্র অনুযায়ী, কিছু শিক্ষকের মধ্যে দলাদলি ও নোংরা রাজনীতির কারণে তাঁরা ছাত্রছাত্রীদের বিভ্রান্ত, উস্কানি দেওয়া এবং বিপথে চালিত করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। যা খুবই গুরুতর বিষয়। শিক্ষকরা শিক্ষাদানে মনোনিবেশ না করে ক্যাম্পাসে নোংরা রাজনীতি করছেন। আইন শিক্ষার নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া এমন একটি গুরুতর পরিস্থিতিতে নীরব দর্শক হয়ে থাকতে পারেনা।
বিজেপি সাংসদ মনন কুমার মিশ্রের চিঠির পর কী প্রতিক্রিয়া হয়?
যদিও মনন কুমার মিশ্রের এই নির্দেশের পরেই আইনজীবীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অনেকেই তাঁর এই নির্দেশের সরাসরি বিরোধিতা করেন। এর পরেই নিজেদের নির্দেশ থেকে সরতে বাধ্য হয় বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া। পরবর্তী বিবৃতিতে বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া জানায়, নালসার ইউনিভার্সিটির সমস্ত ছাত্র তাঁদের ইচ্ছামত রাজ্য বার কাউন্সিলে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে পারবে। ওই বিবৃতিতে আরও বলা হয়, কাউন্সিল চেয়ারম্যান কর্তৃক জারি করা চিঠি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা এবং পর্যালোচনা হয়েছে। আলোচনার পর সদস্যরা সর্বসম্মতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে ২০২৬-এ উত্তীর্ণ নালসার ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই নির্দোষ এবং তাঁরা এই ধরণের অসম্মানজনক পদক্ষেপে অংশ নিতে আগ্রহী ছিলেন না।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বিসিআই (BCI) আরেকটি চিঠি পাঠায়, যার বিষয়বস্তু ছিল: “হায়দ্রাবাদের নালসার (NALSAR) ইউনিভার্সিটি অফ ল-এর বিষয়ে ১৩.০৮.২০২৬ তারিখের BCI:D:5449/2026 নং চিঠিতে উল্লিখিত নির্দেশাবলি—যার মধ্যে তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান এবং ২০২৬ সালে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের তালিকাভুক্তি অন্তর্ভুক্ত—সেগুলোর পুনর্বিবেচনা ও সংশোধন।”
বার কাউন্সিলের নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে কী জানিয়েছিল ককরোচ জনতা পার্টি?
বার কাউন্সিলের গতকালের নিষেধাজ্ঞার নির্দেশিকার পরেই এই বিষয়ে মুখ খোলেন সিজেপি মুখপাত্র সৌরভ দাস। নিজের এক্স হ্যান্ডেলে (পূর্বতন ট্যুইটার) এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তকে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করায় নালসার (NALSAR)-এর ২০২৬ সালে উত্তীর্ণ হতে যাওয়া শিক্ষার্থীদের আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া স্থগিত করার যে সিদ্ধান্ত বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া নিয়েছে, তা অত্যন্ত অসামঞ্জস্যপূর্ণ, গভীর উদ্বেগের বিষয় এবং আপাতদৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়।” “একটি আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণের বিষয়ে ভিন্নমত প্রকাশের জন্য শিক্ষার্থীদের সমষ্টিগতভাবে শাস্তি দেওয়া যায় না। 'ককরোচ জনতা পার্টি' (Cockroach Janta Party) এই আদেশের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “চেয়ারম্যান মনন কুমার মিশ্র যদি অবিলম্বে এই আদেশ প্রত্যাহার না করেন, তবে দেশের সমস্ত আইনের শিক্ষার্থী, আইনজীবী, প্রবীণ আইনজীবী এবং শুভবুদ্ধিসম্পন্ন তরুণ 'ককরোচ'রা বার কাউন্সিলের কার্যালয় ও মিশ্রের সরকারি বাসভবনের সামনে এবং নিজ নিজ রাজ্যে প্রতিবাদে শামিল হবে। @MishraManan01-কে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।”
বার কাউন্সিলের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানান সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকেও। নিজের এক্স হ্যান্ডেলে তিনি বার কাউন্সিলের নিষেধাজ্ঞা পোষ্ট করে লেখেন, “যদি সব ‘আইনি ককরোচ’ (legal cockroaches) একত্রিত হয়, তবে কী হবে?”
মনন কুমার মিশ্র কে?
মনন কুমার মিশ্র একজন প্রবীণ আইনজীবী এবং বিজেপির মনোনয়নে বিহার থেকে নির্বাচিত রাজ্যসভার সাংসদ এবং দেশের শীর্ষ আইনি নিয়ন্ত্রক সংস্থা 'বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া' (BCI)-র চেয়ারম্যান। ২০২৪ সালে বিজেপি তাঁকে বিহার থেকে রাজ্যসভার জন্য মনোনীত করে এবং তিনি সেখানে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। এর আগে ২০১০ সালে তিনি কংগ্রেসের হয়ে বিহার বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।
তিনি বিহারের গোপালগঞ্জ জেলার বাসিন্দা মিশ্র ছাপরার রাজেন্দ্র কলেজ থেকে বিএসসি (অনার্স) সম্পন্ন করেন এবং এরপর পাটনা ল কলেজ থেকে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন।
গোপালগঞ্জ সিভিল কোর্টে আইন পেশা শুরুর পর ১৯৮২ সালে পাটনা হাইকোর্টে প্র্যাকটিস শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি সুপ্রিম কোর্টের একজন প্রবীণ আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মিশ্র বেশ কয়েক বছর ধরে বিসিআই (BCI)-এর নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং ২০২৫ সালে রেকর্ড সপ্তমবারের মতো টানা মেয়াদে এর চেয়ারম্যান হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন।
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন