আসামের পরিবেশকর্মী ও জমি রক্ষা অধিকার আন্দোলনের কর্মী প্রণব ডোলের (Pranab Doley) বিরুদ্ধে জাতীয় নিরাপত্তা আইন (NSA) প্রয়োগের ঘটনায় আসাম সরকারের কড়া সমালোচনা করলো কংগ্রেস (Congress)। আসাম কংগ্রেসের অভিযোগ, ভিন্নমত দমন করতে হিমন্ত বিশ্ব শর্মার নেতৃত্বাধীন আসামের বিজেপি সরকার বিশেষ এই আইনকে ‘অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার’ করেছে। সম্প্রতি কাজিরাঙ্গার কাছে প্রস্তাবিত এক পাঁচ তারা হোটেলের বিরোধিতা করে আন্দোলনে সামিল হয়েছিলেন পরিবেশকর্মী প্রণব। সেই মামলায় জেলা আদালত থেকে মুক্তির পরেই তাঁকে ফের এনএসএ-তে আটক করা হয়েছে।
প্রণব ডোলের গ্রেপ্তারি প্রসঙ্গে কংগ্রেস
কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এই ঘটনাকে আইনের ‘নির্লজ্জ অপব্যবহার’ এবং রাষ্ট্রের ‘ক্ষমতার অপব্যবহার’ বলে দাবি করা হয়েছে। একথা জানিয়েছেন কংগ্রেসের যোগাযোগ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ। নিজের এক্স হ্যান্ডেলে) পূর্বতন ট্যুইটার তিনি এই অভিযোগ করেছেন।
জয়রাম রমেশের অভিযোগ, এনএসএ-তে আটক করার নির্দেশটি অনুমাননির্ভর এবং অস্পষ্ট অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে দেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে ডোলের ‘সন্দেহজনক উৎস থেকে সন্দেহজনক বৈদেশিক লেনদেনে’ জড়িত থাকার অভিযোগ করা হয়েছে। যে ঘটনাকে রমেশ, বর্তমান সরকারের চিরাচরিত নাটক বলে অভিহিত করেছেন।
নিজের এক্স হ্যান্ডেল বার্তায় রমেশ লিখেছেন, "ডোলের বিরুদ্ধে এনএসএ (NSA)-এর প্রয়োগ হলো ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হিসেবে বিশেষ সব আইনকে বিজেপির সরকারগুলোর কাজে লাগানোর ক্রমবর্ধমান প্রবণতারই একটি অংশ। উত্তরপ্রদেশেও একই ধরনের ঘটনা দেখা গেছে; সেখানে নয়ডায় শ্রম-শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদরত শ্রমিক অধিকার কর্মীদের বিরুদ্ধে এনএসএ প্রয়োগ করা হয়েছিল।"
কাজিরাঙ্গায় কী ঘটেছিল?
গত জুন মাসে আসামের কাজিরাঙ্গা জাতীয় উদ্যানের কাছে এক প্রস্তাবিত পাঁচ তারা হোটেল তৈরির প্রতিবাদে বিক্ষোভ দেখান স্থানীয় অধিবাসীরা। গ্রামবাসীদের এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন প্রণব ডোলে। এরপরেই ডোলে সহ একাধিক আন্দোলনকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে রাস্তা অবরোধ এবং অস্ত্র নিয়ে হামলার অভিযোগ করা হয়েছিল। ১৩ জুলাই প্রণব ডোলে গুয়াহাটি থেকে গ্রেপ্তার হওয়ার পর ২৯ জুলাই তিনি জামিন পান। এরপর তাঁকে ফের ৩০ জুলাই গ্রেপ্তার করা হয়। বর্তমানে তাঁকে গোলাঘাট জেলা কারাগারে আটক রাখা হয়েছে।
কাজিরাঙ্গার পাঁচ তারা হোটেল প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী কী জানিয়েছেন?
কাজিরাঙ্গার গ্রামবাসীদের প্রতিবাদ প্রসঙ্গে গত ১৫ জুলাই আসাম বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেন, “কাজিরাঙ্গায় একটি পাঁচতারা রিসোর্ট/হোটেল হতে চলেছে। মানুষের ভালোলাগা উচিত, পয়সা দিয়ে পর্যটকরা আসবে। টাকাটা পাবে কারা? হাতির মাহুত, জিপ সাফারি, দোকানদার, সাধারণ মানুষ...”। তিনি আরও বলেন, “জিম করবেট পার্কের ভেতরেও একটি পাঁচতারা হোটেল বানানো হয়েছে, টাটা গুজরাটের জঙ্গলের ভেতরেও বানিয়েছে, কেনিয়ার জঙ্গলের ভেতরেও বিমানবন্দরও বানানো হয়েছে।” “আমি হতবাক, জনগণেরই বামপন্থীদের কাছে অনুরোধ করা উচিত ছিল। সরকারের তাদের গ্রেপ্তার করার পরিবর্তে, বামপন্থীদেরই এখানে একটি পাঁচতারা হোটেল তৈরির উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল।”
প্রসঙ্গত, এর আগে এই প্রকল্পের সমর্থনে খোলাখুলি বক্তব্য রেখেছেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। যদিও ২০২২ সাল থেকেই ওই অঞ্চলের গ্রামবাসীরা এই প্রকল্পের বিরোধিতা করছেন। এই প্রকল্পের জন্য তাঁদের কাছ থেকে জোর করে জমি অধিগ্রহণের অভিযোগ তুলে গুয়াহাটি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন গ্রামবাসীরা। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই আন্দোলনে প্রথম থেকেই যুক্ত প্রণব ডোলে।
কাজিরাঙ্গার প্রস্তাবিত হোটেলের মৌ এবং জমি হস্তান্তর
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আসাম সরকারের অধীনস্থ সংস্থা আসাম ট্যুরিজম ডেভলপমেন্ট কর্পোরেশন (ATDC) সরাফ গ্রুপের সঙ্গে কাজিরাঙ্গার এই পাঁচতারা হোটেল নিয়ে এক মৌ (Memorandum of Understanding - MoU) স্বাক্ষর করে। ভারতে আন্তর্জাতিক হায়াত গ্রুপের লাইসেন্স নিয়ে এই সংস্থা ব্যবসা পরিচালনা করে। মৌ চুক্তিতে কাজিরাঙ্গার প্রস্তাবিত ওই হোটেলের জন্য ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। ইতিমধ্যেই এই প্রকল্পের জন্য এটিডিসি-র পক্ষ থেকে সরাফ গ্রুপের কাছে ৩০ বিঘা জমি হস্তান্তর করা হয়েছে।
জমির অধিকার রক্ষার আন্দোলন
এই প্রকল্প তৈরি হলে স্থানীয় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং ওই অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে অভিযোগ তুলে আন্দোলনে নামে কাজিরাঙ্গা ভূমি ও মানবাধিকার সুরক্ষা কমিটি (জিকেএলএইচআরপিসি)। যে সংগঠনের আহ্বায়ক প্রণব ডোলে। তিনি ওই অঞ্চলের ১০০ গ্রামবাসীকে নিয়ে লাগাতার এই প্রকল্পের বিরোধিতা শুরু করেন। গ্রামবাসীদের অভিযোগ, এই হোটেলের জন্য যে জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে তা তাঁদের কাছ থেকে জোর করে নেওয়া হয়েছে।
পরিবেশ কর্মীদের জামিন এবং ফের গ্রেপ্তারি
গত ২৯ জুলাই গোলাঘাট সেশনস কোর্ট প্রণব ডোলে সহ চার জমির অধিকার রক্ষা আন্দোলনকারীকে জামিন দেয়। এরপরেই ৩০ জুলাই এনএসএ-র ধারা ৩(২) অনুসারে ডোলেকে আটক করা হয়। যে ধারা কেন্দ্রীয় সরকার বা যেকোনো রাজ্য সরকারকে রাজ্যের নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারী কার্যকলাপ প্রতিরোধ করতে বা রাজ্যে অত্যাবশ্যকীয় সামাজিক সরবরাহ ও পরিষেবা বজায় রাখার জন্য কোনো ব্যক্তিকে প্রতিরোধমূলকভাবে আটক রাখার ক্ষমতা দেয়।
প্রণব ডোলেকে এনএসএ-তে আটক প্রসঙ্গে কী জানিয়েছে সরকার?
এনএসএ প্রয়োগ করে ডোলেকে আটক রাখার নির্দেশে বেশ কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে গত দশকে তার বিরুদ্ধে দায়ের করা একাধিক ফৌজদারি মামলা। এই নির্দেশে আরও বলা হয়েছে যে, ডোলে “জনশৃঙ্খলা রক্ষায় ক্ষতিকর আচরণ” করেছেন। তিনি সরকারি কর্মচারীদের ওপর হামলা , দাঙ্গা, সংগঠিত করেছেন। এছাড়াও তাঁর বিরুদ্ধে, “সন্দেহজনক উৎস থেকে সন্দেহজনক বৈদেশিক লেনদেনে” জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে।
আদালত প্রণব ডোলেকে জামিন দিতে গিয়ে কী জানিয়েছিল?
যদিও ২৯ জুলাই ডোলের জামিন মঞ্জুরের সময় আদালত জানিয়েছিল, ডোলে পরিবেশ কর্মী হিসেবে পরিচিতি এবং সেই কাজে তিনি বিভিন্ন দেশে সফর করেছেন। সেই কারণে তিনি কিছু অর্থ পেয়ে থাকতে পারেন তবে তার কোনোটাই তিনি গোপন করেননি। তাই এটা কোনও উদ্বেগের বিষয় নয়। এছাড়াও পুলিশের পক্ষ থেকে ২৮ জুন বিক্ষোভের দিন হামলার অভিযোগ এনে পুলিশ ভিডিও সহ যে প্রমাণ জমা দিয়েছিল তাতে এই ধরণের অভিযোগের সমর্থনে কিছু পাওয়া যায়নি।
গত ২৯ জুলাই প্রণব ডোলে সহ চারজন পরিবেশকর্মীর জামিনের নির্দেশ দিতে গিয়ে অ্যাডিশনাল সেশন জজ এন এম আবদুল্লাহ আহমেদ বলেন, “যেসব ক্ষেত্রে পরিবেশ সংরক্ষণ ও আদিবাসীদের অস্তিত্ব রক্ষার বিষয়টি একে অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত, সেখানে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উদ্বেগ দমনের করতে প্রচলিত ফৌজদারি আইন ব্যবহার করা যায় না। প্রকৃত জনশৃঙ্খলা বজায় থাকে ক্ষতিগ্রস্তদের কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করে নয়, বরং তাদের কথা শোনার মাধ্যমেই।”
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন