১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের সেই বিখ্যাত ছবিটা কল্পনা করুন। মেক্সিকোর আজতেকা স্টেডিয়ামে ডিয়েগো মারাদোনা দৌড়াচ্ছেন, ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা তার পেছনে ছুটছে। আজও আর্জেন্টিনাকে ভাবলে এমনই একটা মুখ ভেসে ওঠে—মারাদোনা, মেসি, দি মারিয়া। ইউরোপীয় চেহারা, ইউরোপীয় নাম।
কিন্তু একটা প্রশ্ন খুব কমই করা হয়।
আর্জেন্টিনার আদিবাসীরা কোথায়?
কলম্বিয়ায় তাদের দেখা যায়। পেরুতে দেখা যায়। বলিভিয়ায় তো দেশের রাজনীতিতেই আদিবাসী পরিচয় বড় বিষয়। অথচ দক্ষিণ আমেরিকার বিশাল এই দেশটিকে দেখলে মনে হয়, যেন সবাই হঠাৎ করেই ইউরোপ থেকে এসে নেমেছে।
আসলে গল্পটা তেমন নয়।
পাঁচশো বছর আগে পাম্পাসের তৃণভূমি আর প্যাটাগোনিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বাস করত অসংখ্য আদিবাসী জনগোষ্ঠী। মাপুচে, গুয়ারানি, দিয়াগুইতা—প্রত্যেকের নিজস্ব ভাষা ছিল, নিজস্ব সংস্কৃতি ছিল। তারপর এল স্প্যানিশরা।
প্রথম আঘাতটা বন্দুকের গুলি থেকে আসেনি। এসেছিল অদৃশ্য শত্রুর হাত ধরে। গুটি বসন্ত, হাম আর নানা ইউরোপীয় রোগে হাজার হাজার মানুষ মারা যেতে থাকে। পুরো পুরো জনপদ উধাও হয়ে যায় ইতিহাস থেকে।
এরপর আসে আরেক অধ্যায়। আফ্রিকা থেকে দাস আনা হয়। উনবিংশ শতাব্দীর শুরুর বুয়েনোস আইরেসে কালো মানুষের উপস্থিতি ছিল খুবই স্বাভাবিক দৃশ্য। কিন্তু যুদ্ধ, মহামারি আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মিশ্র বিয়ের ফলে সেই পরিচয় ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যায়।
তারপর আর্জেন্টিনা একটি সিদ্ধান্ত নেয়।
দেশটিকে ইউরোপের মতো বানাতে হবে।
সরকার ইউরোপীয় অভিবাসীদের জন্য দরজা খুলে দেয়। ইতালি আর স্পেন থেকে লাখ লাখ মানুষ এসে বসতি গড়ে। কয়েক দশকের মধ্যে শহরগুলো বদলে যায়। ভাষা বদলায়, সংস্কৃতি বদলায়, মানুষের চেহারাও বদলে যায়।
কিন্তু শুধু নতুন মানুষ এসে জায়গা নেয়নি। পুরোনো মানুষদেরও সরানো হয়েছিল।
১৮৭০-এর দশকে “কনকোয়েস্ট অব দ্য ডেজার্ট” নামে পরিচিত সামরিক অভিযানে হাজার হাজার আদিবাসী নিহত বা বাস্তুচ্যুত হয়। যে ভূমিতে তারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাস করেছিল, সেই জমিই তাদের হাতছাড়া হয়ে যায়।
তবু ইতিহাসের একটা মজার ব্যাপার আছে। মানুষকে হয়তো মানচিত্র থেকে মুছে ফেলা যায়, স্মৃতি থেকে পুরোপুরি নয়।
চে গুয়েভারা যখন লাতিন আমেরিকার নিপীড়িত মানুষের কথা বলছিলেন, মারাদোনা যখন ধনীদের বিরুদ্ধে গরিবের পক্ষে দাঁড়াচ্ছিলেন, কিংবা কার্লোস তেভেজ যখন বস্তির সন্তান পরিচয় লুকানোর বদলে গর্বের সঙ্গে বহন করছিলেন—তখন হয়তো সেই পুরোনো আর্জেন্টিনারই কিছু প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছিল।
আজকের আর্জেন্টিনা তাই শুধু ইউরোপীয় অভিবাসীদের দেশ নয়। এটি হারিয়ে যাওয়া আদিবাসীদের, মিশে যাওয়া আফ্রিকানদের এবং নতুন পরিচয় গড়ে তোলা একটি জাতির গল্প। বুয়েনোস আইরেসের চকচকে রাস্তার নিচে এখনও লুকিয়ে আছে আরেকটি আর্জেন্টিনা—যার ইতিহাস অনেক বেশি জটিল, অনেক বেশি রঙিন, আর অনেক বেশি মানবিক।
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন