Bolivia: রাষ্ট্রপতির ইস্তফার দাবিতে বিক্ষোভে অচলাবস্থা বলিভিয়ায়, ফের আলোচনার কেন্দ্রে ইভো মোরালেস

People's Reporter: ৫০ দিন ধরে অবরোধ বলিভিয়ায়। চাপার অঞ্চলের জঙ্গল থেকে পুরো পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন মোরালেস। তিনি জানিয়েছেন, আন্দোলনরত শ্রমিক ইউনিয়ন ও আদিবাসী সংগঠনগুলোর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ রয়েছে।
বলিভিয়ার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস
বলিভিয়ার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস ফাইল ছবি, ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত
Published on

বলিভিয়ার রাজনৈতিক পরিস্থিতির দ্রুত বদল হচ্ছে। বর্তমানে চরম রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সংকটে লাতিন আমেরিকার এই দেশ। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গত ৫০ দিনে চলছে একটানা পথ অবরোধ। জ্বালানি সংকট এবং দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে সামিল হচ্ছেন হাজারে হাজারে মানুষ। এই পরিস্থিতির মধ্যেই বলিভিয়ার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট এবং বাম নেতা ইভো মোরালেস আবারও জাতীয় রাজনীতির আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন।

বলিভিয়ার চাপার অঞ্চলের জঙ্গলে নিজের শক্ত ঘাঁটি থেকে পুরো পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন মোরালেস। সম্প্রতি গোপন ডেরা থেকে রয়টার্স-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, আন্দোলনরত শ্রমিক ইউনিয়ন ও আদিবাসী সংগঠনগুলোর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ রয়েছে। যদিও তাঁর দাবি, বর্তমান এই বিক্ষোভে তাঁর কোনো প্রত্যক্ষ ভূমিকা নেই।

গত প্রায় দু'মাস ধরে চলা একটানা অবরোধের কারণে দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কগুলো সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। ব্যাহত হচ্ছে খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধ পরিবহন। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সরকার বিরোধী এই আন্দোলনে এখনও পর্যন্ত প্রায় ১৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন।

বলিভিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো পাজ সরকারের একাধিক অর্থনৈতিক পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে সংকটের সূচনা। কিছুদিন আগেই পাজ সরকার বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি এবং বাজেট সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘদিনের জ্বালানি ভর্তুকি কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়। সরকারের যে সিদ্ধান্ত ঘিরে শুরু হয় তুমুল জনরোষ। পরে প্রতিরোধের মুখে কিছু সিদ্ধান্ত সংশোধন এবং ভূমি সংস্কারসংক্রান্ত বিতর্কিত উদ্যোগ প্রত্যাহার করে নেওয়া হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

বলিভিয়ায় গত ৫০ দিন ধরে চলছে সরকার বিরোধী বিক্ষোভ
বলিভিয়ায় গত ৫০ দিন ধরে চলছে সরকার বিরোধী বিক্ষোভ ছবি পিপলস ডিসপ্যাচ থেকে সংগৃহীত

বর্তমানে আন্দোলনকারীরা মজুরি বৃদ্ধি, জ্বালানি ও ডলারের সংকট নিরসন এবং প্রেসিডেন্টের পদত্যাগ দাবি করছে। সরকারের পক্ষ থেকে পাল্টা অভিযোগ, মূলত মোরালেসের অনুগামীরাই আড়াল থেকে এই আন্দোলনকে রাজনৈতিকভাবে মদত দিচ্ছে। যদিও মোরালেস এ অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছেন, দেশের অর্থনৈতিক দুরবস্থাই মানুষের ক্ষোভের মূল কারণ।

তিনি বলেন, সামাজিক দাবিকে কেন্দ্র করে যদি কোনো সংঘাত তৈরি হয়, তাহলে তার দায় সরকারের ওপরই বর্তায়। তাঁর কথায়, জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় বর্তমান প্রশাসন সংকটকে আরও গভীর করেছে।

বলিভিয়ার রাজধানী লা পাজে সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। একদিকে রেস্তোরাঁগুলোতে ক্রেতা নেই, বিভিন্ন সুপার মার্কেটে নিত্যপণ্যের সরবরাহ কমে গেছে, হাসপাতালগুলো ওষুধ সংকটে চলছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, সরবরাহ ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়ায় বহু প্রতিষ্ঠান কাজকর্ম বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে।

অবরোধের কারণে চিকিৎসা পরিষেবাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দূরবর্তী অঞ্চল থেকে রোগীদের রাজধানীতে আনা যাচ্ছে না। বিশেষ করে ক্যানসার রোগীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় ওষুধের ঘাটতি দেখা দেওয়ায়, বহু রোগীর চিকিৎসা অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

গণবিক্ষোভ সামাল দিতে সরকার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনা চাইছে। প্রেসিডেন্ট পাজ জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে মতপার্থক্য দূরে রেখে সমাধানের পথ খুঁজতে সব পক্ষকে এগিয়ে আসার অনুরোধ জানিয়েছেন। যদিও দুই পক্ষের গভীর অবিশ্বাসের কারণে এখনও পর্যন্ত আলোচনার কোনও পথ খোলেনি।

মোরালেস মনে করেন, বর্তমান সংকটের একমাত্র সমাধান হতে পারে নতুন করে নির্বাচন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ভবিষ্যতের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে তাঁর রাজনৈতিক শক্তিকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হলে দেশ আরও বড় অস্থিরতার দিকে যেতে পারে।

উল্লেখ্য, ২০১৯-এর ১১ নভেম্বর সেনা অভ্যুত্থান হয় বলিভিয়ায়। এর পরেই ক্ষমতা হারিয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন রাষ্ট্রপতি ইভো মোরালেস। এর ঠিক একবছর পর ৯ নভেম্বর বলিভিয়ায় ফেরেন মোরালেস। বলিভিয়ার বামপন্থী দল ‘মুভমেন্ট ফর সোশ্যালিজম’-র নেতা লুইস আর্সে সে দেশের প্রেসিডেন্ট পদে বসেন ২০২০ সালে। তাঁর আগে বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট ছিলেন বামপন্থী নেতা ইভো মোরালেস। ২০০৫ সালে ইভো মোরালেস ক্ষমতায় আসার আগে বলিভিয়া ছিল লাতিন আমেরিকায় রাজনৈতিকভাবে সবচেয়ে অস্থির একটি দেশ।

২০২০ সালে দেশের বাইরে থাকার কারণে তাঁর পরিবর্তে রাষ্ট্রপতি হন লুইস। ২০২৪-এ ফের বলিভিয়ায় সেনা অভ্যুত্থানের চেষ্টা হয়। যদিও সেই চেষ্টা ব্যর্থ করে দেয় বলিভিয়ার বামপন্থী সরকার। এরপর ২০২৫-এর অক্টোবরে ভোটে পরাজয় হন দীর্ঘ দু'দশক ধরে ক্ষমতাসীন বামপন্থী জোটের। ক্ষমতায় বসেন বর্তমান প্রেসিডেন্ট রড্রিগো পাজ। যদিও দক্ষিণপন্থী এই সরকারের শুরু থেকেই দেশে অর্থনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়। রাষ্ট্রপতি পাজের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ, তিনি দেশের জ্বালানী সংকট, মুদ্রাস্ফীতি, ডলারের অভাব নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছেন।

অর্থনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক বিভাজন এবং সামাজিক অসন্তোষের এই ত্রিমুখী সংকটে বলিভিয়া এখন এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে, তা নির্ভর করছে সরকার, আন্দোলনকারী গোষ্ঠী এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর।

বলিভিয়ার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস
Bolivia: সেনা অভ্যুত্থান আটকাতে রাস্তায় জনগণ – নির্বাচিত বামপন্থী সরকারকে উৎখাত করার চেষ্টা ব্যর্থ
বলিভিয়ার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস
ইভো মোরালেস - এভাবেও ফিরে আসা যায়

SUPPORT PEOPLE'S REPORTER

ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন

logo
People's Reporter
www.peoplesreporter.in