Data Centre: বিশাখাপত্তনমে গুগলের প্রস্তাবিত ডেটা সেন্টার ঘিরে পরিবেশগত বিতর্ক; প্রতিবাদে স্থানীয়রা

People's Reporter: বিশাখাপত্তনমে গুগল ডেটা সেন্টার প্রকল্পে জল সংকট, বনাঞ্চল ও বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ঘিরে তীব্র পরিবেশগত উদ্বেগ।
ভাইজাগে প্রস্তাবিত ডেটা সেন্টারের প্রতিবাদে স্থানীয় মানুষের বিক্ষোভ
ভাইজাগে প্রস্তাবিত ডেটা সেন্টারের প্রতিবাদে স্থানীয় মানুষের বিক্ষোভছবি দ্য গ্রাউন্ড জিরো থেকে সংগৃহীত
Published on

অন্ধ্রপ্রদেশ গুগল-আদানি প্রকল্পের মাধ্যমে ডেটা সেন্টারে বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য জোরদার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে এবং বিশাখাপত্তনমের কাছে ভারতের বৃহত্তম এআই (AI) পরিকাঠামো কেন্দ্র গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির দাবি সত্ত্বেও, স্বচ্ছতার অভাব, তড়িঘড়ি করে পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়া এবং বিপুল আর্থিক প্রণোদনা প্রদানের কারণে এই প্রকল্পটি সমালোচনার মুখে পড়েছে।

ভারতে দ্রুত সম্প্রসারিত হওয়া ডেটা সেন্টার শিল্পকে ঘিরে নতুন করে পরিবেশগত বিতর্ক শুরু হয়েছে। মহারাষ্ট্রের থানে জেলায় অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেস (AWS)-এর প্রস্তাবিত ডেটা সেন্টারের বিরুদ্ধে স্থানীয় বাসিন্দাদের আন্দোলনের পর এবার অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তনমে গুগলের এক বিশাল ডেটা সেন্টার প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন পরিবেশবিদ ও সমাজকর্মীরা।

অন্ধ্রপ্রদেশ সরকার ২০২৫ সালের অক্টোবরে এই প্রকল্পে অনুমোদন দেয়। প্রাথমিকভাবে ১ গিগাওয়াট ক্ষমতার ডেটা সেন্টার হিসেবে পরিকল্পনা করা হলেও পরে এর ক্ষমতা বাড়িয়ে ২.৫ গিগাওয়াট করা হয়। তারলুভাদা, আদাভিভারাম-মুদাসারলোভা এবং রামবিল্লি এলাকায় ৫০০ একরেরও বেশি জমিতে প্রকল্পটি গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। বিনিয়োগের পরিমাণ ধরা হয়েছে প্রায় ১.২ লক্ষ কোটি টাকা, যা দেশের অন্যতম বৃহৎ ডেটা পরিকাঠামো হিসেবে ধরা হচ্ছে।

এই প্রকল্পকে কেন্দ্র করে সরব হয়েছেন জল বিরাদারির জাতীয় আহ্বায়ক বোলিসেট্টি সত্যনারায়ণ। তাঁর অভিযোগ, এত বড় পরিকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে পরিবেশগত মূল্যায়ন, জলসম্পদ ব্যবহারের পরিকল্পনা এবং জমি নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য জনসমক্ষে আনা হয়নি। তিনি কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব এবং অন্ধ্রপ্রদেশের উপ-মুখ্যমন্ত্রী পবন কল্যাণের কাছে চিঠি লিখে জানতে চেয়েছেন, প্রকল্পটির জন্য পূর্ণাঙ্গ পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (EIA) করা হয়েছে কি না এবং নির্মাণ শুরুর আগে প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল কি না।

সত্যনারায়ণের অন্যতম বড় উদ্বেগ প্রকল্পটিতে বিপুল পরিমাণ জল এবং বিদ্যুতের চাহিদা। তাঁর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ডেটা সেন্টার পরিচালনার জন্য সবসময় ঠান্ডা রাখবার ব্যবস্থার দরকার হয়, যা করতে প্রচুর পরিমাণে জলের প্রয়োজন হয়। বিশাখাপত্তনম ও তার আশপাশের কিছু অঞ্চল ইতোমধ্যেই চরম জল সংকটের মুখোমুখি। এমন পরিস্থিতিতে এত বড়ো ডেটা সেন্টার চালু হলে স্থানীয় জলসম্পদের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

তিনি আরও দাবি করেছেন, প্রস্তাবিত সাইটগুলোর কিছু অংশ গুরুত্বপূর্ণ জলাধারের সংলগ্ন এলাকার মধ্যে পড়ে এবং সেগুলো কাম্বালাকোন্ডা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের বিস্তৃত পরিবেশগত অঞ্চলের সঙ্গে সংযুক্ত। তাঁর আরও অভিযোগ, ডেটা সেন্টার তৈরির লক্ষ্যে প্রাথমিক নির্মাণ ও জমি প্রস্তুতির কাজের ফলে স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র ইতোমধ্যেই ক্ষতির মুখে পড়েছে।

জমি বরাদ্দ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এই সমাজকর্মী। তাঁর দাবি, প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত জমির একটি অংশ সিংহাচলম মন্দিরের মালিকানাধীন এবং আইন অনুযায়ী নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে সেই জমি বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার করা যায় না। বিষয়টি নিয়ে তিনি অন্ধ্রপ্রদেশ হাইকোর্টে আবেদন করেছেন বলেও জানিয়েছেন।

ডেটা সেন্টারের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ শুধু বিশাখাপত্তনমেই আটকে নেই। বিশ্বজুড়েই এই শিল্পের দ্রুত বিস্তারকে ঘিরে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় আকারের ডেটা সেন্টার পরিচালনার জন্য বিপুল বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয় এবং ডেটা সেন্টার ঠান্ডা রাখবার ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জলের প্রয়োজন হয়। অনেক ক্ষেত্রে এই প্রকল্পগুলো জল-সংকটপূর্ণ এলাকায় স্থাপিত হওয়ায় স্থানীয় মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।

একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গেছে মহারাষ্ট্রের থানে জেলাতেও। সেখানে ‘ওয়েক আপ থানেকার’ নামে এক নাগরিক মঞ্চ বালকুম এলাকায় AWS-এর প্রস্তাবিত ডেটা সেন্টারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে। প্রায় ৫৩ একর জমিতে ৪৭ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। আন্দোলনকারীদের আশঙ্কা, ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলে এমন পরিকাঠামো তৈরি হলে বিদ্যুৎ ও জলের উপর চাপ বাড়বে, পাশাপাশি স্থানীয় পরিবেশ ও বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার মানও প্রভাবিত হতে পারে।

অন্যদিকে, বিশাখাপত্তনমের প্রকল্পটি আকার ও বিনিয়োগের দিক থেকে থানের প্রকল্পের চেয়েও বড়ো। সরকার এটিকে ভবিষ্যতের এআই ও ক্লাউড কম্পিউটিং পরিকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরলেও পরিবেশকর্মীরা বলছেন, প্রকল্পটির সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য এখনও সাধারণ মানুষ জানে না। বিশেষ করে জলের ব্যবহার, বিদ্যুৎ সরবরাহ, পরিবেশগত অনুমোদন এবং বাস্তুতান্ত্রিক ঝুঁকি নিয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের দাবি ক্রমশ জোরালো হচ্ছে।

নির্মাণকাজ পূর্ণমাত্রায় শুরু হওয়ার আগে প্রকল্পটির পরিবেশগত মূল্যায়ন ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা জনসমক্ষে প্রকাশ করার দাবি জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের মতে, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা যেন স্থানীয় পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষতির বিনিময়ে না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।

বাসস্থান এলাকার কাছাকাছি অবস্থান এবং সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাবের কারণ দেখিয়ে তারলুভাদায় প্রস্তাবিত গুগলের এআই (AI) ডেটা সেন্টার বাতিলের দাবিতে বামপন্থী দলগুলোর ডাকে সোমবার ২৭ জুলাই, ‘চলো তারলুভাদা’ কর্মসূচি নেওয়া হয়। বাম দলগুলির ডাকা ওই বিক্ষোভ মিছিল পুলিশ আটকে দেয় এবং বেশ কয়েকজন বাম নেতাকে আটক করে এবং মিছিলকারীদের প্রকল্প এলাকায় যেতে দেওয়া হয়নি।

জানা গেছে, এই প্রকল্পের জন্য বিশাখাপত্তনম ও আনাকাপল্লি জেলার তারলুভাদা, আদিভিভারাম এবং রামবিল্লি এলাকায় ৬০০ একরেরও বেশি জায়গা প্রয়োজন। বিস্তৃত এই প্রকল্পে ৮৭,৫২০ কোটি টাকা বা ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব রয়েছে। মোট জমির মধ্যে ২০০ একর জমি ১৯৭০-এর দশকে ভূমিহীন দলিত সম্প্রদায়ের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল; এই জমি অধিগ্রহণের ফলে সামাজিকভাবে ও অর্থনৈতিকভাবে প্রান্তিক এই জনগোষ্ঠী তাদের আয়ের উৎস হারাবে।

যদিও রাজ্য সরকারের দাবি, আগামী পাঁচ বছরে এই প্রকল্পের মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) খাতে পাঁচ লক্ষ কর্মসংস্থান হবে। যদিও সরকারের এই দাবি নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। প্রকল্পটির পরিবেশগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে বৃহত্তর পরিসরে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে।

গত ১৭ জুলাই গুগল ও আদানি ডেটা সেন্টারের অনুমোদন বাতিলের দাবিতে সিপিআই (CPI) নেতৃত্ব মাথা ন্যাড়া করে এক অভিনব প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছেন। পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর গুরুতর ঝুঁকির আশঙ্কার কথা তুলে ধরে, বিশাখাপত্তনমে গুগলের প্রস্তাবিত ডেটা সেন্টারগুলোর জন্য জোট সরকারের দেওয়া অনুমোদন বাতিলের দাবিতে সিপিআই নেতারা এই বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। বক্তব্য রাখতে গিয়ে দলের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য জে ভি সত্যনারায়ণ মূর্তি অভিযোগ করেন যে, সরকার মুদাসারলোভায় ৫১২ মেগাওয়াটের একটি গুগল ডেটা সেন্টারের অনুমোদন দিয়েছে এবং আনন্দপুরম মণ্ডলের থারলুওয়াড়া ও রামবিল্লিতে আরও দুটি ১,০০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্রের জন্য অনুমতি প্রদান করেছে।

ভাইজাগে প্রস্তাবিত ডেটা সেন্টারের প্রতিবাদে স্থানীয় মানুষের বিক্ষোভ
Lay Off: চলছে ছাঁটাই - আমাজনে ১৬ হাজারের পর এবার ওরাকেল - চাকরি যেতে পারে ২০ থেকে ৩০ হাজার কর্মীর
ভাইজাগে প্রস্তাবিত ডেটা সেন্টারের প্রতিবাদে স্থানীয় মানুষের বিক্ষোভ
Oracle: ফের ছাঁটাইয়ের ভ্রূকুটি! খরচ কমাতে বড়ো সংখ্যায় কর্মী সংকোচনের ভাবনা ওরাকেলে

SUPPORT PEOPLE'S REPORTER

ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন

logo
People's Reporter
www.peoplesreporter.in