

নির্বাচনে পরাজয়ের মাত্র ২৭ দিনের মাথায় কার্যত ছিন্নভিন্ন তৃণমূল। একসময়ের দুঁদে বিরোধী নেত্রী, রাজ্যের পনেরো বছরের মুখ্যমন্ত্রীর সাধের দলের রাশ এই মুহূর্তে যে আর তাঁর হাতে নেই তা স্পষ্ট হয়ে গেছে ঘটনা পরম্পরায়। দলে যে আদৌ আর তাঁর কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই তা আরও স্পষ্ট হয়ে গেছে ৩১ মে বিধায়কদের দলীয় বৈঠক বাতিলের ঘটনায়। যেদিন ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে বিভিন্ন অজানা কারণে মাত্র এক চতুর্থাংশ হাজিরা দিয়েছিলেন কালীঘাটে। যে ঘটনায় স্পষ্ট হয়ে গেছে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে গেছে ইতিমধ্যেই।
মহারাষ্ট্রের ঘটনাটা অবশ্য আলাদা ছিল। সেখানে ১৯৬৬ সালে উদ্ধব ঠাকরের বাবা বালাসাহেব ঠাকরের তৈরি করা দল ভাঙতে বিস্তর কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল। একটা ক্ষমতাসীন সরকার ফেলে, সরকারের প্রধান দলকে দু'টুকরো করতে বেশ কিছু ঘটনা ঘটানো হয়েছিল। রাজনৈতিক মহল যাকে 'অপারেশান লোটাস' বলে অভিহিত করে থাকে। যে ঘটনার শেষ পরিণতিতে শিবসেনা নাম রক্ষা করতে আদালতের দ্বারস্থ হয়েও শেষ রক্ষা করতে পারেননি তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী উদ্ধব ঠাকরে। শিবসেনা (ইউবিটি) নাম নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। শিবসেনা নামের দখল পেয়েছেন একনাথ শিন্ধে। এ যেন সেই ঘটনারই কাছাকাছি কার্বন কপি। যদিও অতটা কাঠখড় এখানে পোড়াতে হয় নি, বা হবে না আদৌ। বরং, নির্বাচনে পরাজয়ের পর তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়েছে তৃণমূল এক মাসেরও কম সময়ে। দলের নাম কোন গোষ্ঠীর কাছে থাকবে, কোনও গোষ্ঠী আদৌ 'তৃণমূল' নামের দাবি জানাবে কিনা সে প্রশ্নের উত্তর দেবে ভবিষ্যৎ।
তৃণমূল যে ভাঙছে, ভেঙে গেছে তা বেশ বোঝা যাচ্ছিল গত ৪ঠা মে-র পর থেকেই। কিন্তু তখনও স্পষ্ট হচ্ছিল না চূড়ান্ত আঘাতটা কোন দিক থেকে আসবে! যে ছবি হয়তো অনেকটাই স্পষ্ট হয়ে গেছে ১ জুন। স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীর বয়ান, তড়িঘড়ি দুই তৃণমূল বিধায়কের বহিষ্কারের পর এটা স্পষ্ট তৃণমূল ভেঙে গেছে। এখন সবথেকে বড়ো প্রশ্ন দলের রাশ আগামী দিনে কার হাতে থাকবে? পুরো তৃণমূলটাই কি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত থেকে বেরিয়ে অন্য কারোর হাতে চলে যাবে? এক্ষেত্রে বিবেকের ভূমিকায় অভিনয় করে কে তৃণমূল দলের দখল নিতে পারে?
ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে যতই নেতা তৈরি করার চেষ্টা করা হোক না কেন, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের রাশ হাতে নিতে পারবেন না, প্রকৃত উত্তরসূরী হয়ে উঠতে পারবেন না, তা বুঝিয়ে দিয়েছে সোনারপুরের ঘটনা। এই পরিস্থিতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের হাল যে সব নেতা ধরতে পারতেন তাঁদের অধিকাংশেরই বয়স হয়ে গেছে। তাছাড়া, এবারের ভোটের ফলাফল প্রকাশের পর যেভাবে তৃণমূলের প্রায় সর্ব স্তরের নেতা কর্মী সাংসদ বিধায়করা প্রকাশ্যে হেনস্তার শিকার হচ্ছেন, বা রাস্তায় বেরোলেই 'চোর চোর' শুনতে হচ্ছে তাতে অদূর ভবিষ্যতে তাঁরা জমি ফিরে পাবেন কিনা সে সংশয় যথেষ্ট পরিমাণেই আছে। ফলে এখনও যারা তৃণমূলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশ্বস্ত অনুগামী তাঁদেরও বাদ দেওয়া গেল। তাহলে পড়ে রইলো কে?
এমনিতেই আইপ্যাক নিয়ে তৃণমূলের ওপর থেকে নীচ পর্যন্ত চাপা ক্ষোভ আছে। দলের বর্ষীয়ান নেতাদের বা দীর্ঘদিন ধরে যারা তৃণমূলের সঙ্গে আছেন তাঁদের অনেকেরই ক্ষোভ আছে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রতিও। তাই নির্বাচনে ৮০ আসন, আড়াই কোটির বেশি ভোট ( ২ কোটি ৬০ লক্ষ ১৩ হাজার ৩৭৭ ভোট) পেয়েও ক্ষুব্ধ অধিকাংশ বিধায়ক, কাউন্সিলর নেতা কর্মীরা। আর ঠিক এই জায়গাতেই লুকিয়ে আছে তৃণমূলের পতনের চাবিকাঠি। যে পতনের জন্য যতটা না আরজি কর কান্ড, লাগামছাড়া দুর্নীতি, দলের বহু নেতা কর্মীর উদ্ধত আচরণ দায়ী, তার থেকেও অনেক বেশি দায়ী বোধহয় তৃণমূলের শীর্ষস্তরের কয়েকজন নেতৃত্ব। যাদেরকে 'সব ঠিক হ্যায়' বলে আশ্বস্ত করা হয়েছিল এবং তাঁরাও যাচাই না করেই চোখ বন্ধ করে সেই আশ্বাসবাণীতে আস্থা রেখেছিলেন। লোহার বাসরঘরে তৈরি করে রাখা ফুটো নজরে আসেনি কারও।
২ জুন তৃণমূলের বিক্ষোভ সমাবেশের জন্য রানী রাসমণি রোড চেয়েও পাওয়া যায়নি। পরিবর্তে ওয়াই চ্যানেলে যে বিক্ষোভ সমাবেশ হচ্ছে সেখানেও সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। নেই কোনও মঞ্চ, মাইক। ফলে আকারে আকৃতিতে যে ধরণের বিক্ষোভ সমাবেশ হতে পারতো তা করা সম্ভব হয়নি। বিক্ষোভ সমাবেশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশ্বস্ত কয়েকজন হাতে গোনা সৈনিক ছাড়া দেখা নেই অধিকাংশেরই। যদিও তাঁর ডাকে এদিনও বেশ কিছু মানুষ জড়ো হয়েছেন। তবে এই শক্তি দিয়ে দলের পুনর্গঠন কার্যত অসম্ভব এবং যত সময় যাবে পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি দেখে ক্রমশ ভিড় কমবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশ থেকে।
কে আদি, কে নব্য, সে বিতর্কে গিয়ে লাভ নেই। বিষয়টা এরকম আদৌ নয় যে অতীতে তৃণমূল কখনও দল ভাঙার খেলা খেলেনি। এ কথা তো অস্বীকার করার উপায় নেই যে কংগ্রেস ভেঙেই একসময় তৃণমূলের জন্ম এবং এরপর গত ১৫ বছরের শাসনকালে কংগ্রেস, সিপিআইএম, ফরওয়ার্ড ব্লক, আরএসপি, সিপিআই, বিজেপি সব দলই ভেঙেছে তৃণমূল। তাই আজ তৃণমূলও ভাঙছে, ভাঙবে কালের নিয়মেই। এই ভাঙন সামলাতে পারবেন না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়রা।
এক্ষেত্রে প্রশ্ন একটাই। তৃণমূল দলটাই কি তাহলে উঠে যাবে? নাকি এই তৃণমূল থেকেই একটা বড়ো অংশ ভেঙে বেরিয়ে গিয়ে বর্তমান তৃণমূলের নাম, প্রতীক সব দাবি করে বসবে। ইতিমধ্যেই কানাঘুষো শোনা যাচ্ছে যে বহিষ্কৃত তৃণমূল বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, সন্দীপন সাহার শিবিরে ভিড় ক্রমশ বাড়ছে। সেক্ষেত্রে ধরে নেওয়া যেতে পারে বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধার কাজটা বহিষ্কৃত ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়রাই গুছিয়ে করবেন। এক্ষেত্রে তৃণমূলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে ৫২-৫৩ জন জোগাড় করতে পারলেই দল ভাঙতে, দলের নাম পেতে, প্রতীক পেতে এবং বিরোধী দলনেতার পদ পেতেও কোনও অসুবিধা থাকবে না। এর বাইরে বাকি যেটুকু তৃণমূল পড়ে থাকবে তাদের হয়তো নাম, প্রতীকের জন্য আইনি লড়াইয়ের পথে যেতে হবে এবং আগামীতে হয়তো বা তৃণমূল কংগ্রেস (মব) বা তৃণমূল কংগ্রেস (অব) নাম নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। তৃণমূলের ভবিষ্যৎ আগামী দিনে কোন বন্দ্যোপাধ্যায়-এর হাতে থাকবে তা সম্ভবত আর দু'এক দিনের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যাবে।
*মতামত লেখকের ব্যক্তিগত
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন