বিজেপির ভরা বাজারে বাঁকিপুরে পরাজয় নিয়ে শুরু হয়েছে ময়নাতদন্ত। বিশেষ করে বিজেপি সর্বভারতীয় সভাপতির ছেড়ে যাওয়া আসন এবং বিজেপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত আসনে বিজেপির পরাজয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়েছে সব মহলে। যে আসনে গত ৩১ বছর বিজেপি হারেনি, শেষ নির্বাচনেও যে আসনে বিজেপির জয়ের ব্যবধান ছিল ৫২ হাজারের কাছাকাছি সেই আসনে এমন কী ঘটলো যে গত নির্বাচনে সারা বিহার জুড়ে ব্যর্থ হওয়া প্রশান্ত কিশোরের জন সূরজ জিতে গেল! তাও আবার ৪৯.২৩ শতাংশ ভোট পেয়ে!
আপাতদৃষ্টিতে তিন রাজ্যের তিন কেন্দ্রের উপনির্বাচনে রাজনৈতিকভাবে খুব বেশি কিছু পাওয়ার ছিল না। গুজরাটের মঞ্জুলপুর, মধ্যপ্রদেশের দাঁতিয়া এবং বিহারের বাঁকিপুর। যার মধ্যে গুজরাট এবং বিহারের আসন ছিল বিজেপির এবং মধ্যপ্রদেশের আসন ছিল কংগ্রেসের। ফলাফলের নিরিখে মধ্যপ্রদেশের প্রেস্টিজ ফাইটে কংগ্রেসই দাঁতিয়া আসন দখলে রেখেছে, ভোট শতাংশ কমলেও গুজরাট দখলে রেখেছে বিজেপি। ব্যতিক্রম শুধু বিহার। যেখানে একবছর আগের জেতা আসনে পরাজয় ঘটেছে বিজেপির। তাও আবার রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল আরজেডি-র কাছে নয়, বরং রাজ্যের রাজনীতিতে এখনও পর্যন্ত সেভাবে কোনও সাড়া না জাগানো জন সূরজের কাছে। যে রাজনৈতিক দল বিগত বিধানসভা নির্বাচনে ২৩৮ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সাকুল্যে ভোট পেয়েছিল ৩.৩৪ শতাংশ। জামানত জব্দ হয়েছিল প্রায় সব আসনে।
বিহার তথা দেশের রাজনীতিতে ২০২৫ সালের পর বিরাট যে কোনও পরিবর্তন হয়েছে তেমনটা নয়। বরং পশ্চিমবঙ্গ, আসামে বিজেপি ক্ষমতায় এসেছে। কাজেই নির্বাচনী আবহ বিজেপির অনুকূলেই ছিল তাতে সন্দেহ নেই। যদিও নীতিশ কুমারকে মুখ্যমন্ত্রী পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং সম্রাট চৌধুরীকে মুখ্যমন্ত্রী করায় বিজেপির ওপর সাধারণ মানুষের একটা বড়ো অংশের ক্ষোভ ছিলই। কিন্তু সেই ক্ষোভ এতটাও ছিল না যাতে বিজেপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে চিহ্নিত বাঁকিপুর কেন্দ্রে বিজেপির পরাজয় ঘটবে।
২০২৫-এর নির্বাচনের অনুপাতে এবার বাঁকিপুর কেন্দ্রে ভোট কম পড়েছিল প্রায় ৭ শতাংশ। যে তিনটি বুথ ফেরত সমীক্ষা সামনে এসেছিল তার সবকটিতেই প্রশান্ত কিশোর জয়ী হতে চলেছে বলে আগাম জানানো হয়েছিল। মোটামুটি এই তিন বুথ ফেরত সমীক্ষা প্রায় অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেছে। এমনকি ভোট শতাংশ পর্যন্ত। যে ঘটনাকে আশ্চর্য বললেও কম বলা হবে।
২০২৫ বিধানসভা নির্বাচনে বাঁকিপুর কেন্দ্রে বিজেপির প্রাপ্ত ভোটের হার ছিল ৬২.৬৬ এবং আরজেডি-র প্রাপ্ত ভোটের হার ছিল ২৯.৫৫। এই কেন্দ্রে জন সূরজ পেয়েছিল মাত্র ৪.৯২ শতাংশ ভোট। বিজেপির জয়ের ব্যবধান ছিল ৫১,৯৩৬। অতীতের বেশ কয়েকটি নির্বাচনে এই কেন্দ্রে বিজেপির প্রাপ্ত ভোটের হার ৬০ শতাংশ বা তার বেশি ছিল। ২০১০-এ ছিল ৭২ শতাংশ। ২০২৫-এর অনুপাতে এবার এই কেন্দ্রে বিজেপির ভোট কমেছে ২৮.২৬ শতাংশ। আরজেডি-র ভোট কমেছে ১৮.৬০ শতাংশ। অন্যদিকে জন সূরজের ভোট বেড়েছে ৪৪.৩১ শতাংশ।
সবথেকে জটিল প্রশ্ন সম্ভবত এখানেই। বিজেপির পকেট ভোট অথবা আরজেডি-র পকেট ভোট কীভাবে কমলো? দিল্লীর যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনে বিজেপি বিরোধিতা বাড়ার সম্ভাবনা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু প্রধান বিরোধী দল আরজেডি-র ভোট কমে যাওয়ার মত যথেষ্ট কোনও কারণ নেই। অন্যদিকে পিকে-র জন সূরজ সিজেপি আন্দোলনে বা সাম্প্রতিক সময়ে বিহারের কোনও আন্দোলনে এমন কোনও মুখ্য ভূমিকা নেয়নি যাতে তাদের ভোটের হার বাড়তে পারে।
বাঁকিপুর কেন্দ্রের জাতপাতের সমীকরণও বেশ জটিল। বিহারের রাজনীতিতে যে সমীকরণ মেনেই সব রাজনৈতিক দলকে রাজনীতি করতে হয়। সেই হিসেবে প্রায় ৪ লক্ষ ভোটারের এই কেন্দ্রে ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ কায়স্থ, ১২ শতাংশ যাদব, ১০ শতাংশ মুসলিম, ৯ শতাংশ চন্দ্রবংশী, ৯ শতাংশ বানিয়া, ৮ শতাংশ দলিত, ৭ শতাংশ ভূমিহার ও ৭ শতাংশ ব্রাহ্মণ, ৫ শতাংশ রাজপুত ও ৫ শতাংশ কূর্মী এবং ৩ শতাংশ কুশওয়াহা। এই সমীকরণ থেকে এটা স্পষ্ট যে কোনও একপক্ষের প্রভাবে এই কেন্দ্রে জয় পরাজয় সম্ভব নয়। বরং একাধিক জাতি গোষ্ঠী হাতে থাকলেই এই কেন্দ্রে জয় সম্ভব।
জাতপাতের নিরিখে বাঁকিপুরে কেন্দ্রের উপনির্বাচনে বিজেপি প্রার্থী ছিলেন কায়স্থ, আরজেডি প্রার্থী ছিলেন বৈশ্য এবং প্রশান্ত কিশোর ছিলেন ব্রাহ্মণ। ফলত কোনও এক গোষ্ঠী থেকে কোনও প্রার্থী বিশেষ সুবিধা পেয়েছেন এমনটা নয়। বাঁকিপুর কেন্দ্রে কায়স্থদেরই নির্ণায়ক শক্তি বলা হয়। যারা বিজেপির ভোট ব্যাঙ্ক হিসেবেই পরিচিত। এবারও হয়তো তাঁদের একটা বড়ো অংশ বিজেপিকেই সমর্থন করেছেন। কিন্তু এই ফলাফলে এটা প্রমাণিত যে বিজেপির সেই চিরাচরিত সমর্থক গোষ্ঠীতেও ফাটল ধরেছে। কায়স্থ ভোট ব্যাঙ্ক অটুট থাকলে বিজেপির ভোট এতটা কমতো না।
কিন্তু এর পাশাপাশি সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন কোন গোষ্ঠী তাঁদের ভোট নিঃশব্দে প্রশান্ত কিশোরের পক্ষে দিলেন এবং কেন দিলেন। সরল অঙ্কে ১২ শতাংশ যাদব ভোটের খুব একটা অন্যদিকে যায়নি তা এই ফলাফলেই স্পষ্ট। কারণ আরজেডি ভোট পেয়েছে প্রায় ১১ শতাংশ। আবার ১০ শতাংশ মুসলিমের ভোট বিজেপির পক্ষে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। অর্থাৎ সেক্ষেত্রে আবারও সেই সরল অঙ্কই বলছে এই জয়ের পেছনে আছে কায়স্থ, মুসলিম, বানিয়া, দলিত এবং ভূমিহারের ভোট এককাট্টা হওয়া। যা বিজেপির বিরুদ্ধে গেছে বলেই অনুমান।
এই ফলাফলকে অতি সরলীকরণ করে লাভ নেই। একথা তো সত্যি যে নিজেদের মুখ্যমন্ত্রী থাকা এবং দলের সর্বভারতীয় সভাপতির ছেড়ে আসন হওয়া সত্ত্বেও বাঁকিপুর কেন্দ্রে পরাজয় বিজেপির জন্য যথেষ্ট বিড়ম্বনার কারণ হতে চলেছে। বিশেষ করে যে আসনে গত ৩০ বছরে বিজেপি হারেনি সেইরকম এক আসনে বিজেপির পরাজয় রাজ্য এবং দেশের রাজনীতিতেও যথেষ্ট ইঙ্গিতবহ।
বিগত প্রায় তিরিশ বছর ধরে বিহার আরজেডি, জেডিইউ এবং বিজেপির রাজনীতিতে অভ্যস্ত। শেষ কয়েক বছরে রাজ্যের বেশ কিছু অঞ্চলে উত্থান হয়েছে বাম শক্তিরও। এরকম এক বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জন সূরজের জয় কি আগামীতে অন্য কোনও সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে? সে কথা বলার সময় যদিও এখনও আসেনি।
বিহারের এই ফলাফল আগামী দিনে বিহারের রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে বা আদৌ কোনও প্রভাব ফেলবে কিনা সময় বলবে। তবে একথা ঠিক বাঁকিপুরের পরাজয় বিজেপির কাছে বড়ো ধাক্কা। যদিও আগামী দিনে এই ফলাফলের ধারাবাহিকতা থাকে কিনা সেটাও দেখার। এই ফলাফল কি এতটাই সরল অঙ্কের নাকি বিহারের দুই পক্ষের রাজনীতিতে আরও এক পক্ষকে তুলে আনার চেষ্টা? এমনিতেও প্রশান্ত কিশোরের ভূমিকা অথবা রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে অতীতে একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। একাধিকবার তিনি শিবির বদলও করে ফেলেছেন ইতিমধ্যেই। তিনি আসলে কোন পক্ষে তা নিয়ে যথেষ্ট ধন্দ আছে রাজনৈতিক মহলে। সেইসব কিছুর নিরিখে আপাতত এই জয় নিয়ে খুব একটা আশাবাদী হবার মত কিছু নেই।
*মতামত লেখকের ব্যক্তিগত
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন