

বাঁকুড়ার ইন্দাসের করিষুন্ডা গ্রামে এক সিজেপি সমর্থকের বাবাকে পিটিয়ে খুনের অভিযোগ উঠলো বিজেপির বিরুদ্ধে। নিহত শেখ মহম্মদ মাফিকের ছেলে শেখ আবদুল হাফিজ সম্প্রতি দিল্লীর যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। নিহতের ছেলের অভিযোগ, ১৩ আগস্ট রাতে তাদের বাড়িতে চড়াও হয়ে কিছু যুবক তাঁকে এবং তার বাবাকে মারধোর করে। শনিবার রাতে মৃত্যু হয়েছে তার বাবা শেখ মহম্মদ মাফিকের। এই ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছেন সিজেপি প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি অভিজিৎ দীপকে।
শেখ আবদুল হাফিজের বক্তব্য অনুসারে, সিজেপি-র যন্তর মন্তরের আন্দোলন শেষে সম্প্রতি তিনি বাড়ি ফিরেছিলেন। আন্দোলনের ভিডিওও তিনি সোশ্যাল মিডিয়া পেজে পোষ্ট করেছিলেন। এর পরেই স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্বের ক্ষোভ তৈরি হয়। এরপর গত ১২ আগস্ট সিজেপির ‘স্কুল ঠিক করো’র বার্তা দেবার পর ১৩ আগস্ট তিনি নিজের গ্রামের স্কুল করিষুন্ডা পশ্চিমপাড়া প্রাইমারি স্কুলে যান এবং সেখানকার শিক্ষকদের সঙ্গে স্কুলের সমস্যা, পরিকাঠামো নিয়ে কথা বলেন। এরপর সেই ভিডিও তিনি নিজের সোশ্যাল মিডিয়ায় পোষ্ট করেন।
আবদুল হাফিজ জানিয়েছেন, ওইদিন রাতেই স্থানীয় বেশ কিছু বিজেপি কর্মী তাদের বাড়িতে চড়াও হয় এবং তাঁকে মারধোর করে। ভয়ে তিনি ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেন। ছেলেকে বাঁচাতে বাবা এগিয়ে এলে তাঁকে প্রচণ্ড মারধোর করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে ইন্দাস হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসায় বাধা দিয়ে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হলেও ফের রাস্তা আটকে মারধোর করা হয়। বাধ্য হয়ে বাড়ি ফিরে এলেও বাবার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হলে তাঁকে ১৫ তারিখ বর্ধমান হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই রাতেই তাঁর বাবার মৃত্যু হয়।
এই ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে নিজের এক্স হ্যান্ডেলে (পূর্বতন ট্যুইটার) সিজেপি প্রধান অভিজিৎ দীপকে এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, “আব্দুল বাংলার সেই সরকারি স্কুলটি পরিদর্শনে গিয়েছিলেন যেখানে তিনি একসময় পড়াশোনা করেছিলেন। সরকারি স্কুলের বেহাল দশা নিয়ে সরব হওয়ার কারণে দুষ্কৃতীদের (যাদের বিরুদ্ধে বিজেপির সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে) হামলার শিকার হয়ে তিনি তাঁর বাবাকে হারান।”
ওই বিবৃতিতেই অভিজিৎ জানিয়েছেন, “শুধুমাত্র ভালো স্কুলের দাবি তোলার কারণে মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে—এই বিষয়টি আমাকে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও মর্মাহত করে। সিজেপি (CJP) আব্দুল ও তাঁর পরিবারের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়েছে। তাঁর বাবার মৃত্যুর জন্য দায়ী ব্যক্তিদের অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবি জানাচ্ছি আমরা। সিজেপির একটি প্রতিনিধি দল পশ্চিমবঙ্গ সফর করবে এবং আব্দুল ও তাঁর পরিবার যাতে ন্যায়বিচার পান, তা নিশ্চিত করবে।”
অভিজিৎ জানিয়েছেন, “আর সেই সব বিদ্বেষ-প্রচারকারীদের উদ্দেশে বলছি যারা মনে করে হিংসার মাধ্যমে আমাদের কণ্ঠরোধ করা যাবে: আমরা কিন্তু পিছু হটব না। আমাদের সদস্যদের ওপর হামলা করুন, হুমকি দিন কিংবা ভয় দেখানোর চেষ্টা করুন—আমরা আরও জোরদার লড়াই চালিয়ে যাব। আমাদের কণ্ঠরোধ করা যাবে না। আমরা ভয় পাব না। ভালো স্কুলের দাবিতে আমাদের লড়াই অব্যাহত থাকবে।”
এই ঘটনা প্রসঙ্গে এসএফআই রাজ্য সম্পাদক দেবাঞ্জন দে এক ভিডিও বার্তায় জানিয়েছেন, “বাঁকুড়ার ইন্দাসে গ্রামের প্রাথমিক স্কুল সংস্কারের দাবিতে লড়াই করতে গিয়ে আক্রান্ত ছাত্র। খুন ছাত্রের বাবা। আক্রান্ত পরিবারের অন্যান্যরাও। মুসলমান পরিবারের ওপর লিঞ্চিং সংস্কৃতি চালাচ্ছে বিজেপি। খুন করলো সিজেপি ঘনিষ্ঠ প্রতিবাদী ছাত্রের বাবাকে।” এই ঘটনার প্রতিবাদে সোমবার রাজ্যজুড়ে রাস্তায় থাকার ডাক দিয়েছেন তিনি।
ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ যুব কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এক এক্স হ্যান্ডেল বার্তায় জানানো হয়েছে, “পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়ায় একটি সরকারি স্কুলের জরাজীর্ণ অবস্থার কথা তুলে ধরাটা এক যুবক ও তাঁর পরিবারের জন্য প্রাণঘাতী অপরাধে পরিণত হয়েছে। ২৫ বছর বয়সী আব্দুল হাফিজ তাঁর স্কুলের শোচনীয় অবস্থা সবার সামনে তুলে ধরেছিলেন। এর জেরে বিজেপি-র গুণ্ডারা তাঁর বাড়িতে হামলা চালায়; হামলায় তাঁর বাবা আব্দুল মাফিক গুরুতর আহত হন এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। আইওয়াইসি (IYC)-র একটি দল হাফিজ ও তাঁর পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং তাঁদের সব ধরনের আইনি ও প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করছে।” গতকালই যুব কংগ্রেসের এক প্রতিনিধি দল নিহতের বাড়ি গিয়ে তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
ঘটনা প্রসঙ্গে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে জানিয়েছেন, “যাদের বিরুদ্ধে এফআইআর (FIR) দায়ের করা হয়েছে, তাদের মধ্যে তিনজনকে ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকি দুজনকেও গ্রেপ্তার করা হবে। এর সঙ্গে বিজেপির কোনো যোগসূত্র নেই। তারা সবাই অপরাধী। আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
পিটিয়ে হত্যার এই ঘটনায় রবিবার দুপুরে স্থানীয় থানায় নিহতের স্ত্রী অভিযোগ জানানোর পর এখনও পর্যন্ত ৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন