

কেরলের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক পরিবেশ এবার অনেকটাই বদলে গিয়েছে। বহু বছর ধরে চলে আসা ভোটের ধারা এবং জোটভিত্তিক সমীকরণকে নতুনভাবে গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। ফলে শাসক Left Democratic Front এবং বিরোধী United Democratic Front-এর লড়াই শুধু ক্ষমতার নয়, বরং রাজনৈতিক ভবিষ্যতের দিকনির্দেশও ঠিক করবে।
গত নির্বাচনে সিপিআইএম (CPIM)-এর নেতৃত্বাধীন এলডিএফ টানা দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে কেরলের দীর্ঘদিনের প্রচলিত ‘পালাবদলের’ রাজনীতিকে ভেঙে দেয়। এবার তাদের লক্ষ্য আরও বড়—টানা তৃতীয়বার জিতে নতুন নজির তৈরি করা। কিন্তু এক দশক ধরে ক্ষমতায় থাকার ফলে স্বাভাবিকভাবেই রাজ্যের মানুষের মনে প্রতিষ্ঠানবিরোধী মনোভাব তৈরি হয়েছে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
অন্যদিকে কংগ্রেস (Indian National Congress) নেতৃত্বাধীন ইউডিএফের কাছে এই নির্বাচন অস্তিত্বের লড়াইয়ের মতো। পরপর দু'বার পরাজয়ের পর আর একবার হারলে সংগঠন আরও দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই তারা এবার ভোটে ‘পরিবর্তন’-এর ডাককে প্রধান অস্ত্র করেছে।
ইউডিএফ তাদের প্রচারে শাসক সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষকে সামনে আনছে। তাদের দাবি, গত দশ বছরে একাধিক প্রতিশ্রুতি অপূর্ণ রয়ে গিয়েছে এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতা সামনে এসেছে। পাশাপাশি তারা কিছু জনমুখী প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে—যেমন মহিলাদের জন্য বিনামূল্যে বাস পরিষেবা, ছাত্রীর জন্য আর্থিক সহায়তা এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষা প্রকল্প।
অন্যদিকে এলডিএফ নিজেদের কাজের রিপোর্ট কার্ডকে তুলে ধরছে। বিভিন্ন সামাজিক প্রকল্প, পেনশন ব্যবস্থা, পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিবেশ বজায় রাখাকে তারা বড় সাফল্য হিসেবে দেখাচ্ছে। নির্বাচনের আগে কিছু প্রকল্পে আর্থিক সুবিধা বাড়িয়ে ভোটারদের আস্থা ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।
এই নির্বাচনে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছেন মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন। তাঁর নেতৃত্বে এলডিএফ সংগঠিত ও আত্মবিশ্বাসী। অভিজ্ঞতা এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ—এই দু’টিই শাসক শিবিরের বড় শক্তি।
ইউডিএফের ক্ষেত্রে চিত্রটা কিছুটা আলাদা। তারা এখনও পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে কাউকে স্পষ্টভাবে সামনে আনেনি। ভি ডি সতীশন, রমেশ চেন্নিথলা বা কে সি ভেনুগোপাল—এই নামগুলো ঘোরাফেরা করলেও দল ‘সমষ্টিগত নেতৃত্ব’-এর কথাই বলছে। ফলে নেতৃত্বের প্রশ্নে কিছুটা অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
কেরলের ভোটে ধর্মীয় ও সামাজিক গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা সবসময় গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর কেরলে ইউডিএফ ঐতিহ্যগতভাবে শক্তিশালী, বিশেষ করে Indian Union Muslim League-এর সঙ্গে জোটের কারণে। অন্যদিকে মধ্য ও দক্ষিণ কেরলের আসনগুলোই শেষ পর্যন্ত ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা নেয়।
এই প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে ‘গোপন সমঝোতা’-র অভিযোগ তুলছে। ফলে রাজনৈতিক লড়াই শুধু ভোটে সীমাবদ্ধ নেই, তা পৌঁছে গিয়েছে জনমত গঠনের সূক্ষ্ম স্তরেও।
গত কয়েকটি নির্বাচনের ফলাফল দেখলে বোঝা যায়, কেরলে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান কখনও খুব বড়, কখনও আবার খুব সামান্য। এই অনিশ্চয়তাই এবারের নির্বাচনকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
সব মিলিয়ে, একদিকে দশ বছরের শাসনের অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে পরিবর্তনের দাবি—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে কেরলের নির্বাচন এবার অন্য রকম মোড় নিতে পারে। কে এগিয়ে থাকবে, তা নির্ধারণ করবে রাজ্যের ভোটাররাই।
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন