Assam: ভোটমুখী আসামে হিমন্ত বিশ্ব শর্মার এআই ভিডিও বিতর্ক; দেশজুড়ে সমালোচনায় পোষ্ট মুছলো বিজেপি

People's Reporter: বিতর্কিত ১৬ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে মুখ্যমন্ত্রী বিশ্ব শর্মাকে বন্দুক ছুঁড়তে দেখা গেছিল। যে বন্দুকের নিশানায় দেখানো হয়েছিল কংগ্রেস সাংসদ গৌরব গগৈ এবং এক দাড়িওয়ালা এক ব্যক্তিকে।
আসাম বিজেপির যে পোষ্ট ঘিরে বিতর্ক
আসাম বিজেপির যে পোষ্ট ঘিরে বিতর্কছবি, এক্স হ্যান্ডেলে প্রকাশিত ভিডিও থেকে স্ক্রিনশট
Published on

ভোটমুখী আসামে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা হিমন্ত বিশ্ব শর্মার এক সোশ্যাল মিডিয়া পোষ্ট ঘিরে চরম বিতর্ক ছড়ালো। যে ভিডিওর শীর্ষক ছিল ‘পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক শট’। রাজ্য ও দেশজুড়ে তুমুল সমালোচনার মুখে ইতিমধ্যেই সেই পোষ্ট মুছে দেওয়া হয়েছে আসাম বিজেপির এক্স হ্যান্ডেল থেকে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বানানো বিতর্কিত ১৬ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে মুখ্যমন্ত্রী বিশ্ব শর্মাকে বন্দুক ছুঁড়তে দেখা গেছিল। যে বন্দুকের নিশানায় দেখানো হয়েছিল কংগ্রেস সাংসদ গৌরব গগৈ এবং এক দাড়িওয়ালা এক ব্যক্তিকে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে সাংবাদিক, আইনজীবী, সমাজকর্মীরা এই ভিডিওর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

যে সময় বিজেপি আসামের এক্স হ্যান্ডেল থেকে এই ভিডিও পোষ্ট করা হয়েছে ঠিক সেইসময়েই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ মালয়েশিয়া সফর করছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ভিডিও বিদেশের মাটিতে প্রধানমন্ত্রীকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলতে পারে। তাই বিতর্ক এড়াতে পোষ্ট ডিলিট করে দেওয়া হয়েছে। এই ভিডিও এক্স হ্যান্ডেলে পোষ্ট করে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র।

শনিবার ৭ ফেব্রুয়ারি বিজেপি আসাম-এর অফিসিয়াল এক্স হ্যান্ডেল থেকে ওই এআই ভিডিও পোষ্ট করা হয়। ভিডিও পোষ্ট করার এক ঘণ্টার মধ্যেই তা প্রায় পাঁচ লক্ষ মানুষ দেখেন এবং বিভিন্ন মহলে কড়া সমালোচনা শুরু হয়। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে ভিডিও প্রসঙ্গে বলা হয়, ভোটের মুখে বিজেপি মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াচ্ছে। তুমুল বিতর্কের মুখে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভিডিওটি বিজেপি আসামের এক্স হ্যান্ডেল থেকে ডিলিট করা হয়।

এই ভিডিও প্রসঙ্গে সাংবাদিকরা মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মাকে প্রশ্ন করলে তিনি জানান, তিনি এই ধরণের কোনও ভিডিও দেখেননি এবং তাঁর সোশ্যাল মিডিয়া হ্যান্ডেল থেকে এই ধরণের কোনও ভিডিও শেয়ার করা হয়নি। যদিও মুখ্যমন্ত্রী এই ভিডিও দেখেননি বলে জানালেও সোশ্যাল মিডিয়ায় এই ভিডিও ইতিমধ্যেই ভাইরাল।

আসাম বিজেপি-র পক্ষ থেকে প্রকাশিত ভিডিও প্রসঙ্গে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মাকে অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে সিপিআইএম। সিপিআইএম-এর পক্ষ থেকে এক এক্স বার্তায় বলা হয়েছে, “আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এবং বিজেপি এসআইআর (SIR) কার্যক্রম এবং ‘অনুপ্রবেশকারী’ জুজুর ভয় ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িক, উস্কানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছেন এবং মুসলিমদের লক্ষ্যবস্তু করে হিংসার আহ্বান জানাচ্ছেন। বিজেপির অফিসিয়াল হ্যান্ডেল থেকে পোস্ট করা সর্বশেষ ভিডিওটি জাতিগত নির্মূলিকরণ এবং গণহত্যার জন্য প্রকাশ্য আহ্বানের শামিল।

দেশের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোকে যে কোনও মূল্যে রক্ষার আবেদন জানিয়ে ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “আসামে কোনো বিপর্যয় ঘটার আগেই মুখ্যমন্ত্রীকে কারাগারে পাঠানো উচিত। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করা, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি করা এবং প্রকাশ্যে হিংসার আহ্বান জানানোর জন্য সুপ্রিম কোর্টের অবিলম্বে তার এবং তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আমাদের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোকে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে!”

কংগ্রেস সাংসদ এবং জাতীয় সাধারণ সম্পাদক (সাংগঠনিক) কে সি বেণুগোপাল তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে বিজেপির ওই ভিডিও সম্পর্কে জানিয়েছেন, “বিজেপির এক অফিসিয়াল হ্যান্ডেল থেকে সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যার একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়েছে। এটি গণহত্যা ছাড়া আর কিছুই নয় – এমন একটি স্বপ্ন যা এই ফ্যাসিবাদী সরকার কয়েক দশক ধরে লালন করে আসছে।”

ওই পোষ্টেই কংগ্রেস সাংসদ লিখেছেন, “এটি কোনো নিরীহ ভিডিও নয় যাকে ট্রোল কনটেন্ট হিসেবে উপেক্ষা করা যাবে। এই ভিডিও একেবারে শীর্ষ পর্যায় থেকে ছড়ানো বিষ, এবং এর জন্য অবশ্যই পরিণতি ভোগ করতে হবে। নরেন্দ্র মোদি যে এর নিন্দা করবেন বা এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেবেন, এমন কোনো আশা নেই, কিন্তু বিচার বিভাগকে অবশ্যই পদক্ষেপ নিতে হবে এবং এই ক্ষেত্রে কোনো ধরনের নমনীয়তা দেখানো উচিত নয়।”

কংগ্রেসের রাজ্যসভা সাংসদ ডঃ সৈয়দ নাসের হুসেন ওই ভিডিও সম্পর্কে নিজের এক্স হ্যান্ডেলে এক বিবৃতিতে জানান, “শনিবার আসাম বিজেপির অফিসিয়াল এক্স হ্যান্ডেলে পোস্ট করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা প্রতীকীভাবে খুব কাছ থেকে মুসলমানদের লক্ষ্য করে গুলি চালাচ্ছেন, এবং ভিডিওটির ক্যাপশনে লেখা আছে “পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক শুট”। এর মাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রী নিজেই যে বাঙালি বংশোদ্ভূত মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক প্রচারণার নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তা আরও তীব্র করা হয়েছে।”

ওই বার্তায় কংগ্রেস সাংসদ আরও জানান, “ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামো বহুত্ববাদ, আইনের শাসন এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার সুরক্ষার উপর নির্ভরশীল। এই নীতিগুলোকে অবশ্যই সারা দেশে জনজীবনে এবং রাজনৈতিক আলোচনায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ পেতে হবে।”

এই ভিডিও প্রসঙ্গে কংগ্রেস নেত্রী সুপ্রিয়া শ্রীনাতে এক এক্স হ্যান্ডেল বার্তায় জানিয়েছেন, “যে ভিডিওতে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মাকে 'পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক শট' ক্যাপশনসহ মুসলিম পুরুষদের গুলি করতে দেখা যাচ্ছে, সেটি মুছে ফেলাই যথেষ্ট নয়। বিজেপি আসলে এমনই: গণহত্যাকারী। এই বিষ, ঘৃণা এবং হিংসার দায় আপনার, মিস্টার মোদি। আদালত এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানগুলো কি ঘুমিয়ে আছে?”

কংগ্রেসের রাজ্যসভা সাংসদ ইমরান প্রতাপগড়ি ভিডিওটিকে “সংবিধানের বুকে গুলি চালানো” বলে অভিহিত করেছেন। প্রতাপগড়ি তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন, “প্রিয় প্রধানমন্ত্রীজী, আপনার প্রিয় মুখ্যমন্ত্রী তার নির্বাচনী বিজ্ঞাপনে সরাসরি মুসলমানদের বুকে গুলি চালাচ্ছেন, কিন্তু বাস্তবে তিনি সংবিধানের বুকে গুলি চালাচ্ছেন। এমনই একটি গুলি গডসে মহাত্মা গান্ধীর বুকে চালিয়েছিল। যদিও এই ভিডিওটি এখন মুছে ফেলা হয়েছে, নরেন্দ্র মোদীজী, প্রশ্নটা আপনার কাছে: আপনি কি নিজে এসব দেখছেন না?”

আইনজীবী ও সমাজকর্মী প্রশান্ত ভূষণ সুপ্রিম কোর্টকে ভিডিওটির স্বতঃপ্রণোদিতভাবে বিচারের অধীনে নেওয়ার এবং এটি আপলোড করার জন্য বিজেপি নেতাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “এটি একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। কোনো বিরোধী দলের নেতা এমন পোস্ট করলে তাকে ইউএপিএ (বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন) এর অধীনে জেলে যেতে হতো।”

বিশিষ্ট সাংবাদিক রবীশ কুমার এই ভিডিও প্রসঙ্গে নিজের এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন, "হিমন্ত বিশ্ব শর্মা যা করেছেন তা দেশের সমস্ত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং সেই পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের জন্য লজ্জাজনক হওয়া উচিত। তিনি প্রমাণ করেছেন যে সংবিধান বা মর্যাদার প্রতি তার কোনও শ্রদ্ধা নেই। তিনি তাদের সকলকে পদদলিত করেছেন। মোহন ভাগবত থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী এবং বিজেপির দৈনিক মুখপাত্র পর্যন্ত সকলেই চুপ থাকবেন। প্রধানমন্ত্রী যদি ট্রাম্পের সামনে কথা বলতে না পারেন, তাহলে তিনি হেমন্তের সাথে কীভাবে কথা বলবেন? অমিত শাহের কোনও দায়িত্ব নেই; তিনি হয়তো এটিকে ন্যায্যতা দেওয়ার জন্য একটি বক্তৃতাও দেবেন।"

তিনি আরও বলেন, "যদি এই ভিডিওটিকে গৃহযুদ্ধ উস্কে দেওয়ার প্রমাণ হিসাবে দেখা না হয়, তবে এর অর্থ হল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলি এখন প্রকাশ্যে এই পরিকল্পনায় যোগ দিয়েছে। এই কাজ এখন তাদের নিজস্ব শক্তিতে পরিচালিত হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্ট স্বতঃপ্রণোদিতভাবে বিবেচনা করবে এবং ব্যবস্থা নেবে বলে আশা করা বৃথা। ফ্যাসিবাদ সম্পর্কিত বহু বই এই ধরনের ঘটনায় পূর্ণ। সুপ্রিম কোর্ট যদি সেগুলি পড়তে চায়। কে জানে?"

উল্লেখ্য, আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মাকে নিয়ে বিতর্ক এই প্রথম নয়। এর আগেও একাধিকবার তিনি বহু বিতর্কিত মন্তব্য করেছেন। যা নিয়ে চরম সমালোচনা হয়েছে। যদিও তাতেও তাঁকে থামানো যায়নি। সম্প্রতি তাঁর এক প্রকাশ্য মন্তব্যের প্রতিবাদে আসামের বিশিষ্টজনের গুয়াহাটি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন। যেখানে, এক নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের প্রতি মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার সাম্প্রতিক এবং ধারাবাহিক মন্তব্যের উল্লেখ করে গুয়াহাটি হাইকোর্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে এবং স্বতঃপ্রণোদিত ব্যবস্থা নেবার আহ্বান জানানো হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, “সাংবিধানিক পদের শপথ লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে নীরবতা বা নিষ্ক্রিয়তা” “সংবিধানের নৈতিক কর্তৃত্বকেই ক্ষুণ্ণ করতে পারে”।

আসাম বিজেপির যে পোষ্ট ঘিরে বিতর্ক
Assam: হিমন্ত বিশ্বশর্মার 'ঘৃণাসূচক' মন্তব্যের প্রতিবাদ - গুয়াহাটি হাইকোর্টের দ্বারস্থ বিশিষ্টজনেরা
আসাম বিজেপির যে পোষ্ট ঘিরে বিতর্ক
Assam: বিধানসভায় আপত্তিকর বক্তব্য - হিমন্ত বিশ্বশর্মার মন্তব্য 'সাম্প্রদায়িক বিষ' - মত কপিল সিব্বলের

SUPPORT PEOPLE'S REPORTER

ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন

Related Stories

No stories found.
logo
People's Reporter
www.peoplesreporter.in