Assam: হিমন্ত বিশ্বশর্মার 'ঘৃণাসূচক' মন্তব্যের প্রতিবাদ - গুয়াহাটি হাইকোর্টের দ্বারস্থ বিশিষ্টজনেরা

People's Reporter: মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের বিরোধিতা করে লেখা ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, “সাংবিধানিক পদের শপথ লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে নীরবতা বা নিষ্ক্রিয়তা” “সংবিধানের নৈতিক কর্তৃত্বকেই ক্ষুণ্ণ করতে পারে”।
আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা
আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মাফাইল ছবি সংগৃহীত
Published on

আসামের মুখ্যমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা হিমন্ত বিশ্বশর্মার উস্কানিমূলক বক্তৃতার প্রতিবাদে আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, লেখক এবং অবসরপ্রাপ্ত আমলাসহ ৪০ জনেরও বেশি বিশিষ্ট নাগরিক। এক নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের প্রতি মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার সাম্প্রতিক এবং ধারাবাহিক মন্তব্যের উল্লেখ করে চিঠিতে গুয়াহাটি হাইকোর্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে এবং স্বতঃপ্রণোদিত ব্যবস্থা নেবার আহ্বান জানানো হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, “সাংবিধানিক পদের শপথ লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে নীরবতা বা নিষ্ক্রিয়তা” “সংবিধানের নৈতিক কর্তৃত্বকেই ক্ষুণ্ণ করতে পারে”।

বৃহস্পতিবার গুয়াহাটি হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি আশুতোষ কুমারের কাছে লেখা চিঠিতে বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দ হিমন্ত বিশ্ব শর্মার জনসমক্ষে ধারাবাহিকভাবে দেওয়া কিছু মন্তব্যের প্রতি হাইকোর্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করে জানিয়েছেন, “আপাতদৃষ্টিতে যে বক্তব্য বিদ্বেষমূলক, প্রাপ্ত ক্ষমতার অপব্যবহার এবং এক নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের প্রতি প্রকাশ্য কুৎসার শামিল”।

তাঁরা জানিয়েছেন, বাংলাভাষী মুসলিমরা ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে “বৃহত্তর অসমীয়া সমাজের অংশ” হয়ে উঠেছে এবং তাঁদের প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য “অমানবিক, সম্মিলিত কলঙ্ক আরোপ এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হুমকির মতো সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ সীমার মধ্যে প্রবেশ করেছে”।

এক্ষেত্রে তাঁরা ‘মিয়াঁ’ শব্দটির উল্লেখ করে জানিয়েছেন, ‘মিয়া’ শব্দটি মূলত আসামের বাংলাভাষী মুসলমানদের জন্য ব্যবহৃত একটি অবমাননাকর শব্দ এবং অহমিয়াভাষী মানুষজন সাধারণত তাদের বাংলাদেশি অভিবাসী হিসেবে চিহ্নিত করে। সাম্প্রতিক কিছু বছরে কিছু মানুষ প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে এই শব্দটি ব্যবহার করতে শুরু করেছেন।

নাগরিকরা দাবি করেছেন, শর্মা “শারীরিক ক্ষতি, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং সামাজিক অবমাননার জন্য উস্কানি” দিয়েছেন। বিশেষ করে বাংলাভাষী মুসলিম চালিত রিকশার প্রকৃত ভাড়ার চেয়ে কম ভাড়া দেওয়ার জন্য জনগণকে আহ্বান জানানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। চিঠিতে প্রকাশ্য সভায় মুখ্যমন্ত্রী দেওয়া বিবৃতির উল্লেখ করা হয়েছে যেখানে তিনি বলেছিলেন, “যে কেউ পারে, যেভাবেই হোক মিয়াঁদের কষ্ট দিতে হবে। যদি আপনি রিকশায় চড়েন, যদি ভাড়া ৫ টাকা হয়, তাহলে তাদের ৪ টাকা দিন।”

চিঠিতে ৪৩ জন স্বাক্ষরকারীর মধ্যে আছেন শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবী হিরেন গোহাঁই, প্রাক্তন ডিজিপি হরেকৃষ্ণ ডেকা, গুয়াহাটির প্রাক্তন আর্চবিশপ টমাস মেনামপারাম্পিল, রাজ্যসভার সাংসদ অজিত ভুঁইয়া, পরিবেশ বিজ্ঞানী দুলাল চন্দ্র গোস্বামী, আসাম মেডিকেল কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ টি আর বরবরা, আইনজীবী শান্তনু বোরঠাকুর, জয়েন্ট কাউন্সিল অফ ট্রেড ইউনিয়নের যুগ্ম আহ্বায়ক গর্গ তালুকদার এবং সাহিত্যিক অরূপা পতঙ্গিয়া কলিতা।

এই চিঠিতেই আসামে চলমান ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধনীর (Special Revision – SR) কথা উল্লেখ করেছেন। যেক্ষেত্রে মুসলিমদের লক্ষ্য করে আপত্তি জানানোর জন্য তিনি বিজেপির কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন বলে চিঠিতে জানানো হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, “এসআর-এর মতো সাংবিধানিকভাবে বাধ্যতামূলক এবং আধা-বিচারিক এক প্রক্রিয়াকে মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে কোনো দলীয় বা সাম্প্রদায়িক কার্যকলাপে রূপান্তরিত করা যায় না”। নির্বাচন কমিশনকে বিষয়টি জানানো সত্ত্বেও তারা কোনও ব্যবস্থা নেয়নি বলে ওই চিঠিতে দাবি করা হয়েছে।

চিঠিতে সাংবিধানিক শপথ লঙ্ঘনের কথা উল্লেখ করে জানানো হয়েছে, “সংবিধানের ১৬৪(৩) অনুচ্ছেদের অধীনে, মুখ্যমন্ত্রী সংবিধানের প্রতি প্রকৃত বিশ্বাস ও আনুগত্য বজায় রাখার এবং ভয় বা অনুগ্রহ, স্নেহ বা বিদ্বেষ ছাড়াই কর্তব্য পালনের শপথ নেন। দুর্ভোগ, অর্থনৈতিক বঞ্চনা, কঠোর তদন্ত এবং বর্জন করার জন্য প্রকাশ্যে কোনও ধর্মীয় সম্প্রদায়কে চিহ্নিত করা এই শপথের সাথে মৌলিকভাবে অসঙ্গত। এই ধরনের আচরণ কেবল রাজনৈতিক অনৈতিকতা নয় বরং একজন সাংবিধানিক কর্মকর্তার দ্বারা সাংবিধানিক রীতি লঙ্ঘন। তারা আরও দাবি করেছেন যে শর্মার বিবৃতি ধর্মনিরপেক্ষতার পরিপন্থী, যা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশ।

ঘৃণাসূচক বক্তব্য প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের একাধিক নির্দেশ উল্লেখ করে ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, “মাননীয় সুপ্রিম কোর্ট বারবার নিশ্চিত করেছে যে ধর্মনিরপেক্ষতা সংবিধানের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য, বিশেষ করে এস আর বোম্মাই বনাম ভারত ইউনিয়ন, অভিরাম সিং বনাম সিডি কমাচেন এবং অরুণা রায় বনাম ভারত ইউনিয়ন মামলায়। ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকদের বিশেষাধিকার বা পক্ষপাতদুষ্ট করার জন্য রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা প্রয়োগ করা যাবে না, এবং সাম্প্রদায়িক বিবেচনার মাধ্যমে শাসনব্যবস্থাকে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। … এই বিশেষ পরিস্থিতিতে, আমরা শ্রদ্ধার সাথে বলতে চাই যে এটি মাননীয় আদালতের জন্য স্বতঃপ্রণোদিত এখতিয়ার প্রয়োগের উপযুক্ত মামলা।”

আসামের বুদ্ধিজীবীদের লেখা এই চিঠি প্রসঙ্গে বিশিষ্ট সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদব এক এক্স বার্তায় জানিয়েছেন, "হীরেন গোহাইনের নেতৃত্বে আসামের ৪৩ জন শীর্ষস্থানীয় লেখক, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী এবং সমাজকর্মী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন এবং মিয়া সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে তাঁর বারবার বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, ভোটার তালিকা সংশোধনে নির্বাহী হস্তক্ষেপ এবং বিভিন্ন সাংবিধানিক লঙ্ঘনের বিষয়ে স্বতঃপ্রণোদিত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য গুয়াহাটি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন।" "আসামে লেখকদের একটি অনন্য অবস্থান রয়েছে, যা বহিরাগতদের পক্ষে বোঝা কঠিন। তাঁরা অসমীয়া সমাজের বিবেক। তাঁরা মুখ্যমন্ত্রীর সেইসব জঘন্য মন্তব্যের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন যা রাজ্যকে কলঙ্কিত করতে পারে। তাঁদের অনেকের সাথে পরিচিত হতে পেরে আমি গর্বিত।"

আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা
Assam: মহিলাদের বিরুদ্ধে 'নিম্ন রুচি'র মন্তব্য - হিমন্ত বিশ্ব শর্মার বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ কংগ্রেসের
আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা
Assam: বেসরকারি সংস্থাকে ৩০০০ বিঘা জমি বরাদ্দ! আসামের BJP সরকারের সিদ্ধান্তে বিস্মিত হাইকোর্ট

SUPPORT PEOPLE'S REPORTER

ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন

Related Stories

No stories found.
logo
People's Reporter
www.peoplesreporter.in