দেড়শো বছরের বেশি সময় ধরে চলা (১৮৭৭ সালের ৬ ডিসেম্বর থেকে প্রকাশিত) বিশ্বের খ্যাতনামা সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোষ্ট (The Washington Post) থেকে ছাঁটাই করা হল কমপক্ষে ৩০০ সাংবাদিককে। বুধবারের এই ছাঁটাই প্রক্রিয়ায় বাদ দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি, ক্রীড়া সাংবাদিক এবং স্থানীয় সাংবাদিকদের। সংস্থার মোট কর্মী বাহিনীর ৩০ শতাংশ কর্মীকে ছাঁটাই করা হয়েছে। বর্তমানে এই সংস্থার মালিক ধনকুবের জেফ বেজোস (Jeff Bezos)।
দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ছাঁটাই থেকে বোঝা যায়, ইন্টারনেট ব্যবহার করে পণ্য বিক্রি করে বিশ্বের অন্যতম ধনী ব্যক্তিতে পরিণত হওয়া জেফ বেজোস এখনও ইন্টারনেট ভিত্তিক একটি লাভজনক প্রকাশনা কীভাবে তৈরি করতে এবং পরিচালনা করতে হয় তা বুঝে উঠতে পারেননি। তাঁর মালিকানার প্রথম আট বছরে এই সংস্থা প্রসারিত হলেও বর্তমানে তা ঠিকভাবে চলছে না।
কী বলছেন কর্মীরা ?
ওয়াশিংটন পোষ্ট-এর কায়রোর ব্যুরো চিফ ক্লেয়ার পার্কার নিজের এক্স হ্যান্ডেলে এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, “ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে আমাকে, মধ্যপ্রাচ্যের সমস্ত সংবাদদাতাদের এবং আমাদের সম্পাদকদেরও ছাঁটাই করা হয়েছে। এর পেছনের যুক্তি বোঝা কঠিন। তবে আমি আমার অসাধারণ সহকর্মীদের জন্য কৃতজ্ঞ, যাদের দৃঢ়তা এবং সাংবাদিকতা ও একে অপরের প্রতি নিষ্ঠাকে আমি তাঁদের অভাব অনুভব করব।”
কোন কোন বিভাগে ছাঁটাই?
সাম্প্রতিক কয়েকবছরে, বারবার নিউজ রুমে কর্মী ছাঁটাই করেছে ওয়াশিংটন পোষ্ট। এর আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সানডে ম্যাগাজিন। কর্মী সংখ্যা কয়েকশ কমানো হয়েছে। মেট্রো ডেস্কের কর্মীও প্রায় অর্ধেক করে ফেলা হয়েছে।
বুধবার কার্যনির্বাহী সম্পাদক ম্যাট মারে এবং মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান ওয়েন কনেল একভার্চুয়াল বৈঠকে নিউজ রুমের কর্মীদের জানান, ক্রীড়া বিভাগ এবং বই বিভাগ বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। বন্ধ করা হচ্ছে জনপ্রিয় পডকাস্ট শো। আন্তর্জাতিক ও মেট্রো বিভাগকে ছোটো করা হচ্ছে। এছাড়াও সব বিভাগজুড়ে ব্যাপক সংখ্যায় কর্মী ছাঁটাই করা হচ্ছে।
জেফ বেজোস এবং ওয়াশিংটন পোষ্ট
২০১৩ সালে ২৫ কোটি ডলারের বিনিময়ে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট কিনেছিলেন জেফ বেজোস। এর ফলে গ্রাহাম পরিবারের কয়েক দশকের মালিকানার অবসান ঘটে। এর পরে ডিজিটাল যুগের উপযোগী করে পত্রিকাটিকে গড়ে তুলতে বিনিয়োগ করেন বেজোস। তৈরি করা হয় ডিজিটাল পরিকাঠামো, মোবাইল প্ল্যাটফর্ম এবং অডিয়েন্স অ্যানালিটিক্স ব্যবস্থা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের সময় এটি কিছু সময়ের জন্য লাভজনকও ছিল, যখন পাঠকরা পোস্টের রাজনৈতিক প্রতিবেদনের উপর নির্ভর করতেন। সেই সময় পত্রিকাটি একটি নতুন স্লোগান চালু করে — যা বেজোস ব্যাপকভাবে প্রচার করেছিলেন — “গণতন্ত্র অন্ধকারে মারা যায়”।
যদিও ২০২৪ সাল থেকে তাঁর অবস্থানের পরিবর্তন ঘটে এবং পাঠকমহলে তার প্রভাব পড়ে। এই সময়েই দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ভেঙে সম্পাদকীয় পাতার ওপর নিয়ন্ত্রণ জারি করা হয় এবং কার্যত ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সমর্থনের দিকে ঝুঁকে পড়েন জেফ বেজোস।
কর্মী ইউনিয়নের বক্তব্য
বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটন পোস্টের সদর দপ্তরের বাইরে কয়েকশ সাংবাদিককে ছাঁটাই করার প্রতিবাদে কয়েকশ মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। এঁদের মধ্যে বহু বিদেশী কর্মীও ছিলেন।
ছাঁটাইয়ের পর সংস্থার কর্মীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন পোস্ট গিল্ড বৃহস্পতিবার পত্রিকাটির সদর দপ্তরের বাইরে একটি সমাবেশ করেছে। ইউনিয়নের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, “এই ছাঁটাই অনিবার্য নয়। কোনো নিউজ রুমকে তার বিশ্বাসযোগ্যতা, পাঠকসংখ্যা এবং ভবিষ্যতের কোনো পরিণতি ছাড়াই অন্তঃসারশূন্য করে তোলা যায় না। যদি জেফ বেজোস সেই লক্ষ্যে আর বিনিয়োগ করতে না চান, শতাব্দী ধরে যে ঐতিহ্য এই পত্রিকাকে সমৃদ্ধ করেছে এবং ওয়াশিংটন পোস্টের সাংবাদিকতার ওপর নির্ভরশীল লক্ষ লক্ষ মানুষের সেবা করতে না চান, তবে পোস্ট এমন একজন তত্ত্বাবধায়ক পাওয়ার যোগ্য যিনি তা করবেন।"
বিক্ষোভকারীরা বলেন, “অন্ধকারে গণতন্ত্রের মৃত্যু হয়। আর আপনি, জেফ বেজোস, আলো নিভিয়ে দিলেন।” বিক্ষোভের একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, যা সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠার স্লোগান এবং এর বিলিয়নেয়ার মালিকের কথা উল্লেখ করে। প্রসঙ্গত, রিপাবলিকানদের দ্বিতীয় মেয়াদে রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন জেফ বেজোস। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ট্রাম্পের তীব্র চাপের মুখোমুখি হচ্ছে, যিনি নিয়মিতভাবে সাংবাদিকদের “ভুয়ো খবর” বলে অবজ্ঞা করেন এবং সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমের ওপর একাধিক মামলা দায়ের করেছেন।
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন