TMC: ২১ জুলাইয়ের বার্তা: তিন টুকরো তৃণমূলে আপাতত এগিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়

People's Reporter: তিন টুকরো তৃণমূলের সকলেই নিজেকে ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি করলেও ২১ জুলাইয়ের লড়াইয়ের পর এটা স্পষ্ট তৃণমূলের তিন গোষ্ঠীর মধ্যে আপাতত ‘অ্যাডভান্টেজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়’।
বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়মের পাশের রাস্তায় সমাবেশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়মের পাশের রাস্তায় সমাবেশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছবি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত
Published on

মরা বাজারেও তিনিই যে তৃণমূলের শেষ কথা তা আরও একবার প্রমাণ করে দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গত ৪ মে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলে দলের পরাজয় এবং তারপর নিজের গড়ে তোলা দল টুকরো টুকরো হয়ে যাবার পরেও এখনও তাঁর প্রতিই আস্থা রেখেছেন বেশ কিছু মানুষ। তিন টুকরো তৃণমূলের সকলেই নিজেকে ‘আসল তৃণমূল’ বলে দাবি করলেও ২১ জুলাইয়ের লড়াইয়ের পর এটা স্পষ্ট তৃণমূলের তিন গোষ্ঠীর মধ্যে আপাতত ‘অ্যাডভান্টেজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়’।

এটা ঠিক যে, ২১ জুলাই ‘শহিদ স্মরণ’ কর্মসূচি অনেকদিন আগেই ‘বাৎসরিক উৎসবে’ পরিণত হয়েছিল। ‘পাগলু ড্যান্স’ থেকে ‘ডিম্ভাত’, দেদার মদ থেকে ফেলে ছড়িয়ে খাওয়া বিরিয়ানির প্যাকেট দিয়েই শেষ কয়েক বছর ২১ জুলাই পালিত হয়েছে। ইচ্ছে না থাকলেও বহু মানুষ বাধ্য হয়েছেন ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে হাজিরা দিতে। মঞ্চ আলো করে থেকেছেন উঠতি থেকে প্রথিতযশারা। আড়ালে চলে গেছেন শহিদদের পরিবার। তৃণমূলের নেতা কর্মীরা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যেমন ফুলে ফেঁপে উঠেছেন তেমনই কলেবরে বেড়েছে ২১ জুলাইয়ের অনুষ্ঠান। সঙ্গে সঙ্গেই বেড়েছিল অন্তঃসারশূন্যতাও।

যদিও এবারের ২১ জুলাই সম্পূর্ণ আলাদা। তৃণমূল তিন টুকরো। তৃণমূল কা, তৃণমূল ঋ আর তৃণমূল ম। এরমধ্যে কোনটা আসল তৃণমূল তা নিয়ে বিস্তর বিতর্ক। দাবিদার তিন গোষ্ঠীই। সকলেই আসল তৃণমূল। কেউ দাবিদার দলের নাম ও প্রতীকের, কেউ দাবিদার তহবিলের আবার কেউ কেউ দাবিদার অন্য কিছুর। এসবের মাঝে পড়েও পাঞ্জা কষে চেনা জায়গা থেকে সরে গিয়ে অন্য জায়গায় সফল ভাবে ২১ জুলাই পালন খুব একটা কম কথা নয়। কারণ এটা তো সত্যি যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই মুহূর্তে ঢাল তরোয়ালহীন নিধিরাম সর্দার ছাড়া আর কিছুই নয়। সে রাজ্যও নেই, সে রাজপাটও নেই। নেই সেই জো হুজুরের দল। রাজ্যকে গত পনেরো বছর ধরে শূন্য করতে গিয়ে তিনি নিজেই যে একটি আস্ত শূন্যে পরিণত হয়েছেন তা হয়তো পতনের আগের মুহূর্ত পর্যন্ত বোঝেননি।

তাই ভোটে ৮০ জন বিধায়ক জিতলেও আজ তাঁর সঙ্গে হাতে গোনা ৬ থেকে ৮ জন অবশিষ্ট আছেন। দলের ২৮ জন লোকসভা সাংসদ থাকলেও বিপদের গন্ধ পেয়ে আগেভাগেই ২০ জন কেটে পড়েছেন। একইভাবে রাজ্যসভা সাংসদদেরও একটা অংশ সরাসরি পিঠ দেখিয়েছেন। এছাড়াও তাঁর দীর্ঘ দিনের বিশ্বস্ত, অতি ঘনিষ্ঠ বৃত্তও প্রায় শূন্য হয়ে গেছে। যে শিল্পী, সাহিত্যিক, কবি, চিত্রকররা গত পনেরো বছর ধরে তাঁর স্তুতি গাইতেই ব্যস্ত ছিলেন তাঁরাও বেমালুম বেপাত্তা। এতদিন অনেকেই নাকি ভয়ে কথা বলতে পারেননি। আর আজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশ থেকে ক্ষমতাটা সরে যেতেই তাঁরা সব ভয়ংকর রকমের প্রতিবাদী হয়ে উঠেছেন।

অথচ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবস্থা ২০০৪ সালেও এতটা খারাপ ছিলনা। যেবার লোকসভা নির্বাচনে একমাত্র তিনি ছাড়া তৃণমূলের আর কেউ জয়ী হতে পারেনি। তিনিই সেবার একা কুম্ভ হয়ে দক্ষিণ কলকাতা রক্ষা করেছিলেন। কিন্তু সেই চরম বিপর্যয়ের পরেও তাঁর পাশে ছিলেন বহু নেতা কর্মী সমর্থক। যা এবার কার্যত তলানিতে ঠেকেছে। ভোটের ফলে নিজে এবং তাঁর দলের হারের পর তিনি দেখেছেন, যাঁদের হাতে ধরে রাজনীতিতে নিয়ে এসেছেন, সেইসব অরাজনৈতিক মানুষজনও বিধায়ক সাংসদ হয়ে এখন বড়ো বড়ো রাজনীতিবিদে পরিণত হয়েছে। তারাই আঙুল তুলেছে তাঁর দিকেই। এ পরিণতি বোধহয় হবারই ছিল। তিনি ডুবেছেন স্বখাত সলিলে।

তবুও এত কিছুর পরেও এবারের ২১ জুলাই তাঁর সামনে একটা বড়ো চ্যালেঞ্জ ছিল। যে চ্যালেঞ্জ হয়তো বা নিজের কাছেই নিজেকে প্রমাণ করার। হারতে হারতে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পরেও ঘুরে দাঁড়ানোর শেষ চেষ্টা। ঘনিষ্ঠ বৃত্তের সরে যাওয়ার পরেও ঠিক কে কে সঙ্গে আছে তা দেখে নেবার। জনসমর্থন আজও কিছুটাও আছে কিনা তা মেপে নেবার। রাস্তায় বেরোলো চালু ট্রেন্ড অনুসারে কেউ ডিম ছুঁড়বে কিনা সেটাও দেখে নেওয়ার।

না। এগুলোর কোনোটাই ঘটেনি। কোনও জায়গা থেকেই ‘চোর চোর’ স্লোগানও ওঠেনি বা কেউ ডিমও ছোড়েনি। উল্টে তৃণমূলের তিন গোষ্ঠীর মধ্যে তাঁর সমাবেশেই সবথেকে বেশি ভিড় হয়েছে এই চরম দুঃসময়েও। অর্থাৎ নেতারা পাশ থেকে দুঃসময় দেখে সরে গেলেও কর্মীদের কিছু অংশ এখনও তাঁর সঙ্গেই আছেন। এই কর্মী বাহিনী দিয়ে কতটা লড়াই করা যাবে, তিনি আদৌ ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন কিনা সেটা পরের প্রশ্ন। কিন্তু তাঁর তৈরি তৃণমূল ভাঙিয়ে নিজেদের আসল তৃণমূল বলে দাবি করলেও সাধারণ মানুষ যে অন্য গোষ্ঠীর সঙ্গে নেই তা স্পষ্ট। সরল পাটিগনিতের হিসেবেই তৃণমূলের ঋতব্রত শিবিরের ৬০ থেকে ৬৫ জন বিধায়ক গড়ে এক হাজার করে লোকের জমায়েত করতে পারলেই তো আজ মেয়ো রোড জনজোয়ারে পরিণত হত। কিন্তু সেই সমাবেশে উপস্থিতির করুণ দশা এটা প্রমাণ করে দিয়েছে বিধানসভায় বিরোধী দলের তকমা পেলেও রাজ্যের মানুষ তাদের বিরোধী হিসেবে অন্তত আজকের দিনের জন্য মনে করেনি।

তৃণমূলের তৃতীয় গোষ্ঠী, অর্থাৎ তৃণমূলের প্রতীকে এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমর্থনে জয়ী ২০ জন লোকসভার সাংসদ যেহেতু এখন আর অফিসিয়ালি তৃণমূল নয়, এনসিপিআই হয়ে গেছে, তাই এবার তাদের কোনও দায় ছিলো না ২১ জুলাই পালন করার। তবুও তারা দিল্লিতে বসে তাদের মত করে ২১ জুলাই পালন করেছে। সেখানে তাদের জমায়েত করে শক্তি দেখানোর কোনও প্রয়োজন ছিল না। তারা সেরকম কোনও উদ্যোগ নেননি। ফলত শহিদ মিনারে প্রদেশ কংগ্রেসের ২১ জুলাই বাদ দিলে লড়াই সরাসরি ছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের। সেই ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, যাকে কার্যত তৃণমূলে পুনর্বাসন দিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দিনের শেষে একথা বলতে দ্বিধা নেই, পরীক্ষায় ডাহা ফেল করেছেন ঋতব্রত, অন্যদিকে বুড়ো হাড়ে ভেল্কি দেখিয়ে ম্যাচ জিতে নিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। হ্যাঁ। তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা হাজারো অভিযোগ থাকলেও।

রাজ্য রাজনীতি আগামী দিনে কোন পথে এগোবে তা স্পষ্ট নয়। তবে ২১ জুলাই মঙ্গলবার কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বের তিন সভাকে যদি উপস্থিতির নিরিখে এবং ধারে ও ভারে সাদা চোখে বিচার করতে হয়, তাহলে কংগ্রেসের শহিদ মিনারের সমাবেশই দিনের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। কিন্তু তৃণমূলের তিন গোষ্ঠীর লড়াইয়ে ফল একেবারেই আলাদা। সেখানে আপাতত অ্যাডভান্টেজ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়মের পাশের রাস্তায় সমাবেশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
TMC: এক ২১ শে জুলাই – দাবিদার চার
বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়মের পাশের রাস্তায় সমাবেশে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
TMC: চেয়ারম্যান পদ থেকে অপসারিত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সাসপেন্ড অভিষেক, ঋতব্রত তৃণমূলে নতুন সমীকরণ

SUPPORT PEOPLE'S REPORTER

ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন

logo
People's Reporter
www.peoplesreporter.in