২১ শে জুলাইয়ের আসল মালিক কে? ২০২৬-এ রাজ্যে ক্ষমতা বদলের পর সেই প্রশ্নই এখন সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। এক ২১শে জুলাইকে ঘিরেই আপাতত চার দাবিদার। তাই আসল মালিক কে তা নিয়ে টানাপোড়েন অব্যাহত। কার্যত নজিরবিহীন ভাবে এবার কলকাতা সাক্ষী থাকবে নয় নয় করে তিন তিনটি ২১শে জুলাই কর্মসূচীর। আবার শোনা যাচ্ছে দিল্লিতেও অন্য এক রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে ২১ শে জুলাই পালন করা হবে। অর্থাৎ মোট চারটি আলাদা আলাদা রাজনৈতিক দল আলাদা আলাদা ভাবে পালন করতে চলেছে ২১শে জুলাই।
এখনও পর্যন্ত যা জানা গেছে তাতে খোদ কলকাতাতেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে তিনটে ২১ জুলাইয়ের সমাবেশ। যার একটা মমতাপন্থী তৃণমূলের। বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়মের সামনে। দ্বিতীয়টা তৃণমূল ঋতব্রতর – মেয়ো রোডে। এই দুই দলই আবার নিজেদের আসল তৃণমূল বলে দাবি করছেন। দলীয় সমর্থকরা ছবি ও সই দেখে সমাবেশে যাবেন নাকি রেজিস্টার্ড নাম্বার দেখে তা ২১ জুলাইতেই বোঝা যাবে। তবে কর্মী সমর্থকরা যে সমাবেশেই যান না কেন, অতীতে ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনের সমাবেশে যে জনসমাগম হত এবার মেয়ো রোড এবং বিড়লা প্ল্যানেটোরিয়েম মিলিয়েও সেই জনসমাগম হবার সম্ভাবনা কম। যা কিছু কখনই বামেদের বেলায় হয়নি। ২০১১-র পর থেকে এযাবৎকালে বামেরা যতগুলো ব্রিগেড করেছে তার প্রত্যেকটাতেই ভিড় হয়েছে আশাতীত।
এই দুই সমাবেশ ছাড়া তৃতীয় কর্মসূচি হবে তৃণমূলের লোকসভার সাংসদদের বিক্ষুব্ধ অংশ থেকে। যারা অবশ্য এখন আর তৃণমূল নয়। এনসিপিআই। ইতিমধ্যেই তাঁরা সর্বদলীয় বৈঠকে ডাক পেয়েছেন এবং মহারাষ্ট্রের ঘটনার গতিপ্রকৃতি থেকে অনুমান করা যায় তাঁরাও আলাদা দল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে যাবে। তাই এখন তৃণমূলে না থেকেও প্রাক্তন এই ২০ জন তৃণমূল সাংসদ দিল্লিতে ২১ জুলাই কর্মসূচি পালন করবেন।
এছাড়াও কলকাতার শহিদ মিনার ময়দানে পালিত হবে চতুর্থ কর্মসূচি। কংগ্রেসের তরফে। অতীতে কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বারবারই অভিযোগ করা হয়েছে, ২১ জুলাইয়ের কর্মসূচি তাদের হাত থেকে তৃণমূল বহু আগেই রাজনৈতিকভাবে হাইজ্যাক করে নিয়েছিল। কারণ ১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই তৃণমূল বলে কোনও দল ছিলনা আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও সেই সময় কংগ্রেস নেত্রী ছিলেন। সেদিনের ঘটনায় যাঁদের মৃত্যু হয়েছিল তাঁরাও কংগ্রেস কর্মী ছিলেন। যদিও পরবর্তী সময়ে দলীয় কর্মসূচি হাইজ্যাক হয়ে যাওয়ায় পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেস তাদের ২১ জুলাই স্মরণ অনুষ্ঠান বিধান ভবনের পরিসরেই আটকে রেখেছিল। চলতি বছরে রাজ্যে রাজনৈতিক ডামাডোলের বাজারে যে কর্মসূচি আবার রাস্তায় বেরিয়েছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমল থেকেই ২১শে জুলাইয়ের ‘শহিদ স্মরণ’ কর্মসূচি কার্যত দলীয় বাৎসরিক পিকনিকে পরিণত হয়েছিল। ২০১১তে ক্ষমতায় আসার পর ‘পাগলু ড্যান্স’ দিয়ে যার শুরু। পরবর্তী সময়ে বছর বছর বাহুল্য এবং আড়ম্বড়ে ‘শহিদ স্মরণ’ কর্মসূচি কার্যত উৎসবে পরিণত হয়ে গেছিল। যা নিয়ে আড়ালে আবডালে কড়া সমালোচনাও হয়েছে। সমালোচনা করতে ছাড়েনি কংগ্রেসও। এবারের পরিস্থিতি যদিও সম্পূর্ণ আলাদা। যেখানে কোনও উৎসব নয়, কর্মসূচি সফল করে নিজেকে প্রমাণ করার তাগিদ বর্তমানে সব শিবিরেরই।
৪ মে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পরেই তৃণমূলের করে কম্মে খাওয়ার সংসারে ভাঙন ধরে। যদিও ভোট প্রাপ্তি বা আসন সংখ্যার নিরিখে খুব একটা খারাপ অবস্থায় ছিল না। ক্ষমতা হারিয়েও ৮০ টি আসনে জয় পেয়েছিল তৃণমূল। ভোট শতাংশও ছিল ৪১ শতাংশের কাছাকাছি। তৃণমূলের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন ২ কোটি ৬০ লক্ষের বেশি মানুষ। এছাড়াও লোকসভা, রাজ্যসভা মিলে সাংসদের সংখ্যা ছিল নজরকাড়া। তবুও কালীঘাটের ওপর দিয়ে তার পরের মাত্র কয়েকদিনে যে ‘আমফান’ বয়ে গেল সেই ধাক্কায় চুরমার হয়ে গেল তৃণমূলের প্রাসাদ। এখন খন্ড বিখন্ড তৃণমূলের মালিকানা নিয়ে আদালতের চক্কর।
বর্তমানে নিন্দুকেরা ‘ভালো তৃণমূল’, ‘খারাপ তৃণমূল’, ‘বিবেক জাগ্রত হওয়া তৃণমূল’ ইত্যাদি নানা নামে নানা গোষ্ঠীকে ভূষিত করছে। দলের সর্বভারতীয় সভাপতিকে রাস্তায় বেরিয়ে ডিম ছোঁড়া খেতে হয়েছে। আদালতে গিয়ে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা ‘প্রাক্তন গোটা তৃণমূলের’ সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে শুনতে হয়েছে ‘চোর চোর’, ‘গো ব্যাক’ স্লোগান। এটা কতটা তৈরি করা অথবা কতটা স্বতঃস্ফূর্ত সে বিতর্কে যাচ্ছি না। কিন্তু ঘটনাগুলো ঘটেছে। সোশ্যাল মিডিয়া, মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার দৌলতে তা মুহূর্তে ছড়িয়ে গেছে রাজ্যের প্রতিটি প্রান্তে।
এরপরেই তৃণমূলের প্রথম বিদ্রোহ, তারপর দ্বিতীয় বিদ্রোহ এবং শেষে তৃতীয় বিদ্রোহ। একের পর এক ধাক্কা। বিধানসভায় আশ্চর্যজনক ভাবে প্রায় ৬০ জন বিধায়কের বিদ্রোহ, লোকসভায় ১৬ থেকে ১৮ জনের বিদ্রোহ এবং রাজ্যসভায় ৩ জনের বিদ্রোহ। বিদ্রোহের ত্র্যহস্পর্শে ৪ মে-র আগে পর্যন্ত হাতে মাথা কাটা তৃণমূল মাত্র দেড় মাসে তিন টুকরো তৃণমূল। আদি তৃণমূল বা তৃণমূল মমতা পন্থী, বিধানসভার তৃণমূল বা তৃণমূল ঋতব্রত পন্থী এবং তৃণমূল কাকলী-শতাব্দী বা সংসদীয় তৃণমূল। রাজ্যসভা থেকে আবার প্রথম যে তিন তৃণমূল সাংসদ দল থেকে এবং রাজ্যসভা সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন তারা সরাসরি বিজেপিতে যোগ দিয়ে নতুন করে সাংসদও হয়ে গেছেন।
সে যাই হোক না কেন তৃণমূলের এই দফায় দফায় ভাঙনে বিজেপির যে গোপন আশীর্বাদ ছিল তা এখন আর কারও অজানা নেই। কারণ লোকসভার, রাজ্যসভার সাংসদরা এবং বিধানসভার বিধায়করা প্রত্যেকেই কী দিল্লিতে, কী কলকাতায় দল ভাঙাভাঙির পর প্রকাশ্যেই বিজেপি নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সংসদীয় দলকে যেমন বৈঠক করতে দেখা গেছে নিশিকান্ত দুবে, ভূপেন্দ্র যাদব, অমিত শাহর সঙ্গে। আবার রাজ্যের ক্ষেত্রে বৈঠক হয়েছে মুখ্যমন্ত্রী এবং অন্যান্য বিজেপি নেতৃত্বের সঙ্গে। এখন সে বৈঠক যদি নিছক সৌজন্যের হয়ে থাকে তাহলে বলার কিছু নেই। তবে বিষয়টা যেহেতু রাজনীতি তাই মনের কোনে সবসময়েই সন্দেহ উঁকি দেয়।
এরকমটা ভেবে নেবার কোনও কারণ নেই যে ভাগাভাগি শুধু সাংসদ, বিধায়ক, পরাজিত বিধায়ক, কাউন্সিলর, পঞ্চায়েত সদস্যদের মধ্যেই হয়েছে। ভাগাভাগি হয়েছে তৃণমূলের সর্বস্তরে। কর্মী, সমর্থকরাও আড়াআড়ি বিভক্ত। কে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে আর কে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে তা স্পষ্ট নয়। তাই এই মুহূর্তে জোর করে কেউ বলতে পারছেন না তাদের কর্মসূচিতে কত লোক হবে। বর্তমানে কলকাতায় তৃণমূলের যুযুধান যে দুই শিবির – সেই দুই পক্ষই বেশি করে জমায়েত করার চেষ্টা করবে সর্বশক্তি দিয়ে। কংগ্রেসের অবশ্য এই চাপ নেই। তাদের নিজস্ব যে পকেট আছে তা দিয়েই শহিদ মিনার মোটামুটি ভরিয়ে দেওয়া যাবে।
আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূল আদৌ প্রাসঙ্গিক থাকবে কিনা, থাকলেও কোন গোষ্ঠী কতটা প্রাসঙ্গিক থাকবে তার একটা প্রাথমিক ধারণা ২১ জুলাইতেই হয়ে যাবে। পরবর্তী ধারণা স্পষ্ট হবে কলকাতা ও হাওড়ার পুরসভা নির্বাচনে। যা এই বছরেই হয়ে যাবার কথা। তাই এবারের ২১ জুলাই এক অর্থে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়দের নিজেদের প্রমাণ করার লড়াই। সেই লড়াইয়ে কে শেষ হাসি হাসবেন তা আপাতত বোঝা যাবে আগামী ২১শে জুলাই।
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন