৭৯ বছর পূর্তি। ৮০ তম স্বাধীনতা দিবস। যে দিন নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা, কাটাছেঁড়া সবকিছুই অতীতে হয়েছে, বর্তমানে হচ্ছে, ভবিষ্যতেও হবে। ঘুরে ফিরে প্রতিবছরই এই দিনে চাওয়া পাওয়ার হিসেবে মেলাতে বসেন অনেকেই। কী চেয়েছিলাম, কী পেলাম, কেমন ছিলাম, কেমন আছি এসব বিতর্ক আজ বরং থাক। মানুষের দেখা, শোনা, বোধ-এর ধারণাগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে যায়। তাই একজন নবতিপর বা অশীতিপরের চোখে স্বাধীনতা আর সদ্য কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পৌঁছানো একজনের চোখে স্বাধীনতা বিষয়টা কখনই একরকম হতে পারে না। বিতর্ক তাই ছিল, আছে, থাকবেও।
ঠিক যে সময়টার মধ্যে দিয়ে আমরা যাচ্ছি তা ভালো বা মন্দ এককথায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। দাঁড়িপাল্লায় বসিয়ে হিসেব করতে গেলে যে কোনো দিকেই তা ঝুঁকে পড়তে পারে। হ্যাঁ, এই ভাবনা অবশ্যই মানুষে মানুষে আলাদা হবে। কারণ প্রতিটি মানুষই তো ভিন্ন ভিন্ন ভাবে ভাবতে অভ্যস্ত। আমাদের সংবিধান তো আমাদের সব নাগরিককেই মত প্রকাশের স্বাধীনতা দিয়েছে, বাক স্বাধীনতা দিয়েছে। তাই যে কোনও বিষয় নিয়ে নতুন ভাবে, আলাদা ভাবে ভাববার অধিকার আছে এই দেশের সব মানুষের। ‘আমাদের’ ভাবনা ‘ওদের’ পছন্দ না হলেও এই দ্বন্দ্ব আছে। দরকার ভিন্নমতকে সম্মান দেওয়া। যা হয়তো আজ বেশ কিছুটা পিছনের সারিতে। সে কারণেই মতের অমিল ঘটলেই বাজারে চলে আসে একাধিক বিশেষণ। যা ৮০ বছরের মাথায় দাঁড়িয়ে হয়তো কাম্য নয়।
স্বভাবসিদ্ধভাবেই মানুষ প্রতিবাদী হয়। কেউ সোচ্চারে প্রতিবাদ করে, কেউ বা অস্ফূটে। কিন্তু প্রতিবাদ সকলেই করে। এমনকি সব হ্যাঁ তে হ্যাঁ মিলিয়ে চলা মানুষজনও মাঝে মাঝে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। সেক্ষেত্রে অবশ্য সমষ্টির স্বার্থ যতটা না থাকে, তার চেয়ে অনেক বেশি জড়িত থাকে ব্যক্তিস্বার্থ। আর এ সবের বাইরে কিছু মানুষ সবসময়েই থাকেন যারা স্বভাবগতভাবে প্রতিবাদী চরিত্রের। সাদাকে সাদা, কালোকে কালো বলতে তাঁরা দ্বিধা করেননা কোনও সময়েই। কিন্তু সমস্যা এক জায়গাতেই। একটা দীর্ঘ সময় ভারতবাসী সহিষ্ণুতার পরিচয় দিলেও ইদানীং অসহিষ্ণুতা বেড়েছে অনেকটাই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। ভিন্নমতের প্রতি অনাস্থাই বা শোনা, দেখা, পড়া, বোঝার অভ্যেস চলে যাওয়াই হয়তো এর বড়ো কারণ। পনেরো বা তিরিশ সেকেন্ডের রিলস-এ অভ্যস্ত হয়ে ওঠা জনগোষ্ঠীর জ্ঞানপিপাসা যত কমছে ততই বোধহয় অসহিষ্ণুতা বাড়ছে।
কথা তো অনেক কিছু নিয়েই বলা যায়। হাঙ্গার ইন্ডেক্স, প্রেস ফ্রিডম ইন্ডেক্স, পভার্টি ইন্ডেক্স ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে শিক্ষা নিয়ে, স্বাস্থ্য নিয়ে, কর্ম সংস্থান নিয়ে, পরিবেশ রক্ষা নিয়ে। মানুষই তো প্রশ্ন তুলবেন তাঁদের রুটি, রুজি, কর্মসংস্থান নিয়ে। এসব বিষয়ে তথ্য, সমীক্ষা রিপোর্ট প্রকাশিত হবে, পক্ষে বিপক্ষে আলোচনা হবে এটাই তো সুস্থ গণতন্ত্রের লক্ষণ। প্রকৃত আলোচনা, মত বিনিময়ের মধ্যেই তো সুপ্ত থাকে অগ্রগতির বীজ। কিন্তু ৮০ বছরের স্বাধীনতা দিবসে দাঁড়িয়ে এ প্রশ্ন তো আমাদেরই করতে হবে যে যা হওয়া উচিত ছিল তা হচ্ছে কি? বোধহয় হচ্ছে না। কেন হচ্ছে না সেই আত্মসমালোচনা কে করবে? কারা করবেন?
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে যে কটা আন্দোলন হয়েছে, তা সে কৃষক আন্দোলন হোক অথবা শ্রমিক আন্দোলন কিংবা ছাত্র আন্দোলন তাতে বহু মানুষই স্বতঃস্ফূর্তভাবেই অংশ নিয়েছেন। নিজেদের দাবির পক্ষে সওয়াল করেছেন। সরকারী নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। গণতান্ত্রিক দেশে যা খুব স্বাভাবিক। মানুষ তো প্রতিবাদ জানাবেন, সংগঠিত হবেন, নিজেদের মত প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবেন। গণতন্ত্রে এই কাজ অন্যায় কবে থেকে হয়ে গেল? সাম্প্রতিক সময়ের সব আন্দোলনের ক্ষেত্রেই তো আন্দোলনের কারণ কী তা না খুঁজে, তার সমাধানের চেষ্টা না করে প্রশ্ন উঠেছে অন্যান্য বিষয় নিয়ে। কে করছে, কেন করছে, কোথা থেকে টাকা আসছে, কে আন্দোলনকারীদের খেতে দিচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি। অর্থাৎ মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে যে আন্দোলন করা, বিরুদ্ধ মত প্রকাশ করার অর্থই হল যে বা যারা এই কাজ করছে তারা 'দেশদ্রোহী'! গণতান্ত্রিক দেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলন কীভাবে দেশদ্রোহ হতে পারে? তাহলে কি মানুষের মত প্রকাশের অধিকার, নির্ভয়ে কথা বলার অধিকার ক্রমশ কমছে?
৭৯ বছর সময়টা বড়ো কম নয়। হ্যাঁ এটাও ঠিক যে নানা ভাষা, নানা মত, নানা পরিধানের দেশে সমস্যাও কম নয়। ভাষা বৈচিত্র্য, পোশাক বৈচিত্র্য, ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের এই দেশ, যে দেশে কয়েক কিলোমিটার অন্তরে সবকিছু বদলে যায় সেই দেশ তো যুগ যুগ ধরে বিবিধের মাঝে মহান মিলনের পথ খুঁজে এসেছে। এদেশের বুকেই ‘শক হুণ দল পাঠান মোগল’ এক দেহে লীন হয়েছে। সেই ঐতিহ্য, সেই সংস্কৃতিই আগামী ভারতের পথ চলার পাথেয় হোক। ১৪০ কোটি জনসংখ্যার ভারত আবার জগত সভায় শ্রেষ্ঠ আসন দখলের লক্ষ্যে আরও আরও আরও এগিয়ে চলুক। ‘হও উন্নত শির, নাহি ভয়’…
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন