Varanasi: মণিকর্ণিকায় বুলডোজার, পুনর্নির্মাণের নামে ভাঙা হচ্ছে ইতিহাস; প্রতিবাদে সরব রাজনৈতিক মহল

People's Reporter: বিক্ষোভকারীরা জানান, পুনর্নির্মাণের নামে মণিকর্ণিকা ঘাটের ঐতিহ্য নষ্ট করা হচ্ছে। ভাঙা হচ্ছে প্রাচীন স্থাপত্য। ফলে ঘাটের মূল চরিত্র বদলে যাচ্ছে। বারাণসীর সংস্কৃতি ধ্বংস করা হচ্ছে।
মণিকর্ণিকা ঘাটে চলছে পুনর্নির্মাণ
মণিকর্ণিকা ঘাটে চলছে পুনর্নির্মাণছবি ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত
Published on

বারাণসীর মনিকর্ণিকা ঘাটে উন্নয়নের নামে ভেঙে ফেলা হচ্ছে পুরোনো ঐতিহ্য। গত কয়েকদিন ধরেই এই অঞ্চলের বিভিন্ন পুরোনো স্থাপত্য, মন্দির বুলডোজার দিয়ে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। যার প্রতিবাদে এবার রাস্তায় নামলেন স্থানীয়রা। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, পুনর্নির্মাণের নামে ভেঙে ফেলা হচ্ছে পুরোনো মন্দির, স্থাপত্য। বারাণসীর মণিকর্ণিকা ঘাট অন্যতম প্রাচীন ঘাট এবং প্রধান পুণ্যস্থান হিসেবে মানা হয়। হিন্দুদের বিশ্বাস অনুসারে, এই ঘাট থেকেই জন্ম মৃত্যু চক্র থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। যে কারণে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এই অঞ্চলে আসনে পুণ্যার্থীরা।

বিক্ষোভকারীরা জানিয়েছেন, পুনর্নির্মাণের নামে মণিকর্ণিকা ঘাটের ঐতিহ্যকে নষ্ট করে ফেলা হচ্ছে। ভেঙে ফেলা হচ্ছে প্রাচীন স্থাপত্য। যার ফলে এই ঘাটের মূল চরিত্র বদলে যাচ্ছে। বারাণসীর সংস্কৃতির সঙ্গে এই ঘাট জড়িত। তা ধ্বংস করা হচ্ছে।

যদিও বিক্ষোভকারীদের এই দাবি অস্বীকার করেছে প্রশাসন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে মণিকর্ণিকা ঘাট চত্বরে কোনও মন্দির ভাঙা হয়নি বা নষ্ট করা হয়নি। তাঁর মতে, কাজ শুরু হবার পরে স্থানীয়দের মধ্যে এই কাজ নিয়ে কিছু বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।

তাঁদের আরও অভিযোগ, এই বিক্ষোভে বহিরাগতরা উসকানি দিচ্ছে। তাই বিষয়টির তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এই ঘাট এবং এর চারপাশের যারা বসবাস করেন তাঁরা এই বিষয় নিয়ে কোনও আপত্তি জানাননি।

মণিকর্ণিকা ঘাটের পুনর্নির্মাণ প্রসঙ্গে অজয় শর্মা নামক স্থানীয় এক ব্যক্তি সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন, এটা বিরোধী পক্ষের করিডোর নিয়ে নয়, কিংবা সংস্কার বা পুনরুদ্ধার নিয়েও নয়। যদি সংস্কার করা হয়, তবে করিডোরগুলো ভালোই আছে—এটা একটি তীর্থস্থান। এখানকার যেকোনো কাজ এই স্থানের পবিত্রতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া উচিত। যদি কোনো মূর্তি বা মন্দির থাকে, তবে সেগুলোকে রক্ষা করেই নির্মাণকাজ হওয়া উচিত...

মণিকর্ণিকা ঘাটের ঘটনা প্রসঙ্গে সমাজমাধ্যমেও মুখ খুলেছেন বেশ কয়েকজন। আশুতোষ পোটনিস নামক এক ব্যক্তি নিজের এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন, “মনিকর্ণিকা ঘাটটি ১৭৩০ সালে বাজিরাও পেশওয়া নির্মাণ করেছিলেন। ১৭৯১ সালে অহল্যাবাই হোলকার এটি পুনর্নির্মাণ করেন। এই সময়ে এখানে অহল্যাবাইয়ের ভাস্কর্যসহ বেশ কয়েকটি ছোট মন্দির নির্মিত হয়েছিল। আমাদের প্রিয় প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদীজী কিছুদিন আগে এই সবকিছু ধ্বংস করে দিয়েছেন।”

পাশাপাশি প্রতিবাদ জানিয়েছে বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলও। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে মণিকর্ণিকা ঘাটের ঘটনা প্রসঙ্গে এক এক্স বার্তায় বলা হয়েছে, "মোদী সরকার বাণিজ্যিকীকরণের আড়ালে বারাণসীর শতাব্দী প্রাচীন ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক এবং আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যকে বুলডোজার দিয়ে ধ্বংস করেছে। 'সংস্কার'-এর নামে লোকমাতা অহল্যাবাই হোলকার কর্তৃক পুনরুদ্ধার করা বারাণসীর মণিকর্ণিকা ঘাট ধ্বংস করা একটি গুরুতর অপরাধ। কাশী আধ্যাত্মিকতা, সংস্কৃতি, শিক্ষা এবং ইতিহাসের সঙ্গমস্থল। এখানে এই ধ্বংসকে উন্নয়ন নয়, ধ্বংস হিসেবে বিবেচনা করা হবে। বিজেপি সরকার কেবল বারাণসীর ইতিহাস মুছে ফেলার জন্যই নয়, বরং আমাদের ধর্মীয় অনুভূতিতেও আক্রমণ করছে। জাঁকজমকপূর্ণ সৌন্দর্যায়নের নামে কাশীর ঐতিহাসিক পরিচয় মুছে ফেলার জন্য এই দেশ নরেন্দ্র মোদীকে কখনও ক্ষমা করবে না।"

কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বঢরা তাঁর এক্স হ্যান্ডেল (পূর্বতন ট্যুইটার) লিখেছেন, “এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে বারাণসীর মণিকর্ণিকা ঘাট বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলা হয়েছে এবং শতাব্দী প্রাচীন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ভেঙে ফেলা হয়েছে। মণিকর্ণিকা ঘাট এবং এর প্রাচীনত্ব কেবল ধর্মীয় তাৎপর্যই বহন করে না, বরং লোকমাতা অহল্যাবাই হোলকরের স্মৃতির সাথেও জড়িত। উন্নয়নের নামে, কিছু মানুষের বাণিজ্যিক স্বার্থে দেশের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্য ধ্বংস করা একটি গুরুতর অপরাধ। এর আগে, সংস্কারের নামে বারাণসীতে অসংখ্য শতাব্দী প্রাচীন মন্দির ভেঙে ফেলা হয়েছে। কাশীর ধর্মীয়, আধ্যাত্মিক এবং সাংস্কৃতিক পরিচয় মুছে ফেলার এই ষড়যন্ত্র অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।”

সমাজবাদী পার্টির প্রধান এবং সাংসদ অখিলেশ যাদব তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে এক বিবৃতিতে বলেছেন, “কোনও প্রকৃত বিশ্বাসী রাণীমাতা, ধর্মের রক্ষক, শ্রদ্ধেয় দেবী অহল্যাবাঈ হোলকরের মূর্তির অপবিত্রতা এবং তাঁর ঐতিহ্য, প্রাচীন কাশীর প্রতি অসম্মানজনক আচরণ সহ্য করবে না। বিজেপি কেবল অর্থ উপার্জনের জন্যই এই সব করছে; তারা কাশীর জন্য, এর বাসিন্দাদের জন্য, এর সাথে সম্পর্কিত ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের জন্যও চিন্তা করে না। অবিনশ্বর কাশী নিজেই বিজেপির ধ্বংসের কারণ হবে।”

আম আদমি পার্টির সাংসদ সঞ্জয় সিং এক এক্স বার্তায় বলেছেন, "এই প্রাচীন মন্দিরটি বাবর ভাঙছেন না, বরং মহাপুরুষ মোদী তাঁর নিজের নির্বাচনী এলাকায় এটি ভাঙতে চাইছেন। তোমরা মিডিয়ার বোকা-বধির লোকেরা, বধির হয়ে চোখ বেঁধে নাও। এতে হিন্দু-মুসলিম কোনও সমস্যা নেই। তোমাদের প্রভুরা এই অপরাধ করছেন।"

এনসিপি শারদ পাওয়ার গোষ্ঠীর সাংসদ সুপ্রিয়া সুলে এক এক্স বার্তায় (পূর্বতন ট্যুইটার) জানিয়েছেন, বারাণসীর মানিকর্ণিকা ঘাট একটি অত্যন্ত পবিত্র স্থান, যার রয়েছে অপরিসীম সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব। শত শত বছর ধরে এটি গড়ে উঠেছে এবং পুণ্যশ্লোক অহল্যাদেবী হোলকারের ঐতিহ্যের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। এই ঐতিহ্যকে প্রভাবিত করে এমন পরিবর্তনের খবর অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মাননীয় যোগী আদিত্যনাথজীর কাছে অনুরোধ, তিনি যেন অনুগ্রহ করে বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করেন এবং এই বিষয়ে স্পষ্ট করে জানান, যাতে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং যথাযথ প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণরূপে সম্মান করা হয়।”  

কংগ্রেসের রাজ্যসভা সাংসদ রেণুকা চৌধুরী তাঁর এক্স হ্যান্ডেলে লিখেছেন, “হিন্দুদের কাছে শ্রদ্ধার অন্যতম পবিত্র প্রতীক কাশীধামের মণিকর্ণিকা ঘাটের এই অবমাননা অত্যন্ত আপত্তিকর। একজন হিন্দু হিসেবে আমি আমার অনুভূতি ও ধর্মীয় বিশ্বাসের উপর এই আগ্রাসনের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। লোকমাতা অহল্যাবাই হোলকার এই প্রাচীন, পবিত্র ঘাটটি সংস্কার করেছিলেন এবং এখন এটিকে বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলতে দেখে হৃদয় ভেঙে যাচ্ছে — জালিয়ানওয়ালা বাগ স্মৃতিসৌধ, গান্ধী ও আম্বেদকরের মূর্তি এবং বেনারসের অসংখ্য মন্দিরের ঘটনার পর এটি ভারতবাসী ও তাদের বিশ্বাসের প্রতি অবজ্ঞার আরও একটি উদাহরণ। এরপর কী হবে?”

বারাণসীর মণিকর্ণিকা ঘাটের পুনর্নির্মাণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে মহারাণী অহল্যাবাঈ ট্রাষ্টও। ট্রাষ্টের চেয়ারম্যান যশবন্ত হোলকার সংবাদমাধ্যমে জানিয়েছেন, তিনি রানির প্রতিষ্ঠিত ভাঙা মূর্তিগুলোর শুদ্ধিকরণ আচার পালনের জন্য গুরুধাম মন্দিরে গেছিলেন। তিনি দাবি করেন, মণিকর্ণিকা ঘাটের মন্দিরের কোণায় স্থাপিত চারটি মূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দুটি ভাঙা অবস্থায় পাওয়া গেছে।

এই কাজকে ক্ষমার অযোগ্য আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ইন্দোরের রাজপরিবার কাশীতে অহল্যাবাইয়ের ঐতিহ্যের প্রতি এমন আচরণের কথা কখনো কল্পনাও করেনি। ট্রাস্টটি সাত দিনের মধ্যে মূর্তিগুলোর নিখোঁজ অংশ ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে এবং সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক প্রদত্ত সংরক্ষণ অধিকারের কথা উল্লেখ করে বলেছে যে, তাদের সম্মতি ছাড়া পুনর্নির্মাণের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে না।

মণিকর্ণিকা ঘাটে চলছে পুনর্নির্মাণ
Varanasi: জ্ঞানবাপী মসজিদের বৈজ্ঞানিক সমীক্ষার নির্দেশ বারাণসী আদালতের
মণিকর্ণিকা ঘাটে চলছে পুনর্নির্মাণ
Varanasi: 'অজয় রাই আমাদের সাংসদ' - বারাণসীতে 'ভোট চুরি'র প্রতিবাদে অভিনব প্রচারে কংগ্রেস, এসপি

SUPPORT PEOPLE'S REPORTER

ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন

Related Stories

No stories found.
logo
People's Reporter
www.peoplesreporter.in