একটা পোড়া গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে... গঙ্গা থেকে পদ্মা, সর্বত্র...

People's Reporter: বাংলাদেশের দিপু দাস হোন বা ভারতের মোহাম্মদ আখলাক বা গ্রাহাম স্টুয়ার্ট স্টেইনস - ধর্মের রোষানলে শুধু তাঁরা পোড়েন না, পুড়ে খাক হয়ে যায় একটা গোটা সমাজ, একটা গোটা সভ্যতার কাঠামো।
ছবি প্রতীকী
ছবি প্রতীকীগ্রাফিক্স - সুমিত্রা নন্দন
Published on

একটা অদ্ভুত দ্বন্দ্বে পড়ে আছি বিগত বেশ কিছুদিন ধরে; আমার বাপ - মা - দাদু - ঠাকুমার যে নামটা উচ্চারণ করার সময় চোখদুটো চকচক করে উঠত, সেটা হল বাংলাদেশ - ওদের ভাষায় "দ্যাশ.." লোকে যাকে আজকাল ঠাট্টা করে "বাংলাদ্বেষ" বলে ডাকছে।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে একটা হিংসাশ্রয়ী আন্দোলন জন্ম নিল দেশটায়... দলে দলে ছাত্র - সাধারণ মানুষ নেমে এলেন রাস্তায়, শুরু হল গণবিক্ষোভ। দীর্ঘ একমাসব্যাপী অরাজকতা, আন্দোলন, ক্ষয়ক্ষতি, প্রাণহানির শেষে ৫ই আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইস্তফা দিলেন শুধু নয়, দেশ ছাড়তেও বাধ্য হলেন - রেফিউজ (Refuge) চাইলেন ভারতে।

গন্ডগোল বলুন বা হিসাব না মেলার খেলাটা শুরু হল ঠিক এখান থেকে.... তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই যে জনতার এই অভ্যুত্থান ছিল এক স্বৈরতান্ত্রিক সরকারকে ক্ষমতা থেকে টেনে নামানোর, দেশকে আরেকটা স্বাধীনতার স্বাদ দেওয়া তাহলে তথাকথিত নব্য স্বাধীনতার পরেও দেশজোড়া অস্থিরতা থামল না কেন? কেন সেটা দীর্ঘস্থায়ী হতে হতে বছরভর চলল? কেন লাগাতার আক্রমণ চলতে থাকল সাংস্কৃতিক অঙ্গনে? কেন হিংসাশ্রয়ী আক্রমণ আঘাত হানল সংবাদমাধ্যমে? এই প্রশ্নগুলো তো উঠবেই... প্রশ্নগুলো তো তুলতে হবেই...

অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের কার্যালয়ে লাগাতার হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে ২০২৫ এর ১৮ ডিসেম্বর রাতে। "প্রথম আলো" এবং "ডেইলি স্টার"-এর মতো শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ, প্রতিষ্ঠান দুটিতে ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, এমনি লুটের ঘটনাও ঘটেছে। ডেইলি স্টারে আটকে পড়া সংবাদকর্মীদের জীবন ছিল সঙ্কটাপন্ন। কেউ মারা যাননি, কিন্তু যে কোনো মুহূর্তে চরম কিছু ঘটে যেতেই পারত।

যখন কোনো গণবিক্ষোভের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায় ধর্মভিত্তিক মৌলবাদ তখন বোধহয় সবার আগে যেটা আক্রান্ত হয় তা হল সেই দেশের সুস্থ সাংস্কৃতিক অঙ্গন। ২০২৪ সালে গণবিক্ষোভের অব্যবহিত পরে প্রথম যে দাবিটা উঠেছিল সেটা হল বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে "আমার সোনার বাংলা" কে বদলে দিতে হবে... কেউ কোনদিন ভাবতে পারে এইরকম একটা দাবিও উঠতে পারে? যারা এই দাবিটা তুলেছিলেন, তাদের যদি জিজ্ঞেস করা হত যে "কেন এই দাবি?" যতদূর সম্ভব কোনো সদুত্তর তাদের কাছেও ছিল না - একটা হুজুগ, যা ছিল সব পাল্টে দিতে হবে - তার ঔৎকর্ষ ইত্যাদি বিচার করার কোনো দায় নেই, থাকার দরকারও নেই - জাস্ট পাল্টে দাও। বিগত বছরের মার্চ যেমন দেখেছে সানজিদা খাতুনের চলে যাওয়া তেমনই দেখেছে ওনার ভালোবাসার ছায়ানটে ২০২৫ এরই ডিসেম্বরে বীভৎস হামলা।

বাংলাদেশের দুই ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও প্রগতিশীল ধারার ধারক - বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী ও ছায়ানটের কার্যালয়ে ১৮ ও ১৯ ডিসেম্বর হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। বার বার উগ্রবাদী বা স্বার্থান্বেষী মহলের নিশানা হয় এই সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো। কখনও 'সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত'-এর অভিযোগ তোলা হয়েছে, আবার কখনও তাদের অনুষ্ঠান করার পথে সরাসরি বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে। যা বাঙালির চিরায়ত অসাম্প্রদায়িক চেতনার ওপর বড় আঘাত। অতীতেও সংস্কৃতির উপর আঘাত করা হয়েছে বহুবার। ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল রমনা বটমূলে পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানে বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনায় ঘটনাস্থলেই ৯ জন নিহত হন এবং হাসপাতালে মারা যান আরো একজন।

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম স্তম্ভ হলো বাউল গান ও লালন দর্শন। সাম্প্রতিক সময়ে কুষ্টিয়া ও নেত্রকোনাসহ বিভিন্ন স্থানে বাউল আখড়া ভাঙচুর এবং সাধুদের লাঞ্ছিত করার খবর পাওয়া গেছে। মরমী সাধকদের জীবনযাপনকে 'অশ্লীল' বা 'ধর্মবিরোধী' হিসেবে দেগে দিয়ে তাদের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

নভেম্বরে মানিকগঞ্জে বিচারগানের অনুষ্ঠানে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয় বাউলশিল্পী আবুল সরকারকে। বাউলশিল্পী আবুল সরকারের ভক্তদের ওপরও হামলার করা হয়। মানিকগঞ্জ জেলার সর্বস্তরের আলেম-ওলামা ও তাওহিদী জনতা’র ব্যানারে শুধু শাস্তিই চাওয়া হয়নি দাবী করা হয়েছে ফাঁসিরও।

সংস্কৃতির উপর আগ্রাসনের আরেক উদাহরণ সিনেমা হলে হামলা। জুলাই আন্দোলনের সময় ভাঙচুর ও লুটপাটের শিকার হয়েছিল পাঁচটি সিনেপ্লেক্স। নারায়ণগঞ্জের গুলশান সিনেপ্লেক্স, সিরাজগঞ্জের রুটস সিনেক্লাব, রাজশাহীর স্টার সিনেপ্লেক্স, নাটোরের আনন্দ সিনেপ্লেক্স এবং চট্টগ্রামের সিলভার স্ক্রিন।

দেশের বিভিন্ন স্থানে সিনেমা হল পুড়িয়ে দেওয়া বা ভাঙচুর করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ ভাস্কর্য ও ম্যুরাল ধ্বংস করা হয়েছে। শিল্পকলার প্রতি এই চরম বিদ্বেষ মূলত একটি উগ্র ও অসহিষ্ণু মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।

১ নভেম্বর দেশ নাটক প্রযোজিত নাটক নিত্যপূরাণ মঞ্চায়নের সময় শিল্পকলা একাডেমির সামনে বিক্ষোভ করেন ২০ থেকে ২৫ ব্যক্তি। বিক্ষোভের মুখে নাটকটির মঞ্চায়ন বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর আগে মহিলা সমিতি মঞ্চে নাটক বন্ধ, নাটক ও চচ্চিত্রের নারী তারকাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠান বন্ধ, 'তৌহিদী জনতা' তথা 'বিক্ষুব্ধ মুসল্লিদের' দাবির মুখে দিনাজপুর ও জয়পুরহাটে নারীদের ফুটবল ম্যাচ বন্ধ, লালমাটিয়ায় দুই তরুণীকে লাঞ্ছিত করার মতো অসংখ্য ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে। ধ্বংস করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্থাপনা, ভাস্কর্য, মাজারসহ নানান স্থাপনা।

বন্ধ হয়েছে একের পর এক কনসার্ট, সব শেষে ২৬ ডিসেম্বর ফরিদপুর জেলা স্কুলের ১৮৫তম বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে প্রখ্যাত সংগীত শিল্পী জেমসের কনসার্টও উচ্ছৃঙ্খল জনতার ইট ছোঁড়া ও হামলায় পণ্ড হয়েছে।

আবারও বলছি, উগ্র ধর্মান্ধতা যখন কোনো আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি হয়, তখন সংস্কৃতির ওপর আগ্রাসন, আক্রমণ অব্যশম্ভাবী। এপার বাংলা হোক বা ওপার বাংলা - বামিয়ানের বুদ্ধ মূর্তি ধ্বংস হোক বা বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙা হোক বা ছায়ানট - উদীচী ধ্বংস; সব এক সুতোয় গাঁথা।

একটি দেশ শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে স্বাধীন হয় না; প্রকৃত স্বাধীনতা আসে সাংস্কৃতিক মুক্তি ও ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধার মাধ্যমে। আজান আর অঞ্জলির মধ্যে কোনো বিরোধ নেই, অনিমা আর আমিনার মধ্যে কোনো বৈরিতা থাকতে পারে না...

ভারত হোক বা বাংলাদেশ, সংবাদমাধ্যম, বাউল সাধক বা সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো যদি যে কোনো পরিস্থিতিতে বিন্দুমাত্র অনিরাপদ বোধ করে, তবে তা যে কোনো দেশের পক্ষেই চূড়ান্ত বিপজ্জনক। বাংলাদেশের দিপু দাস হোন বা ভারতের মোহাম্মদ আখলাক বা গ্রাহাম স্টুয়ার্ট স্টেইনস - ধর্মের রোষানলে শুধু তাঁরা পোড়েন না, পুড়ে খাক হয়ে যায় একটা গোটা সমাজ, একটা গোটা সভ্যতার কাঠামো - একটা পোড়া গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে গঙ্গা থেকে পদ্মা সর্বত্র... মানুষ নাক চাপা দেয়... সংবিধান পুড়তে থাকে, সভ্যতা পুড়তে থাকে - কিন্তু তবুও শাসকের বেহালার সুরকে থামিয়ে দিয়ে ধ্বংসের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বিধ্বস্ত ছায়ানটের সামনে শত কণ্ঠের গান "ক্ষুদ্র আশা নিয়ে রয়েছে বাঁচিয়ে, সদাই ভাবনা" আরো একবার সৃষ্টির বাণী শোনায়, বাঁচার স্বপ্ন দেখায়।

তথ্য ঋণ: বাংলাদেশের সংবাদপত্র কর্মী শাকিলা জেরিন

ছবি প্রতীকী
Emergency 1975: সব 'জরুরি অবস্থা' শুধু কি ঘোষণার মাধ্যমেই হয়?
ছবি প্রতীকী
SSC Scam: এসএসসি কেলেঙ্কারি: বনলতা সেন, রবীন্দ্রসঙ্গীত আর পরের ছেলে

SUPPORT PEOPLE'S REPORTER

ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন

Related Stories

No stories found.
logo
People's Reporter
www.peoplesreporter.in