একদিকে বিশ্বজুড়ে যখন দারিদ্র্য বাড়ছে তখনই গত এক বছরে বিশ্বের ধনকুবেরদের সম্পদ বেড়েছে ২.৫ ট্রিলিয়ন ডলার। যে বৃদ্ধির হার প্রায় তিন গুণের বেশি। অক্সফ্যাম-এর সাম্প্রতিক এক রিপোর্ট থেকে এই তথ্য উঠে এসেছে। অক্সফ্যামের পর্যবেক্ষণ অনুসারে ধনকুবেরদের সম্পদ গত এক বছরে যে পরিমাণ বেড়েছে তা দিয়ে বিশ্বজুড়ে ২৬ গুণ বেশি দারিদ্র্য দূর করা যেত। রিপোর্ট অনুসারে, ২০২০ থেকে বিশ্বে ধনীদের সম্পদ বেড়েছে ৮১ শতাংশ।
রিপোর্ট অনুসারে, বিশ্বের কমপক্ষে ২২টি দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। যার মধ্যে আছে আইনব্যবস্থা, সংসদীয় গণতন্ত্র, নাগরিক অধিকার, নির্বাচনে জালিয়াতি, স্বৈরাচারের প্রসার, একজন নেতার হাতে ক্ষমতার একীভূতকরণ ইত্যাদি।
অক্সফ্যাম-এর রিপোর্টে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে বিশ্বজুড়ে দক্ষিণপন্থার উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে ক্রমশ বাড়ছে বৈষম্য। কমছে নাগরিকদের স্বাধীনতা। এই বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন প্রয়োজন বলে মনে করে অক্সফ্যাম।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে অক্সফ্যাম শেষ দশককে ‘বিলিওনেয়ারদের দশক’ বলে অভিহিত করেছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে এক শ্রেণীর মানুষ এই সময় সম্পদের চূড়ায় পৌঁছে গেলেও বিশ্বের প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি জনসংখ্যা বা ৪৮ শতাংশ এখনও চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করে। রিপোর্ট জানাচ্ছে, বিশ্বের প্রতি চারজন মানুষের মধ্যে একজন নিয়মিত পর্যাপ্ত খাবার পায়না।
রিপোর্ট আরও জানাচ্ছে, এই প্রথম বিশ্বে বিলিওনেয়ারদের সংখ্যা ৩০০০-এ পৌঁছেছে। যারা অর্থনীতি এবং সমাজকে তাদের অনুকূলে আনার জন্য রাজনৈতিক ক্ষমতা, সংবাদমাধ্যমে প্রভাব বাড়াচ্ছে এবং তা ব্যবহার করছে।
এই সমীক্ষায় অংশ নিয়েছে বিশ্বের ৬৬টি দেশের মানুষ। যাদের অর্ধেকের বেশি সংখ্যক মানুষ জানিয়েছেন, বিভিন্ন দেশের ধনী ব্যক্তিরা নির্বাচন কিনে নিচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ যে ঘটনায় ক্ষুব্ধ হচ্ছে। সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের এক বড়ো অংশ মনে করে, অতিরিক্ত সম্পদের রূপান্তর ঘটছে রাজনৈতিক ক্ষমতায়। ফলে সাধারণ নাগরিকদের তুলনায় কোটিপতিদের রাজনৈতিক ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবার সম্ভাবনা ক্রমশ বাড়ছে। বর্তমানে এই প্রবণতা ৪ হাজার গুণ বেড়েছে বলে রিপোর্টে জানানো হয়েছে।
অক্সফ্যাম-এর মতে বিভিন্ন দেশের সরকার নাগরিক স্বাধীনতা খর্ব করছে। এর প্রতিবাদে যারা রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন তাদের স্বৈরাচারী পদক্ষেপের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
রিপোর্টে বলা হয়েছে বিভিন্ন দেশের দক্ষিণপন্থী দল এবং সংবাদমাধ্যম, যার বেশিরভাগেরই মালিকানা কোনো অতি ধনীর, তারা সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ নামিয়ে আনছে। দেশে দেশে বিভিন্ন ঘটনার জন্য অভিবাসীদের দায়ী করা হচ্ছে। মানুষকে মনে করানো হচ্ছে, অভিবাসীদের জন্য অপরাধ বাড়ছে এবং সামাজিক সুরক্ষা কমছে, জীবনযাত্রার খরচ বাড়ছে।
এই বিষয়ে ২০২৪ সালে কানাডায় এক সমীক্ষা করা হয়েছিল। যেখানে দেখা গেছিল ৩৫% শতাংশ কানাডাবাসী মনে করেন, অভিবাসীদের জন্য তাদের দেশে সমস্যা বাড়ছে। মানুষের মনে এই ধারণা ঢুকিয়ে দিতে ব্যবহার করা হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়া, বিভিন্ন নিউজ পোর্টাল এবং দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক দলগুলিকে। উদ্বেগের বিষয়, একটা বড়ো অংশের মানুষ এই কথা বিশ্বাস করছেন এবং যার ফলে দেশে দেশে জাতিগত দাঙ্গা বাড়ছে।
কীভাবে এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যেতে পারে তার পথ হিসেবে অক্সফ্যাম জানিয়েছে, অতি ধনীদের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ, তাদের রাজনৈতিক অধিকার দখলের চেষ্টা খর্ব করা, অর্থের বিনিময়ে ধনীদের প্রচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা, প্রচারের জন্য ব্যবহৃত অর্থের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নিয়ম জারি করা এবং সাধারণ মানুষ, নাগরিক সমাজ যাতে সংগঠিত হতে পারে এবং প্রতিবাদ জানাতে পারে তা নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই অবস্থার অবসান ঘটতে পারে।
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন