

মহাত্মা গান্ধীর ৭৮ তম মৃত্যুবার্ষিকীতে ১৯৪৮ সালে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিকে লেখা দুটি চিঠি প্রকাশ করলেন কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ। যে চিঠিদু’টি লিখেছিলেন জওহরলাল নেহেরু এবং সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল। চিঠিতে কড়া ভাষায় আরএসএস এবং হিন্দু মহাসভার সমালোচনা করা হয়েছিল এবং প্রশ্ন তোলা হয়েছিল তাদের কর্মপদ্ধতি নিয়েও। ১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি উগ্র দক্ষিণপন্থী নাথুরাম গডসের গুলিতে নিহত হন মহাত্মা গান্ধী। ৭৮ বছর আগের এই চিঠি প্রকাশ করে জাতীয় রাজনীতিতে আরএসএস এবং হিন্দু মহাসভা সংক্রান্ত বিতর্ক তিনি আরও উসকে দিলেন বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
শুক্রবার এক এক্স বার্তায় (পূর্বতন ট্যুইটার) চিঠিদুটি প্রকাশ করে কংগ্রেসের যোগাযোগ বিভাগের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ লিখেছেন, “দুটি চিঠিই নিজেদের জাতীয়তাবাদের রক্ষক দাবি করাদের বিরুদ্ধে এক জোরালো অভিযোগ। ভাবুন তো, সেই একই মতাদর্শে বিশ্বাসী একজন লোকসভা সাংসদ আছেন, যিনি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর আশীর্বাদধন্য এবং যিনি বলেছিলেন যে তিনি গান্ধী ও গডসের মধ্যে কাউকে বেছে নিতে পারবেন না। তার মানসিকতাই সব কিছু স্পষ্ট করে দেয়।”
জয়রাম রমেশ উল্লিখিত চিঠিগুলির মধ্যে একটি লেখা হয়েছিল মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করার দু'দিন আগে। যা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিকে লিখেছিলেন জওহরলাল নেহরু। দ্বিতীয় চিঠি মহাত্মা গান্ধী হত্যার প্রায় ছ’মাস পরে, ১৯৪৮ সালের ১৮ই জুলাই শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিকে লেখেন সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল। দুই চিঠির সঙ্গে ১৯৪৮ সালের ৩০শে জানুয়ারি রাতে অল ইন্ডিয়া রেডিওতে জওহরলাল নেহরুর ভাষণের একটি লিঙ্কও প্রকাশ করেছেন জয়রাম রমেশ।
নাথুরাম গডসের হাতে খুন হবার দু’দিন আগে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিকে লেখা চিঠিতে জওহরলাল নেহেরু জানিয়েছিলেন, “কিছুদিন ধরে হিন্দু মহাসভার কার্যকলাপ আমাকে অত্যন্ত বিচলিত করেছে। এই মুহূর্তে এই সংগঠন ভারতে সরকার এবং কংগ্রেসের প্রধান বিরোধী দল হিসেবেই কাজ করছে না, বরং এটি এমন একটি সংগঠন যারা ক্রমাগত হিংসায় উস্কানি দিচ্ছে। আরএসএস আরও খারাপ আচরণ করেছে এবং আমরা তাদের অত্যন্ত আপত্তিকর কার্যকলাপ এবং দাঙ্গা ও বিশৃঙ্খলার সাথে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সম্পর্কে প্রচুর তথ্য সংগ্রহ করেছি।”
ওই চিঠিতেই নেহেরু আরও লেখেন, “উপরে যা লিখেছি তা ছাড়াও, আমাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দেয় হিন্দু মহাসভার মঞ্চ থেকে দেওয়া বক্তৃতার চরম অশালীনতা ও অভদ্রতা। ‘গান্ধী মুর্দাবাদ’ তাদের অন্যতম বিশেষ স্লোগান। সম্প্রতি হিন্দু মহাসভার এক বিশিষ্ট নেতা বলেছেন যে, লক্ষ্য হওয়া উচিত নেহেরু, সর্দার প্যাটেল এবং মৌলানা আজাদকে ফাঁসি দেওয়া।”
চিঠিতে নেহেরু লেখেন, “যতই অপছন্দের হোক না কেন, সাধারণত কেউ কোনো রাজনৈতিক কার্যকলাপে হস্তক্ষেপ করতে চায় না। কিন্তু এই ধরনের কাজের একটা সীমা আছে এবং আমি আশঙ্কা করছি সেই সীমা ইতিমধ্যেই অতিক্রম না করলেও তার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। আপনাকে বিশেষভাবে লেখার কারণ, হিন্দু মহাসভার সাথে আপনার নিজের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। আমাদের দলে, গণপরিষদে এবং অন্যান্য স্থানেও আমাদের ক্রমাগত জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে এই বিষয়ে আপনার অবস্থান কী? আপনি যদি আমাকে জানান যে আপনি এই পরিস্থিতি কীভাবে মোকাবিলা করতে চান, যা আমার মতোই আপনার জন্যও বিব্রতকর, তবে আমি আপনার কাছে কৃতজ্ঞ থাকব।”
গান্ধীজী খুন হবার প্রায় ছ’মাসের মাথায় ১৯৪৮ সালের ১৭ জুলাই শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির চিঠির উত্তরে ১৮ জুলাই সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল তাঁকে জানান, “আরএসএস এবং হিন্দু মহাসভার বিষয়ে বলতে গেলে, গান্ধীজির হত্যাকাণ্ড সম্পর্কিত মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে এবং আমি এই দুই সংগঠনের ভূমিকা সম্পর্কে কিছু বলতে চাই না। কিন্তু আমাদের রিপোর্ট অনুসারে, এই দুই সংস্থার, বিশেষ করে প্রথমটির কার্যকলাপের ফলে দেশে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, যেখানে এই ধরনের একটি ভয়াবহ মর্মান্তিক ঘটনা সম্ভব হয়েছিল। আমার মনে কোনো সন্দেহ নেই যে হিন্দু মহাসভার উগ্রপন্থী অংশ এই ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিল। আরএসএস-এর কার্যকলাপ সরকার এবং রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য একটি স্পষ্ট হুমকি ছিল।”
ওই চিঠিতেই সর্দার প্যাটেল আরও লেখেন, “আমাদের রিপোর্ট অনুসারে, নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও সেই কার্যকলাপ থেমে যায়নি। বরং, সময় গড়ানোর সাথে সাথে আরএসএস মহল আরও বেশি উদ্ধত হয়ে উঠছে এবং ক্রমবর্ধমান হারে তাদের নাশকতামূলক কার্যকলাপে লিপ্ত হচ্ছে। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির সংখ্যা খুব বেশি নয়; সারা ভারতে এই সংখ্যা ৫০০-র সামান্য বেশি। যা থেকে বোঝা যায় যে, সাধারণত কেবল তাদেরকেই আটক রাখা হয়েছে যাদের মুক্তি নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর। তাদের প্রায় সবাই আগামী মাস নাগাদ নির্দিষ্ট প্রক্রিয়াতেই মুক্তি পাবে। কারণ বিভিন্ন জননিরাপত্তা আইনের অধীনে ছয় মাস আটক রাখার সময়সীমা শেষ হয়ে যাবে। এই ঘটনার দু’সপ্তাহ আগেই তা নিয়ে অনুমান করাটা জরুরি বা বাঞ্ছনীয় নয়।”
উল্লেখ্য ২০২৪ সালের মার্চ মাসে এক সংবাদমাধ্যমে গান্ধী এবং গডসের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে প্রাক্তন বিচারপতি ও বিজেপি নেতা অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় বলেছিলেন, “আইন পেশার একজন হিসেবে, আমাকে ঘটনার অন্য দিকটিও বোঝার চেষ্টা করতে হবে। আমাকে তাঁর (নাথুরাম গডসে) লেখাগুলি পড়তে হবে এবং বুঝতে হবে কী কারণে তিনি মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করতে প্ররোচিত হয়েছিলেন। তার আগে পর্যন্ত, আমি গান্ধী বা গডসের মধ্যে কোনও একটিকে বেছে নিতে পারছি না।” প্রাক্তন বিচারপতির এই মন্তব্য নিয়ে সেইসময় তুমুল বিতর্ক হয়। পরবর্তী সময়ে বিজেপি সাংসদ নির্বাচিত হন অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়। এদিন জয়রাম রমেশ নাম না করে তাঁকেই নিশানা করেছেন বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন