

আবারও এক নৃশংস গণপিটুনির ঘটনায় মৃত্যু হল ছত্তিশগড়ের এক যুবকের। ছত্তিশগড়ের ৩১ বছর বয়সী যুবক রামনারায়ণ কাজের সন্ধানে সম্প্রতি কেরালায় গেছিলেন। গত ১৮ ডিসেম্বর সন্ধ্যেয় সেখানেই তাঁকে ‘চোর’ সন্দেহে গ্রামবাসীরা আটক করে। এরপর তাঁকে তাঁর ভাষা জিজ্ঞাসা করা হয় এবং ‘বাংলাদেশী’ তকমা দেওয়া হয়। পরে গণপিটুনিতে তাঁর মৃত্যু হয়।
ডিওয়াইএফআই কেরালা এক বিবৃতিতে বলেছে, “কেরালার মতো এক রাজ্যে এই ধরনের নিষ্ঠুরতা গ্রহণযোগ্য নয়, যেখানে ঐতিহ্যগতভাবে শ্রমিকদের প্রতি যত্ন ও সম্মানের সাথে আচরণ করা হয়।”ছত্তিশগড়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিজয় শর্মা এই ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
এনডিটিভি-র প্রতিবেদন অনুসারে, গণপিটুনির ঘটনার ৩১ সেকেন্ডের এক ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। যেখানে বারবার স্থানীয়রা নিহতকে ‘বাংলাদেশী’ বলে সম্বোধন করছিল। ভিডিওর এক জায়গায় শোনা যায় স্থানীয়রা তাঁকে তাঁর ভাষা জিজ্ঞেস করছিল। কিন্তু রাম নারায়ণ কোনও উত্তর দেবার আগেই স্থানীওরাই তাঁকে ‘বাংলাদেশী’ বলে দাগিয়ে দেয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া এই ভিডিও গুলোকে স্থানীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করছে।
ইতিমধ্যেই এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত সন্দেহে পাঁচ ব্যাক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এঁদের নাম মুরলী, প্রসাদ, অনু, বিপিন এবং অনন্থন। এঁরা সকলেই আট্টাপাল্লার গ্রামের বাসিন্দা। এঁদের সকলকেই বিচার বিভাগীয় হেফাজতে রাখা হয়েছে। স্থানীয় সিসিটিভি ফুটেজ থেকে পুলিশ জানতে পেরেছে ঘটনার সময় কমপক্ষে কুড়ি জন সেখানে ছিলেন। পুলিশ স্পষ্টই জানিয়েছে, নিহত রামনারায়ণের বিরুদ্ধে কোনও অপরাধমূলক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ ছিল না।
দেশাভিমানীর প্রতিবেদন অনুসারে, ঘটনার সঙ্গে যুক্তদের অধিকাংশই আরএসএস-বিজেপির সদস্য। গণপিটুনির ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া পাঁচ অভিযুক্তের মধ্যে চারজনই আরএসএস-বিজেপি কর্মী বলে ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে অনন্থন (৫৫) ছাড়া বাকি চারজনই আরএসএস বিজেপি কর্মী। যাদের নাম এ অনু (৩৮), সি প্রসাদ (৩৪), সি মুরলী (৩৮) এবং কে বিপিন (৩০)।
জানা গেছে, ১৮ ডিসেম্বর সন্ধ্যে ৬টা নাগাদ রামনারায়ণকে চোর সন্দেহে গ্রামবাসীরা আটক করে। প্রত্যক্ষদর্শীরা দাবি করেছেন, আক্রমণকারীরা বারবার তাঁকে ‘বাংলাদেশী’ বলে সম্বোধন করছিল এবং তাঁর জাতীয়তা জানতে চাইছিল। যদিও নিহত রামনারায়ণ বারবারই তাদের জানিয়েছিল সে তাঁর বোনের সঙ্গে দেখা করতে এসেছে।
সিপিআইএম পুদুচ্চেরি এরিয়া কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে এই ঘটনার সঙ্গে আরও অনেক ব্যক্তি যুক্ত আছে এবং তাদের বিজেপি নেতৃত্ব এবং একজন প্রাক্তন কংগ্রেসি মহিলা পঞ্চায়েত সদস্য আড়াল করে রেখেছে। সিপিআইএম জানিয়েছে, সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গী থেকে এই গণপিটুনি পরিচালনা করা হয়েছে এবং এর সঙ্গে যুক্তদের কড়া শাস্তি দিতে হবে।
‘বাংলাদেশী’ সন্দেহে ছত্তিশগড়ের যুবকের গণপিটুনিতে হত্যার ঘটনায় দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবি জানিয়েছে কেরালা ডিওয়াইএফআই। এই ঘটনায় যুক্তদের কঠোর শাস্তির পাশাপাশি নিহতের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ এবং তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য রাজ্য সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছে ডিওয়াইএফআই নেতৃবৃন্দ। কেরালার পালাক্কাড জেলার ওলাইয়ারের আটাপ্পালামে গত ১৮ ডিসেম্বর গণপিটুনিতে নিহত হন ছত্তিশগড়ের ৩১ বছর বয়সী যুবক রাম নারায়ণ বাঘেল। তিনি কিছুদিন আগেই কেরালায় কাজের খোঁজে গেছিলেন।
নিহত রামনারায়ণ বাঘেলের দেহর ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ডাঃ হিতেশ শঙ্কর জানিয়েছেন, “নিহতের শরীরের কোনও অংশ এরকম ছিলনা যেখানে ক্ষতচিহ্ন নেই। নিহতের বুক, হাত, পা, মাথা, পিঠ এমনকি ব্রেনেও ক্ষতচিহ্ন পাওয়া গেছে”। এই ঘটনাকে তিনি নৃশংসতম বলে তিনি জানিয়েছেন। তাঁর মতে যদি কেউ এই ঘটনায় মধ্যস্থতা করতে পারতো তাহলে হয়তো নিহতের জীবন বাঁচানো সম্ভব হত।
নিহত রামনারায়ণ বাঘেলের স্ত্রী ললিতা, তাদের দুই সন্তান এবং ভাই রবিবারই কেরালায় পৌঁছেছেন। ডেকান হেরাল্ডের প্রতিবেদন অনুসারে তাঁরা ত্রিশূর মেডিকেল কলেজ থেকে নিহত রামনারায়ণের দেহ নিতে অস্বীকার করেছেন এবং কেরালা সরকারের কাছে ২৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন। নিহতের ভাই সংবাদমাধ্যমে দাবি করেছেন, এক দলিত পরিবারের সদস্যকে হত্যার সঙ্গে জড়িতদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে এবং ক্ষতিপূরণ সহ দাবি না মেটানো হলে তাঁরা দেহ গ্রহণ করবেন না।
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন