

সময় যত এগোচ্ছে ভারতে ঘৃণাসূচক ভাষণের সংখ্যা ততই বাড়ছে। ভারতের ২১টি রাজ্য, ১টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল এবং দিল্লি ও সংলগ্ন অঞ্চলে (National Capital Territory - NCT) ২০২৫ সালে ১৩১৮ টি ঘৃণাসূচক ভাষণের (Hate Speech) ঘটনা ঘটেছে। দ্য ইন্ডিয়া হেট ল্যাব (The India Hate Lab – IHL) গত ১৩ জানুয়ারি প্রকাশিত এক সমীক্ষা রিপোর্টে একথা জানিয়েছে। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ১১৬৫। অর্থাৎ গত এক বছরে দেশে ঘৃণাসূচক ভাষণের সংখ্যা বেড়েছে ১৩ শতাংশ। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ৬৬৮। ২০২৩-এর অনুপাতে ২০২৪-এ বৃদ্ধির হার ছিল ৯৭ শতাংশ।
দ্য ইন্ডিয়ান হেট ল্যাবের সমীক্ষা রিপোর্ট অনুসারে নথিভুক্ত হওয়া মোট ঘৃণাসূচক ভাষণের ১,২৮৯টি বা ৯৮ শতাংশই মুসলমান (১,১৫৬) এবং খ্রিষ্টানদের (১৩৩) লক্ষ্যবস্তু করে। ২০২৪-এর অনুপাতে এই বৃদ্ধির হার ১২ শতাংশ। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ১,১৪৭। রিপোর্ট অনুসারে ২০২৫ সালে প্রতিদিন গড়ে ৪টি করে ঘৃণাসূচক বক্তব্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উদ্দেশ্য করে করা হয়েছে।
ঘৃণাসূচক ভাষণের ক্ষেত্রে শীর্ষস্থানে আছে পাঁচ বিজেপি শাসিত রাজ্য। যে তালিকায় প্রথম উত্তরপ্রদেশ (২৬৬), মহারাষ্ট্র (১৯৩), মধ্যপ্রদেশ (১৭২), উত্তরাখন্ড (১৫৫) এবং দিল্লি (৭৬)।
সারা দেশে ২০২৫ সালে যতগুলি ঘৃণাসূচক বক্তব্যের ঘটনা ঘটেছে তার মধ্যে ১১৬৪টি বা ৮৮ শতাংশই ঘটেছে বিজেপি শাসিত রাজ্যে বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে। যা ২০২৪ সালের তুলনায় ২৫ শতাংশ বেশি। ২০২৪-এ এই সংখ্যা ছিল ৯৩১।
এছাড়াও দেশের ৭টি বিরোধী শাসিত রাজ্যেও ঘৃণাসূচক ভাষণের ঘটনা ঘটেছে। সংখ্যার বিচারে যা ১৫৪টি। এই সংখ্যা ২০২৪-এর অনুপাতে ২৪ শতাংশ কম। এই তালিকার শীর্ষে আছে কংগ্রেস শাসিত কর্ণাটক (৪০)। ঘৃণাসূচক বক্তব্যের হার বেড়েছে বিভিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে। যেমন পহেলগাঁও হামলার সময় ঘৃণাসূচক বক্তব্য বেড়েছে। আবার রাম নবমীর শোভাযাত্রার সময়েও বেড়েছে ঘৃণাসূচক বক্তব্য। যেমন শুধুমাত্র এপ্রিল মাসেই রাম নবমীর সময় ১৫৮ টি এই সংক্রান্ত ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এপ্রিল মাসের ২২ তারিখ থেকে মে মাসের ৭ তারিখ পর্যন্ত পহেলগাঁও কান্ডের সময় এই ধরণের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে ৯৮টি।
২০২৫ সালে দেশে যতগুলি ঘৃণাসূচক বক্তব্যের যতগুলি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে তার মধ্যে ৬৫৬টি ক্ষেত্রে চক্রান্তের তত্ব, ৩০৮টি ক্ষেত্রে হিংসার আহ্বান, ১৪১টি উদ্ধৃতিসহ অবমাননাকর ভাষণ, হাতে অস্ত্র তুলে নেবার আহ্বান ১৩৬টিতে, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক বয়কটের ডাক দেওয়া হয়েছে ১২০টি ক্ষেত্রে, ধর্মীয় স্থান ভাঙার ডাক দেওয়া হয়েছে ২৭৬টি ঘটনায় এবং রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের লক্ষ্য করে বক্তব্য রাখা হয়েছে ৬৯টি।
ঘৃণাসূচক ভাষণের যেসব বক্তব্য নথিভুক্ত করা হয়েছে তার মধ্যে সবথেকে বিপজ্জনক বক্তৃতা দিয়েছেন মহারাষ্ট্রের নীতেশ রানে। অন্যদিকে সবথেকে বেশি ঘৃণাসূচক বক্তাদের তালিকায় প্রথম আছেন উত্তরাখন্ডের মুখ্যমন্ত্রী পুষ্কর সিং ধামী (৭১), প্রবীণ তোগাড়িয়া (৪৬) এবং বিজেপি নেতা অশ্বিনী উপাধ্যায় (৩৫)। এছাড়াও সংগঠনের হিসেবে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি), বজরঙ দল, অন্ত্ররাস্ট্রীয় হিন্দু পরিষদ প্রভৃতি সংস্থার নাম আছে।
ধর্মীয় বক্তা এবং সন্ন্যাসীদের ক্ষেত্রে ১৪৫টি ঘৃণাসূচক বক্তব্য নথিভুক্ত করা হয়েছে। রিপোর্ট অনুসারে, যে তালিকার শীর্ষে আছেন ইয়াতি নরসিংহ সরস্বতী (২০), মধুরাম শরণ শিবা (১৯), রাজু দাস (১৯), ধীরেন্দ্র শাস্ত্রী (১৩), সংগ্রাম বাপু ভান্ডারে (১০) প্রমুখ।
রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ৬৯টি ঘৃণাসূচক বক্তব্য ২০২৫-এ নথিভুক্ত হয়েছে। এছাড়াও ১৯২টি বক্তৃতায় ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।
যেসব সামাজিক মাধ্যমের সাহায্যে এইসব ঘৃণাসূচক বক্তব্য ছড়িয়ে পড়েছে তার মধ্যে আছে ফেসবুক (৯৪২), ইউটিউব (২৪৬), ইন্সটাগ্রাম (৬৭) এবং এক্স (২৩)। মোট ১,৩১৮টি ঘটনার মধ্যে ১,২৭৮টি ঘটনাই প্রথম সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভ হয়েছে বা শেয়ার বা লাইভ স্ট্রিম করা হয়েছে।
ইন্ডিয়া হেট ল্যাব ওয়াশিংটন-ভিত্তিক সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অফ অর্গানাইজড হেট (CSOH) এর অংশ, যা একটি অলাভজনক সংস্থা।
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন