ট্রেড ইউনিয়ন প্রসঙ্গে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত-র মন্তব্যের কড়া সমালোচনা করলো বাম শ্রমিক সংগঠন সিআইটিইউ এবং এআইটিইউসি। অবিলম্বে তাঁর ওই মন্তব্য পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে দুই শ্রমিক সংগঠনের নেতৃত্ব। সম্প্রতি প্রধান বিচারপতি বলেছিলেন, ট্রেড ইউনিয়নের কাজকর্মের জন্য দেশে শিল্পের অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছে। যার বিরোধিতা করে ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃত্ব জানান, এই বক্তব্যে মোদী সরকারের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক অযৌক্তিকাকেই তুলে ধরা হচ্ছে এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।
কী বলেছিলেন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত?
লাইভ ল- এর প্রতিবেদন অনুসারে, বৃহস্পতিবার গৃহসহায়িকাদের মজুরি সংক্রান্ত মামলা চলাকালীন প্রধান বিচারপতি প্রশ্ন তোলেন যে, বর্ধিত নিয়ন্ত্রণ এবং ইউনিয়নের হস্তক্ষেপ শিল্পোন্নয়ন আটকাচ্ছে কিনা। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুসারে, ট্রেড ইউনিয়নগুলি প্রায়শই কাঠামোগত পরিবর্তন এবং সংস্কারের বিরোধিতা করে, যার ফলে বিনিয়োগ এবং শিল্প সম্প্রসারণকে নিরুৎসাহিত করা হয়। গৃহকর্মীদের জন্য ন্যূনতম মজুরির ইস্যুতে, আদালত উদ্বেগ প্রকাশ করে যে আইনগত মজুরি স্তর আরোপ করলে গৃহকর্মীর চাহিদা কমে যেতে পারে এবং যার ফলে মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য কর্মসংস্থান অসাধ্য হয়ে উঠতে পারে।
প্রধান বিচারপতির মন্তব্যের বিরোধিতা করে কী বলেছে সিআইটিইউ?
প্রধান বিচারপতির মন্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করে সিপিআইএম-এর শ্রমিক সংগঠন সিআইটিইউ সাধারণ সম্পাদক এলারাম করিম সাংবাদিকদের বলেন, শিল্প বন্ধের জন্য ট্রেড ইউনিয়নকে দোষারোপ করা বাস্তব পরিস্থিতি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ঘটনা। কারণ ভারতে শিল্প বিরোধ, শিল্প বন্ধ হওয়া, ছাঁটাই এবং লে-অফ সম্পর্কিত বিষয়ের প্রকৃত অবস্থা লেবার ব্যুরোর প্রতিবেদন থেকেই পরিষ্কার। যাতে দেখা গেছে ২০২৩ সালে শিল্পবিরোধ সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছেছে। ২০০৬ সালে যা ছিল ৪৩০, ২০২৩-এ তা নেমে এসেছে ৩০-এ।
তিনি আরও বলেন, শ্রমিক সংগঠনের আন্দোলনের ফলে কোনও শিল্প ইউনিট বন্ধ হচ্ছে না। পুঁজিবাদী নব্য উদারবাদী ব্যবস্থার সংকট এবং অর্থনীতির কারণে সামগ্রিকভাবে এমএসএমই-র (MSME) ক্ষতি হচ্ছে এবং উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে শিল্প বন্ধের সংখ্যা বাড়ছে।
তাঁর মতে, নীতিগত ব্যর্থতা এবং অর্থনৈতিক ব্যর্থতা ঢাকতে কোনোভাবেই শ্রমিক সংগঠনকে বলির পাঁঠা বানানো যায়না। আইনি এবং অবৈধ শিল্প বন্ধের ঘটনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, যেসব রাজ্যে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন দুর্বল সেখানে শিল্প বন্ধের ঘটনা অনেক বেশি।
সিআইটিইউ সতর্ক করে বলেছে যে, এই ধরনের বিবৃতি, বিশেষ করে “সংবিধানের রক্ষক” যখন এইধরণের বিবৃতি দেন, তখন তা সাংবিধানিক নিশ্চয়তার প্রতি জনসাধারণের বিশ্বাসকে দুর্বল করে এবং নিয়োগকর্তা, সরকারকে শ্রম অধিকার আরও শিথিল করতে উৎসাহিত করে।
কর্পোরেট বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক সংসদে উপস্থাপিত সরকারী তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে সিআইটিইউ জানিয়েছে, গত পাঁচ বছরে ২,০৪,২৬৮টিরও বেশি বেসরকারি কোম্পানি একত্রীকরণ, বিলুপ্তি, রূপান্তর, অথবা কোম্পানি আইন, ২০১৩ এর অধীনে যাওয়ার কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। Insolvency and Bankruptcy Board of India (IBBI) -র তথ্য অনুসারে, - শ্রম বিরোধ নয় - ভারতের শিল্প সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বৃহৎ কর্পোরেট ব্যর্থতা এবং ঋণ পুনরুদ্ধারে দুর্বলতা।
গৃহকর্মীদের ন্যূনতম মজুরি সম্পর্কে সিআইটিইউ জানিয়েছে, ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্য ইতিমধ্যেই গৃহকর্মীদের জন্য ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করেছে এবং এর ফলে কর্মসংস্থান ভেঙে পড়েনি। ন্যূনতম মজুরি অস্বীকার করা কার্যকরভাবে কর্মক্ষেত্রের সবচেয়ে অসংগঠিত এবং নারীবাদী ক্ষেত্রগুলির মধ্যে একটিতে শোষণকে বৈধতা দেয়। এই ধরণের মন্তব্য সংবিধানের ২১ এবং ২৩ অনুচ্ছেদের অধীনে শ্রমের মর্যাদা এবং জীবিকার অধিকার নিশ্চিত করার আদেশকে উপেক্ষা করে।
কী জানালো এআইটিইউসি?
সিপিআই-এর শ্রমিক সংগঠন এআইটিইউসি-র সাধারণ সম্পাদক অমরজিৎ কাউর বলেন, গৃহকর্মীদের ন্যূনতম মজুরি দাবির আবেদন অস্বীকার করা সামাজিক ন্যায়বিচার, সমতা এবং শ্রমের মর্যাদার সাংবিধানিক আদেশের বিপরীত। যা গভীরভাবে উদ্বেগজনক এবং অসঙ্গত। প্রধান বিচারপতির এই মন্তব্য, স্বাধীনতার পর থেকে জাতীয় স্বাধীনতা আন্দোলন এবং দেশ গঠনে ট্রেড ইউনিয়নগুলির ঐতিহাসিক এবং বাস্তব অবদানকে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করে।
তিনি আরও বলেন, শ্রমিক সংগঠন অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে বাধা নয়। বরং শ্রমিকদের মর্যাদা, জীবিকা এবং নিরাপত্তার জন্য সংবিধান স্বীকৃত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। ট্রেড ইউনিয়নের কার্যকলাপ শিল্পের অগ্রগতির বিরোধী হিসেবে দেখানো আসলে অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে ভুল বোঝা এবং কর্পোরেটপন্থী নীতির ধ্বংসাত্মক পরিণতিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা।
অস্বীকার করা হচ্ছে সাংবিধানিক অধিকার
শ্রমিক সংগঠনগুলির বক্তব্য অনুসারে, প্রধান বিচারপতির এই মন্তব্য সংগঠনের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন করে। কারণ সংবিধানের ১৯(১)(গ) অনুচ্ছেদের অধীনে, শ্রমিকদের সমিতি এবং ইউনিয়ন গঠনের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। শ্রমিক সংগঠনগুলি ট্রেড ইউনিয়ন আইন, ১৯২৬ এর অধীনে নিয়ন্ত্রিত এবং সুরক্ষিত। শ্রমিক সংগঠনকে শিল্পোন্নয়নের বাধা হিসাবে দেখানো কার্যকরভাবে এই সাংবিধানিক কাঠামোকেই অবৈধ করে তোলে।
ভারত যখন আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী ধর্মঘটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন এই ঘটনা শ্রমিক এবং রাষ্ট্রের মধ্যে বিভেদ আরও তীব্র করে তুলেছে। বর্তমান বিতর্ক থেকে এটা স্পষ্ট যে, শ্রমিক অধিকারের লড়াই এখন আর কারখানা বা আইনসভার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই - বরং দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলিতেও পৌঁছেছে।
ভারতের প্রয়োজন নিরপেক্ষ এবং প্রশ্নমুখী সাংবাদিকতা — যা আপনার সামনে সঠিক খবর পরিবেশন করে। পিপলস রিপোর্টার তার প্রতিবেদক, কলাম লেখক এবং সম্পাদকদের মাধ্যমে বিগত ১০ বছর ধরে সেই চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। এই কাজকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন আপনাদের মতো পাঠকদের সহায়তা। আপনি ভারতে থাকুন বা দেশের বাইরে — নিচের লিঙ্কে ক্লিক করে একটি পেইড সাবস্ক্রিপশন নিতে পারেন। স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে বাঁচিয়ে রাখতে পিপলস রিপোর্টারের পাশে দাঁড়ান। পিপলস রিপোর্টার সাবস্ক্রাইব করতে এই লিঙ্কে ক্লিক করুন